বাংলাদেশে ইসলামের আগমন | বাংলাদেশ কিভাবে মুসলিম হয়?


মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিদায় হজ্জে তাঁর অবিস্মরণীয় ভাষণে সকল মুসলিমের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছিলেন ‘‘তোমরা উপস্থিত ব্যক্তিগণ অনুপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিও।’’ তখনই শেষনবীর অনুসারীদের মধ্য থেকে অনেকে দেশ-দেশান্তরে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য বিশ্বের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর দেয়া পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনীন জীবন বিধান হিসেবে বিশ্বের সব দেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হওয়াটা স্বাভাবিক।

কিন্তু সুদূর আরব দেশ থেকে হিমালয়ান উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল তথা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বিধৌত বাংলাদেশে কিভাবে এবং কখন ইসলামের আলো পৌঁছালো সে বিষয়ে নিশ্চিত করে আজু কোন কিছু বলা যায় না। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, মহানবী সাঃ এর সাহাবাদের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম এদেশে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল। অবশ্য এটা নিশ্চিত বলা যায় যে, আরব মুসলমানদের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম এদেশে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে এবং পরবর্তীকালে আউলিয়ায়ে কেরাম ও সুফি-সাধকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয়েছে।             

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর আবির্ভাবের বহুকাল পূর্ব থেকেই বাংলাদেশের সাথে আরবদের ব্যবসায়ের সম্পর্ক ছিল। এমনকি হজরত ঈসা (আ.) এর জন্মের কয়েক হাজার বছর আগেও দক্ষিণ আরবের সাবা কওমের ব্যবসায়ীরা পালতোলা জাহাজে করে এদেশে আসত। বিশেষ করে , সুদূর আরব থেকে ভারতবর্ষের মালাবার হয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেটে মুসলমানদের যাতায়ত ছিল। তাছাড়া ইসলাম প্রচারের কাজে এদেশে প্রচুরসংখ্যক আরব ছাড়াও তুর্কি মুসলমান সুফি দরবেশের আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা ব্যাপকভাবে এদেশে বসতি স্থাপন করেন। তাদের বংশ বৃদ্ধির মাধ্যমেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়। সুতরাং কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, এদেশের মুসলমানরা সবাই হিন্দু বংশধর নয়।

আরও পড়ুন:মহানবীর (স) সময়ে বাংলাদেশে ইসলামের আগমন হয়েছিল!

বাংলাদেশে ইসলামের আগমনের পূর্বে এখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সমাজে আত্মিক সাধনার বিভিন্ন প্রক্রিয়া চালু ছিল। ইসলাম প্রচারকগণের দাওয়াত আত্মিক সাধনার সাথে সংশ্লিষ্টদের অনেকটা আকর্ষণ করে। এমনিতেই বৌদ্ধ ধর্মে ‘তান্ত্রিক মতবাদ' ও হিন্দুর ‘বেদান্ত দর্শন' এ দুই সম্প্রদায়কে আত্মিক সাধনে আটকে রাখে। তার ওপর ইসলাম প্রচারকদের আত্মত্যাগ ও আধ্যাত্মিক সাধনা এ দু' সম্প্রদায়ের লোকদেরকে সহজে প্রভাবিত করাটাই স্বাভাবিক। কেননা তাদের সাধনার মূল লক্ষ্য এ পথেই সহজে অর্জিত হবে বলে তাদের অনেক নিরপেক্ষ চিন্তার সাধকরা মনে করেছেন।

রাজা হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে (৬০৬-৬৪৭ খৃ.) আরব দেশ থেকে একটি ছোট্ট প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করতে আসে। তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ ও চারিত্রিক গুণমাধুর্য স্থানীয় জনগণকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। তৎকালীন বাংলাদেশে জাতিভেদ ছিল প্রকট। উঁচু-নিচু ভেদ-চিন্তা মানুষকে অসংখ্য শ্রেণীতে বিভক্ত করে রেখেছিল। অপেক্ষাকৃত অভিজাতরা নিম্ন শ্রেণীর লোকদের ঘৃণা করতো, অস্পৃশ্য মনে করতো। তাদের স্পর্শ করা দ্রব্য ব্যবহার করতো না।

মুসলিম ধর্ম প্রচারকদেরকে যাবতীয় ভেদ-চিন্তার ঊর্ধ্বে দেখে, তাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। এছাড়া ব্রাহ্মণ্যবাদী খারাপ দৃষ্টিভঙ্গির দরুন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রতি জুলুম-নিপীড়ন হওয়াও এখানে ইসলামের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ঐতিহাসিকদের মতে বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের বহু পূর্বে এখানে ইসলাম প্রচারক দল আসে। বরং বাংলাদেশে ইসলামের আগমন এবং এখানে খিলজীর আমল থেকে মুসলমানদের রাজশক্তি প্রতিষ্ঠা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনা।                

বখতিয়ার খলজী

আরও পড়ুন:বাংলায় সেন শাসনের পতন এবং মুসলমানদের উত্থান

প্রখ্যাত লেখক আবুল মনসুরের মতে, বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের প্রবর্তনের প্রায় তিনশ' বছর আগে এখানে ইসলাম জনতার ধর্মরূপে গৃহীত হয়ে গিয়েছিল। বখতিয়ার খলজীর বঙ্গ বিজয় থেকে এখানে ইসলাম প্রচারের ধারণাকে এ সংক্রান্ত অনেক গবেষকই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা অকাট্য দলিল-প্রমাণ দ্বারা দেখিয়ে দিয়েছেন যে, বখতিয়ার খলজীর বঙ্গভূমিতে আসার তিনশ বছর পূর্ব থেকে এখানে বহু মুসলিম বণিক, আওলিয়া-সাধক, মুবাল্লিগদের সমাধীর অস্তিত্ব ছিল, যারা এ ভূখন্ডে ইসলাম প্রচার করতেন।

বাংলাদেশে যে সকল মুসলিম বণিক, সূফী-সাধক, মুবাল্লিগ ইসলামের মশাল নিয়ে এসেছিলেন, তাদের প্রত্যেককেই বিরাট বাধার প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হয়েছে। এমনকি ইসলাম প্রচারক সেই মহাপুরুষদের অনেককে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে গিয়ে প্রতিপক্ষের হাতে শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে। অথবা অত্যাচারি হিন্দু রাজাদের বিরোদ্ধে জিহাদ করতে হয়েছিল। ইসলামের প্রচারক সূফী-সাধকরা সকল প্রতিকূলতার প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে মানুষের কাছে দীনের দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন। তাদের দুঃসাধ্য প্রয়াসের পাশাপাশি গৌড়, পান্ডুয়া, সোনারগাঁ এবং সপ্তগ্রামের মুসলিম শাসনকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ইসলাম বিস্তারে বিরাট সহায়ক হয়েছিল।                     

সপ্তগ্রাম বন্দর
অমুসলিম সমাজগুলো বিশেষত হিন্দুদের একটি বিরাট অংশকে ইসলাম প্রচারক ও সূফী-সাধকগণ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন। ইসলাম প্রচারের প্রাক্কালে বাংলার হিন্দু-বৌদ্ধ সমাজে আত্মিক সাধনার বিভিন্ন প্রক্রিয়ার প্রচলন ছিল। ধর্ম প্রচারকগণের কাজে এ সাধন প্রক্রিয়া ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও কৃষ্টি সংস্কৃতি বিস্তারে বিরাট সহায়ক হয়েছিল। রাজার জাতির উন্নত মর্যাদা প্রাপ্তির আশায় ব্রাহ্মণ, কায়স্থ প্রভৃতি উচ্চ শ্রেণীর শিক্ষিত হিন্দুরাও তৎকালে দলে দলে ইসলামের পতাকাতলে এসে সমবেত হয়। শুরুর দিকে এমনিভাবে বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ঘটতে থাকে আর সে ভিত্তির ওপর ভর করেই এখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার সৃষ্টি হয়।

আরও পড়ুন:মুসলিম বীর বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের ইতিহাস

💻তথ্যের উৎস: 📌বাংলাদেশের ইতিহাস- কে আলী 📌বাংলাদেশের ইতিহাস- ড. মো: শাহাজাহান 📌বাংলার ইতিহাস- সূনিতী কুমার চট্টোপাধ্যায় 📌ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস- ড.এ.কে.এম আব্দুল আলীম 📌ভারতবর্ষের ইতিহাস- ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান 📌 উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন ওয়েবসাইট। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ