মহানবীর (স) আগমনকালে মদীনার অবস্থা |

                                                                     


পূর্বের অংশ পড়ুন : মহানবীর (স.) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত ।

৬২২ খ্রিস্টাব্দে ২৪ আগস্ট মক্কা থেকে মদীনা হিজরতের মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ স. এর মক্কা জীবনের সমপ্তি এবং মদীনা জীবনের সূচনা ঘটে। মহান আল্লাহর আদেশে স্বদেশ ভূমি মক্কা ত্যাগ করে ইয়াসরিবে হিজরত করলে সেখানকার আউস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা মহানবী স. কে সাদরে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করে।

মদীনায় গমন করে মহানবী স. সর্বপ্রথম সহল ও সোহাইল নামের দুই ভাই থেকে একখন্ড খেজুরের বাগান ক্রয় করেন এবং সেখানে বাসস্থান ও মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে এই স্থানে মসজিদ আল নববী বা নবীর মসজিদ নামে একটি মসজিদ নির্মিত হয় যা ইতিহাসে মদীনা মসজিদ নামে বেশ প্রসিদ্ধ।  এই মসজিদটি কেবল ইবাদতের জন্যই ব্যবহৃত হত না বরং ধর্মপ্রচার, সামাজিক ও রাজনৈতিক কার‌্যবলীর জন্যও ব্যবহৃত হত।

মহানবী স. এর আগমনের পূর্বে এই স্থানের নাম ছিল ইয়াসরিব। মদীনায় আগমনের পর ইয়াসরিববাসী মহানবী স. এর সম্মানে এটির নাম পরিবর্তন করে মদীনাতুন্নবী, নবীর শহর বা সংক্ষেপে মদীনা রাখেন। হিজরতের পর স্বদেশ ত্যাগি মুসলমান গণ মদীনায় মুহাজির এবং মহানবী স. ও সাহাবীদের মদিনায় আউস ও খাজরার গোত্র আশ্রয় প্রদান করেন বলে তাদেরকে সাহায্যকারী বা আনসার রুপে অভিহিত করা হয়।

                                                 

মদীনায় গমনের পর মহানবী স. পাঁচ শ্রেণীর অধিবাসীদের সংস্পর্শে আসেন। তারা হলেন মুহাজীর, আনসার, ইহুদী, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিক। বলা বাহুল্য যে, আনসার তথা আউস ও খাজরাজ সম্প্রদায় ছিল অধিকাংশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বি এবং তাদের আন্তরিক সাহায্য ও সহানভূতির ফলে ইসলাম আরবের বুকে সুপ্রতিষ্টিত হতে সক্ষম হয়।

অপরদিকে মদীনার অমুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে জড়বাদী পৌত্তলিক ছিল অন্যতম।তাদের নেতা ছিল আব্দুল্লাহ বিন উবাই। স্বার্থন্ষেী মূর্তিপূজক দল প্রথমদিকে মহানবী স. এর সাথে শত্রুতা করতে থাকে। পরবর্তীতে সুযুগ ও সুবিধা লাভের জন্য তারা ইসলাম গ্রহণ করে সত্য কিন্তু আবার নিজেদের স্বার্থসিদ্ধীর জন্য মুসলমানদের সাথে বেইমানী করতে দ্বিধাবোধ করত না। এ কারণে তাদেরকে প্রতারক বা মুনাফেক বলা হত।

অন্যদিকে ইহুদিরা আনসারদের সাথে একত্রে মহানবী স. এবং সাহাবীদেরকে প্রথমদিকে সাদরে অভ্যর্থনা জানালেও কিন্তু বিভিন্ন কারণ ও নিজেদের স্বর্থসিদ্ধীর জন্য পরবর্তীতে তারা মুসলমানদের বিরোদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতা ও যুদ্ধ করে। বানু কাইনুকা, বানু নাজির ও বানু কুরাইজা শাখায় বিভক্ত ইহুদিরা বাণিজ্য ও সুদের ব্যবসায় লিপ্ত থেকে সম্পদশালী হয়ে উঠে।
                                                       

অতঃপর মহাবনবী সঃ মদীনায় হিজরত করে দেখতে পান যে, মদীনায় কোন কেন্দ্রীয় সংগঠন ও সরকার ব্যবস্থা ছিল না। আউস ও খাজরাজ গোত্র পরস্পর পরস্পরের বিপক্ষে যুদ্ধ-বিবাদে লিপ্ত ছিল। স্বার্থেন্বেষী ইহুদিরা বিভিন্ন কৌশলে গোত্র গুলোর মধ্যে ঝগড়া লাগানোর কাজে ব্যস্ত ছিল। হিব্রু ভাষাভাষি ইহুদিরা আরবজাতীকে ঘৃণা করত এবং নিজেদের উন্নত মনে করত। তাছাড়া নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি অটুট রাখার জন্য আরববাসীদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ বাধিয়ে দিত।

এককথায় সেসময় মদীনা কিংবা আরবের কোন নগরেই আইন-শৃঙ্খলা ছিলনা। পৃথক পৃথক দলসমূহ পরস্পরের মধ্যে কলহ ও বিবাদে লিপ্ত থাকায় উপদ্বীপটির সর্বত্র অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা পূর্ণ মাত্রায় বিরাজ করছিল। ঠিক এমন সময় বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত ও শান্তির বাহক মহানবী হযরত মুহাম্মদ স. মদীনায় আগমন করেন। আকাবার শপথে আউস ও খাজরাজ গোত্রেদ্বয়কে দেওয়া কথার প্রেক্ষিতে এ সময় মহানবী স. এর দায়িত্ব ছিল মদীনায় সকলের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন ও শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।

এরই প্রেক্ষাপটে মহানবী স. মদীনাবাসী ও মদীনার আশেপাশে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি স্থাপন, শান্তি ও সুশাসন প্রতিষ্টার লক্ষ্যে প্রণয়ন করেন পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান “মদীনা সনদ”।

পরবর্তী অংশ পড়ুন :মদিনা সনদ : পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান |


তথ্যের উৎস সমূহ:

১. আরব জাতির ইতিহাস - শেখ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ।
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান 
৩. ইসলামের ইতিহাস  ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট ।
                                               

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ