পূর্বের অংশটি পড়ুন : সুলতান হাম্মদ তপার : পতনের যুগের সেলজুক শাসক ।
আহমেদ সেনজার ছিলেন খোরাসান এর বিখ্যাত সেলজুক সুলতান । ১০৯৫ সালে আহমেদ সেনজার খোরাসানের সিংহাসনে আরোহন করেন এবং ১১১৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১০৯৬ সালে তাকে সুলতান মালিক শাহ খোরাসানের আমির হিসেবে নিযুক্ত করেন। খোরাসান একটি আঞ্চলিক প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও আহমেদ সেনজার তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে শুরু করেন।
১১০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আহমেদ সেনজার এর ভাই সুলতান বারকিয়ারুক মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে সুলতান বারকিয়ারুক তার ছোট সন্তান মইজুদ্দিন মালিক শাহকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় মালিক শাহ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন কিন্তু আসল ক্ষমতা ছিল তার চাচা মহাম্মদ তপারের হাতে। কয়েক বছরের মধ্যে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গেলেন এবং মইজুদ্দিন মালিক বা দ্বিতীয় বাদশাহকে সিংহাসনচ্যুত করলেন এবং নিজেই পরবর্তী সুলতান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন।
১১১৮ সালে যখন মোহাম্মদ তপার মারা যান তখন তার ছেলে দ্বিতীয় মাহমুদ নতুন সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এদিকে ইয়াজদ এর আমির দ্বিতীয় গারশাপ বিদ্রোহ করে বসেন। একই সাথে তিনি দ্বিতীয় মাহমুদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকেন। এসব কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে মাহমুদ তার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং তাকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।
![]() |
| ইয়াজদ প্রদেশ ম্যাপ |
পরবর্তীতে সে সেখান থেকে পালিয়ে যায় এবং আহমেদ চেঞ্জার এর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করে। এদিকে সে সেনজারকে মাহমুদের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে ইরানের কেন্দ্রে হামলা চালানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং সেই সব রকমের তথ্য দিয়ে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। ১১১৯ সালে আহমেদ সেনজার সেলজুক সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য নিজে সিংহাসনে উপবিষ্ট হন। আরও পড়ুন: সুলতান আল্প আরসলান
এবার আহমদ সেনজার এই হাসান সাব্বাহ নামক কাটাটিকে ইসলামিক দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য মনোনিবেশ করেন। তিনি হাশাশিন তথা গুপ্তঘাতকদের উচ্ছেদ করার জন্য বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এবং বেশ সফলতা অর্জন করেছিলেন। পারস্য থেকে হাশাশিনদের উচ্ছেদ করার জন্য তার এই প্রচারণা ছিল ইসলামী দুনিয়ায় এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তিনি কুইস্থান ও তাবাসা সহ বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দুর্গ থেকে হাশাশিনদের উচ্ছেদ করেন।
![]() |
| আলামুত দুর্গ |
উক্ত ঘটনাগুলো থেকে হাসান সাব্বাহ বুজতে পারে আহমেদ সেনজার এবার শাশিনদের কেন্দ্রীয় দুর্গ আলামুতে অভিযান পরিচালনা করতে যাচ্ছেন। আলামুতে অভিযানের পথে আহমেদ সেনজার একটি খোদাই-করা বার্তাবাহক খঞ্জর পান যাতে হাসান সাব্বাহ লিখেছিল সে শান্তি চায়। এ ঘটনায়, আহমেদ সেনজার কিছুটা অবাক হন কিন্তু তিনি হাসান সবার নিকট প্রেরণ করেছিলেন এবং তারা উভয়ে একে অপরের পর থেকেই দূরে থাকার শর্তে রাজি হয়েছিলেন।
এ সময় সেলজুক রাজ্য অনেকটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। যার ফলে অনেক রাজ্যই স্বাধীনভাবে এ রাজ্য পরিচালনা করছিল। সেনজারের দূরদর্শিতা এবং পরিশ্রম সেলজুক ভুমিকে ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিল একই সময় খোরাসান হয়ে উঠেছিল সেলজুক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি। পরবর্তী বছরগুলোতে আহমদ সেনজার ইরান এর বেশ কিছু অঞ্চল এবং নিশাপুরের একচ্ছত্র অধিপতিতে পরিণত হন।
আরও পড়ুন: সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা তুঘ্রীল বেগ
১১৪১ সালে সেলজুক সাম্রাজ্যের জন্য বড় হুমকি কারা-খানিদদের বিরুদ্ধে একটি অভিযান পরিচালনা করেন। সেই কাতয়ান এর যুদ্ধে আহমেদ সেনজার এর বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং গারশাপ মারা যান। এর ফলে পূর্বে সীর দরিয়ার সমস্ত সেলজুক ভুমি হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপর বৃহৎ সেলজুক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশে প্রদেশে বিদ্রোহ
দেখা দেয়। তাছাড়া ক্রমাগত বর্ধমান গৃহযুদ্ধের কারণে সেলজুক সাম্রাজ্য দুর্বল হতে
থাকে।
১১৫৩ সালে সেলজুক উপজাতিগুলোতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লে আহমেদ সেনজার এর সাথে সাথে সেলজুক রাজ্যও ভেঙ্গে পড়েছিল। ১১৫৭ সালে সুলতান আহমেদ সেনজার মারা যান এবং তাকে মেরভে সমাধিস্থ করা হয়। বস্তুত আহমেদ সেনজারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্য হিসেবে সেলজুক সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে। কারণ তার উত্তরাধিকারীরা শুধু ইরান ও আজারবাইজানকেই নিয়ন্ত্রণ করেছিল। এই ভাবে আব্বাসীয় খলিফা আল মুকতাযীরের খেলাফতকালে সেলজুক
প্রভূত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে।
![]() |
| সেলজুক সাম্রাজ্য ম্যাপ |
দ্বিতীয়ত সুলতান তুঘ্রীল বেগের ভাই চেগরী বেগের বংশধরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সেলজুকদের কারামানি সালতানাত। তৃতীয়ত, মুগিছ বিন মাহমুমেরদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিক সেলজুকদের কুর্দিস্তান সালতানাত। চতুর্থত, তেকিশ বিন আরসালানের বংশধরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সামের সালতানাত। পঞ্চম ও সর্বশেষ, সুলাইমান বিন কুতলিমিশের বংশধরদের কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আনাতোলিয়া কেন্দ্রীক রুমের সালতানাত। এই আনাতোলিয়া কেন্দ্রীক রোমের সেলজুক সালতানাতানাতের পতনরে পর প্রতিষ্ঠিত হয় তিন মহাদেশ বিস্তৃত উসমানীয় খেলাফত এবং এরপর আধুনিক তুরস্কের জন্ম হয়।
আরও পড়ুন: রুমের সেলজুক সালতানাতের ইতিহাস
ভিডিও দেখুন :
তথ্যের উৎস:
- আরব জাতীর ইতিহাস - ড. লৎফর রহমান
- সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাস - ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লবি
- ইসলামের ইতিহাস - ড. মাহমুবুর রহমান
- উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট




0 মন্তব্যসমূহ