ষোল টি বিখ্যাত তুর্কি সাম্রাজ্যের অজানা ইতিহাস।


The Sixteen Great Turkish empire তথা ১৬ টি বিখ্যাত তুর্কি সাম্রাজ্য হলো তুরস্কের জাতিগত জাতীয়তাবাদের একটি ধারণা, যা ১৯৯৬ সালে তুর্কি মানচিত্রকার আকান ওজব্যাক দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট কেনান ইভরনের সরকারের অধীনে তুর্কি কর্তৃপক্ষ এই ধারণাটি বিশ্বব্যাপি ব্যাপকভাবে প্রচার করে।

সাধারণাত তুর্কি জাতি বলতে একটি বৃহত্তর জাতিকে বোঝায়, যার মধ্যে হান, কাজাখ, উজবেক, কিরগিজ, উইঘুর, তাতার, চেচন , হুন, সেলজুক, উসমানীয়, তৈমুরিয়, খাওয়ারিজমি, গজনবি, মুঘল ইত্যাদি জাতিগুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই জাতিগোষ্ঠী সমূহ অতীতে বহৎ বৃহৎ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এবার চলুন সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেওয়া যাক ১৬ টি বিখ্যাত তুর্কি সাম্রাজ্য সম্পর্কে ।

১৬ টি তুর্কি সাম্রাজ্যের পতাকা

১. বিখ্যাত হান সাম্রাজ্য : ১৬ টি তুর্কি সাম্রাজ্যের মধ্যে প্রথমটি হলো হান সাম্রাজ্যে। এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মেটে হান। এই সাম্রাজ্যটি ২২০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ৪২ খ্রিস্টাব্দে পতন হয়। প্রায় ৮০ লক্ষ বর্গ কিঃমি আয়তনের হান সাম্রাজ্য উত্তরে সাইবেরিয়া, দক্ষিণে তিব্বত ও কাশ্মীর, পূর্বে প্রশাস্ত মহাসাগর এবং পশ্চিমে কাস্পীয়ান সাগর দ্বারা বেষ্টিত ছিল।

২.পশ্চিমের হান সাম্রাজ্য: পানো হান নামের এক যাযাবর তুর্কি এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। খ্রিস্ট পূর্ব ৪৮ অব্দে প্রতিষ্ঠিত সাম্র্যজ্যটির পতন হয় ২১৬ খ্রিস্টাব্দে। বর্তমানের মধ্য এশিয়ার বিস্তির্ণ অঞ্চল নিয়ে পশ্চিমের হান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

৩.ইউরোপিয়ান হান সাম্রাজ্য :  ইউরোপিয়ান হান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন মোনকাক, ওকতার,রোয়া এবং আয়বার্স নামের চার ভাই। এই সাম্রাজ্যটির উত্থান হয় ৩৫৭ খ্রিস্টাব্দে এবং পতন হয় ৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে । ৪০ লক্ষ বর্গ কিঃমি আয়তনের সাম্রাজ্যটি বর্তমান দক্ষিণ রাশিয়া, নোমানিয়া, উত্তর যুগশ্লোভকিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভকিয়া এবং জার্মানি নিয়ে গঠিত হয়েছিল।

৪.শ্বেত হান সাম্রাজ্য:  শ্বেত হান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আকসুঙ্গুর । ৩৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সাম্রাজ্যটির পতন হয় ৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে। প্রায় ৩৫ লক্ষ বর্গ কিঃমি আয়তনের সাম্রাজ্যটি বর্তমান উত্তর ভারত, আফগানিস্তান এবং তুর্কিস্থান নিয়ে গঠিত ছিল।

৫.গোকতুর্ক বা প্রথম তুর্কি সাম্রাজ্য: গোকতুর্ক সাম্রাজ্য ছিল প্রথম প্রকৃত তুর্কি সাম্রাজ্য। এটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বোমিন খান। আটলাস পর্বতমালাকে কেন্দ্র করে ১৮ লক্ষ আয়তনের সাম্রাজ্যটির উত্থান হয় ৫৫২ খ্রিস্টাব্দে এবং উইঘুর খানাতের কাছে পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে এটির পতন হয়।আরও পড়ুন: রুমের সেলজুক সালতানাতের ইতিহাস   

৬.উইঘুর খানাত : উইঘুর খানাত বা উইঘুর সাম্রাজ্য ছিল তুর্কি জাতিভুক্ত একটি সাম্রাজ্য। এটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কুতলুগ বিলগেকুল খান। গোকতুর্ক সাম্রাজ্যকে পরাজিত করার মাধ্যমে ৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে এটির উত্থান হয় এবং ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলদের হাতে উইঘুর খানাতের পতন ঘটে। মোঙ্গলদের পর চীনের সম্রাটরা এই খানাতটি দখল করে। মধ্য এশিয়া এবং উত্তর মঙ্গলিয়া পর‌্যন্ত বিস্তৃত ছিল উইঘুর খানাত। উল্লেখ্য, এই উইঘুররা পরব্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে এবং বর্তমানের চীনের জিনজিয়াং প্রদশের উইঘুর মুসলিমরা মূলত এই সাম্রাজ্যের অন্তুর্ভুক্ত ছিল।                     

উইঘুর খানাত ম্যাপ

৭.এভার খানাত : এভার খানাতের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বায়ার খান। ৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত খানাতের পতন হয় ৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে। বর্তমান ইউরোপের হাঙ্গেরী এবং সার্বিয়াকে কেন্দ্র করে এই খানাতের প্রতিষ্টিত হয়।

৮.খাজার খানাত : তুর ইয়াবগু খান ছিলেন খাজার খানাতের প্রতিষ্টাতা। খাজাররা ছিল গুকতুর্ক সাম্রাজ্যের অধীনস্থ একটি তুর্কি গোত্র। তারা পরবর্তীতে বর্তমান আধুনিক ইউরোপের রাশিয়া, দক্ষিণ ইউক্রেণ, ক্রিমিয়া এবং কাজাখস্তানকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল খানাত প্রতিষ্টা করে। তারা প্রথমদিকে পৌত্তলিক ছিল তবে পরবর্তীতে অধিকাংশ কাজাখ জনগোষ্টি ইসলাম গ্রহণ করেন। খাজাক খানাতের শ্রেষ্ট শাসক ছিলেন সুলতান হাকাম ইউসুফ। এই খাজাক তুর্কিরা বর্তমানে কাজাখস্তানের অধিবাসী।

৯.কারাখানিদ খানাত : কারাখানিদ খানাত ছিল একটি ‍মুসলিম সাম্রাজ্য বা খানাত। যদিও এই খানাতের প্রথম শাসক ছিলেন বিলগে কাদির খান তবে  এটির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সুলতান ‍বুগরা খান। কারাখানিদ খানাত মধ্য এশিয়া ও কাশগড় পর‌্যন্ত বিস্তৃত ছিল।  এই সাম্রাজ্যটির উত্থান হয় ৮৪০ খ্রিস্টাব্দে এবং পতন হয় ১২১২ খ্রিস্টাব্দে। 

১০.গজনবী সাম্রাজ্য: আল্পতাগীন নামের এক তুর্কি মুসলিম বীর এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হলেও মূলত সুলতান মাহমুদ গজনবী ছিলেন এই সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্টাতা। ৯৬২ খ্রিস্টাব্দে গজনী সাম্রাজ্যের অগ্রযাত্রা শুরু হয় এবং ১১৮৬ খ্রিস্টাব্দে সেলজুক তুর্কিদের হাতে এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এই সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র আফগানিস্তানের গজনীতে হলেও ভারতবর্ষ এবং মধ্য এশিয়াতেও এর বিস্তৃতি ছিল সাম্রাজ্যটি।

আরও পড়ুন:সেলজুক সা্ম্রাজ্যের উত্থান

১১.মহান সেলজুক সাম্রাজ্য: ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে সেলজুক সাম্রাজ্যের উত্থান হয় ওগোজ দলপতি সেলজুক বেগের হাত ধরে। তবে এই সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সুলতান তুঘ্রলি বেগ। সেলজুক সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সুলতানদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুলতান আল্প আরসালান এবং সুলতান মালিক শাহ। জেরুজালেম থেকে কনস্টান্টিনোপল পর‌্যন্ত এই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল। ১১৫৭ সুলতান আহমেদ সেনজারের মৃত্যুর পর সেলজুক সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।       

সেলজুক সাম্রাজ্য

 ১২.খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য: ১০৯৭ খ্রিস্টাব্দে কুতুব উদ্দীন মুহাম্মদের হাত ধরে সমরকন্দকে রাজধানী করে প্রতিষ্ঠিত হয় খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য। এটি বর্তমানের আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং ইরানকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল। ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান জালালউদ্দীন খাওয়ারিজম শাহকে পরাজিত করে মোঙ্গলরা খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য দখল করে।

১৩.গোল্ডেন হর্ড খানাত : ১২২৫ থেকে ১২৪১ খ্রিস্টাব্দ পর‌্যন্ত এই খানাতটি মোঙ্গলদের দ্বারা শাসিত হলেও ১২৪২ খ্রিস্টাব্দে বাটু খান নামক এ্ক তুর্কি মুসলিম বীর এটি জয় করেন। ১২৫৬ খ্রিস্টাব্দে বাটু খানের ‍মৃত্যুর পর বিখ্যাত নওমুসলিম বীর বারকে খান এই খানাতের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হন। অবশেষে ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে গোল্ডেন হর্ডের পতন ঘটে।

১৪.তৈমুরিয় সাম্রাজ্য : তুর্কি বীর আমির তৈমুর লঙ্গ ১৩৬৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুরিয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই সাম্রাজ্যটি বর্তমানের উজবেকিস্তান, খাজাখস্তান, ইরান, আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার, ভারতবর্ষ ও সিরিয়ার কিছূ অংশ জুড়ে বিস্তিৃত ছিল। তৈমুরিয়া সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল সমরকন্দ। এই সাম্রাজ্যের পতন হয় ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে।

                            

তৈমুরিয় সাম্রাজ্য

১৫.মোঘল সাম্রাজ্য: ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবর ভারতবর্ষ এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশকে কেন্দ্র করে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশদের হাতে মোঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহদুর শাহের পরাজতি হওয়ার মাধ্যমে এই সা্ম্রাজ্যের পতন ঘটে।         

১৬.উসমানীয় সাম্রাজ্য : ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দে এশিয়া মাইনর তথা আনাতোলিয়াকে কেন্দ্র করে সুলতান ওসমান গাজী উসমানীয় সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে ‍সুলতান প্রথম সেলিমের শাসনকালে এই সাম্রজ্যটি খেলাফতে পরিণত হয়। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে সর্বশেষ খলিফা সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল মজিদের নির্বাসনের মধ্য দিয়ে উসমানীয় খেলাফত তথা অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। উসমানীয় খেলাফতের পতনের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আধুনিক তুরস্ক।      

আরও পড়ুন: উসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাস

    ভিডিও দেখুন:

                      

 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ