মুসলিম বিজয়ের পূর্বে ভারতবর্ষের অবস্থা | প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস

                                                                          

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষার্ধে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে চন্দ্রগুপ্ত, অশোক, সমুদ্র গুপ্ত ও হর্ষবর্ধনের শাসনকালে যে রাজনৈতিক ঐক্য ও সংহতি ছিল পরবর্তীতে তা বিনিষ্ট হয়ে যায়। এরপর সমগ্র ভারতবর্ষ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন হিন্দু রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং এক রাজ্য অন্য রাজ্যের প্রতি শত্রুতার মনোভাব পোষণ করত। স্বাভাবিকভাবেই পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষবশত এই সকল বিভক্ত রাজ্যগুলির মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ চলত।

আরও পড়ুন: ভারতবর্ষের পরিচিতি ও নামকরণ

কোন কেন্দ্রীয় সরকার না থাকায় এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দু রাষ্ট্রগুলি সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্কহীন অবস্থায় ছিল। ফলে তারা অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ জাতি হয়ে পড়ে। তাছাড়া হিন্দু সমাজে বর্ণ-বৈষম্য বা জাতিভেদ প্রথা তাদেরকে দুর্বল করে রাখে। বিশেষ করে হিন্দু রাজা-মহারাজাদের শাসনের নামে শোষণ এবং ব্রাক্ষ্মণ পুরহিতদের ধর্মের নামে অধর্মীয় কর্মকান্ডের ফলে সাধারণ ভারতীয়দের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ছিল।                                                               

ভারতবর্ষের সাধারণ জনসাধারণ তথা নিপিড়ীত ও অধিকার বঞ্চিত নিম্ব বর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধরা এই অভিশপ্ত জাতিভেদ প্রথা থেকে নিজেদের মুক্ত করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। একদা পৃথিবীর যেই প্রান্তে মানবতার আর্তনাদ কিংবা নির‌্যাতিত ও নিপিড়ীত মানুষের আহাজারি শুনা যেত, সেখানে আবির্ভাব হত শান্তির পতকাবাহী মুসলিম বীরসেনারা। যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল- অত্যাচারী ও জালেম শাসকদের শোষণ থেকে সাধারণ জনসাধারণদের মুক্ত করা। তেমন শত-সহস্র মুসলিম বীরসেনানির মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন মুহাম্মদ বিন কাসিম।

আরও পড়ুন: মুসলমানদের সিন্ধু বিজয়

তিনি জাতিভেদ প্রথায় জর্জরিত, নিপিড়ীত ও নিষ্পেষিত ভারতবাসীর মুক্তির দূত হিসেবে যখন ৭১২ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের সিন্ধু নগরে আগমন করেন, তখন এই সকল সাধারণ জনসাধারণ অত্যাচারী হিন্দু রাজা-মহারাজাদের বিরুদ্ধে গিয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সহযোগিতা করেন। কারণ মুসলমানদের আগমনকালে ইসলাম ধর্মের শান্তি, একতা, সহনশীলতা, উদারতা, সাম্য ও মৈত্রীভাব ভারতীয় জনসাধারণকে মুগ্ধ করে। তাই তারা সহজেই সাম্যে-মৈত্রীর পরিপোষক মুসলিম শাসকদের নিকট আত্মসমর্পণ করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।                                      

মুসলমানদের আগমনের পূর্বে হিন্দু ভারতের সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন হর্ষবর্ধন। তিনি ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে কনৌজ ও থানেশ্বরের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার রাজত্বের একটি উল্ল্যেখযোগ্য ঘটনা হলো গৌড়ের স্বাধীন রাজা শশাঙ্ককে পরাজিত ও নিহত করা। তাছাড়া তিনি প্রায় সমগ্র উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষের ঐক্য, সংহতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়।   

                                          

রাজা হর্ষবর্ধন

এই অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যর মধ্যে উত্তর ভারতের রাজ্য সমূহ হলো- কাশ্মীর, কনৌজ, আজমীর ও দিল্লী, বুন্দেলখন্ড, মালব, সিন্ধু, বাংলা ও আসাম ইত্যাদি। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতে পল্লব, চালুক্য, রাষ্ট্রকূট, পান্ড্য, চৌল ও চেরা নামে বিভিন্ন রাজ্য ছিল। ভারতবর্ষের উত্তর এবং দক্ষিণে স্বাধীন ও সার্বভৌম এই রাষ্ট্রসমূহের পতনের ফলে হিন্দু-ভারতের একতা বিনিষ্ট হয় এবং অন্যদিকে মুসলিম বিজয়ের সূচনা হয়।

আরও পড়ুন: ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন | প্রথম মুসলিম ও মসজিদ

তথ্যসূত্র :
  • ভারতবর্ষের ইতিহাস (মুসলিম ও ব্রিটিশ শাসন)- ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাছান।
  • ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস - এ.কে,এম আব্দুল আলীম। 
  • ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস - এ.কে.এম শাহানেওয়াজ।
  • ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস - মাহমুবুর রহমান।
  • ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ইতিহাস- ড. মুহাম্মদ গোলাম রসূল।
  • উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট।
                                               



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ