আর্যরা বাংলার মানুষকে অনাচারী অন্ত্যজ বলে অভিহিত করতো। পরবর্তীকালে গোপাল নামক এক ধর্মভীরু বৌদ্ধকে এদেশের মানুষ স্বাধীন রাজা নির্বাচিত করে। বৌদ্ধ আমলে সমাজে যে সাম্য দেখা দিয়েছিল সেন আমলে তার অবসান ঘটে। কৌলিন্য প্রথা প্রধানত: চারটি বর্ণে বিভক্ত ছিল। যথা : ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। বাংলায় ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে লক্ষণীয় ছিল। তবে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের সম্বন্ধে তেমন একটা উল্লেখ নেই। প্রাচীন যুগে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল।
আরও পড়ুন:বাংলায় সেনদের পতন ও মুসলিম শাসনের উত্থান।
সমাজের উচ্চবর্ণের সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ভোগ-বিলাস, স্বেচ্ছাচারিতা আর যৌনতায় নিমগ্ন ছিল। ফলে সমাজের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়। নিম্নবর্ণের নারীদের সামাজিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তৎকালে নারীরা ছিল স্বল্পভাষিনী ও অনুরাগিনী সমাজে বিধবাদের জীবন ছিল খুবই কষ্টের। সতীদাহ তথা মৃত স্বামীর সাথ স্ত্রীকে জীবন্ত কবর প্রথা ছিল খুবই জনপ্রিয়। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর নারীদের কোনো আইনগত অধিকার ছিল না। সেন আমলে পুরুষরা ধুতি এবং মেয়েরা শাড়ি ও ওড়না ব্যবহার করতো।
নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যে গহনা পরার রেওয়াজ বিদ্যমান ছিল। বিয়ের পর মেয়েরা সিঁদুর ব্যবহার করতো। কণ্ঠহার, মল ও বালা সে যুগের প্রধান অলংকার ছিল। চুলে মেয়েরা নানা প্রকার খোঁপা বাঁধতো। অর্থনৈতিক সচ্ছলতার সূত্র ধরেই বিভিন্ন দেশ হতে বণিকরা বাণিজ্য করতে এদেশে আসতো। স্থল ও জল উভয় পথেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে চমৎকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। এতে সমাজে একটি স্থায়ী বণিক সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে।
আরও পড়ুন:বাংলায় পাল শাসনের ইতিহাস
সমাজের এই শ্রেণী বৈষম্যের শিকার হতেন। শোষিত শ্রেণী যারা সংখ্যায় ছিল অধিক। এই সামন্ত প্রভুরাই সমাজ পরিচালনা করতো। কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ তৎকালীন সময়ে নানাবিধ শিল্পক্ষেত্রে উন্নত ছিল। বস্ত্রশিল্পে এই দেশ খুবই প্রসিদ্ধ। প্রস্তর ও ধাতুশিল্পেও তৎকালীন বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নত ছিল। হাতির দাঁতের বিভিন্ন প্রকার কাজের বিশেষ সুখ্যাতি ছিল। বাংলার মুদ্রা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এ সময় যথেষ্ট অবনতি ঘটে। পাল ও সেন রাজাগণ সম্ভবত মানসম্পন্ন মুদ্রা ব্যবস্থার প্রয়োজনবোধ করেননি।
ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের মতে, ‘‘যখন মুসলিম বিজেতারা বাংলায় প্রবেশ করে তখন কোনো স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রা দেখতে পাননি। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এ সময় কড়ি ছিল একমাত্র মাধ্যম। এতে মুদ্রা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পায়। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসারের ফলশ্রুতিতে তৎকালীন বাংলাদেশ সমৃদ্ধশালী ও প্রাচুর্যতায় ভরে ওঠে। সঙ্গত কারণেই এই দেশের প্রতি বিদেশী পর্যটকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। তাই আরব বণিকরা বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে এই দেশে আগমন করে। মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে বাংলার রাজনৈতিক ঐক্য এবং সংহতি সুদৃঢ় ছিল না।
আরও পড়ুন:বাংলায় গুপ্ত শাসনের ইতিহাস
মুসলিম বিজয়ের পূর্বে বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা ছিল চরম হতাশাজনক। রাজনৈতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান ছিল অসংগঠিত। গুপ্ত যুগের পূর্বে বাংলার কৌমবদ্ধ সাম্যবাদী সমাজগুলোর মধ্যে কোনোরূপ সুসংহত রাজনীতি গড়ে ওঠেনি। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষদিকে বাংলার সেনদের প্রভুত্ব কায়েম হয়। গুপ্ত শাসনামলে বাংলার জনগণ ছিল নির্যাতিত ও অবহেলিত। শশাঙ্কের শাসনামল শেষ হয়ে বাংলার পাল শাসনামল শুরু হয়। পাল শাসনামল বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল যুগ। তারা ব্রাহ্মণদের বিভিন্ন উচ্চ রাজকার্যে নিয়োগদান করেন। একই সূত্র ধরে ব্রাহ্মণরা সেনদেরকে বাংলার ক্ষমতা দখলের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
ব্রাহ্মণ ধর্মের শিরোমণি সেন বংশীয় লোকেরা ছিল পরধর্মে অসহিষ্ণু। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, সেন রাজারা ইতিহাসের সবচেয়ে অত্যাচারী রাজা ছিলেন এবং লক্ষ্মণ সেন তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেনরা গোঁড়া হিন্দু ছিল বিধায় অন্য ধর্মের প্রতি তাদের কোনো সহমর্মিতা ছিল না। অনেকের মতে, বল্লাল সেনের কৌলীন্য প্রথা একটি সর্বনাশা প্রথা, যা জঘন্য জাতিভেদের জন্য দায়ী। লক্ষ্মণ সেনের সময় এই প্রথা আরও কঠোর রূপ ধারণ করে।
আরও পড়ুন:মহানবীর (স) সময়ে বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটে?
এই কৌলীন্য প্রথার অজুহাতে সেনরা নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর এতো বেশি অত্যাচার করেছে যে, অধিকাংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তখন নেপালে পালিয়ে যায় এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরা অন্য ধর্ম ও সুফি-সাধকদের জীবনাচরণ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া শুরু করে। তারা সবসময়ই সেন রাজাদের পতন কামনা করতো। লক্ষ্মণ সেনের সময় প্রজাদের একটি বিদ্রোহও ঘটেছিলো।
অতএব বলা যায়, প্রাক মুসলিম যুগে ভারতবর্ষ তথা বাংলার রাজনৈতিক ঐক্যের অভাব, সামাজিক বিচ্ছৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা সামগ্রিকভাবে সুস্থ নাগরিক জীবন ব্যাহত করে। তৎকালীন সমাজে শ্রেণীবৈষম্য ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা এই অসহ্য পরিস্থিতির একটা পরিবর্তন আশা করে। যা প্রতিরোধ করার মত সামরিক শক্তি শাসক শ্রেণীর ছিল না। সঙ্গত কারণে ইসলামের সাম্য ও মৈত্রির বাণি ছড়িয়ে দিতে বাংলার মুসলমানদের অভিযান এবং যথাযথভাবে সামাজিক পরিবর্তন ছিল মূলত মুসলমানদের বিজয়।
[তথ্য : দৈনিক সংগ্রাম, ১৭ এপ্রিল ২০১০]




0 মন্তব্যসমূহ