বখতিয়ার খলজী : প্রথম বাংলা বিজয়ীর সংগ্রামী জীবনকথা |


                           
পূর্বের অংশ পড়ুন : বাংলাদেশে ইসলামের আগমন

মুসলিম বীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন বাংলা বিজয় এবং বাংলায় প্রথম মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন কারী হিসেবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বখতিয়ার খলজি খলজি অনন্য একজন চরিত্র। তবে তার সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ইতিহাসের পাতায়। কেননা ভারতবর্ষে মুসলমানদের বিজয়ের পথ ধরে বাংলা বিজয়ের সূচনা হয়।

৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে মুসলমানদের বিজয় পতাকা প্রথমবারের মত ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু অঞ্চলে উড্ডীয়ন হয় এরপর থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানদের আধিপত্য বিস্তার হতে থাকে অবশ্য কিছু কালের জন্য মুসলমানদের অগ্রগতি থেমে থাকলেও দ্বিতীয় পর‌্যায়ে ১০০০ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ গজনবীর মাধ্যমে ভারতবর্ষে বিজয় অভিযান এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ধারা আবারও চলতে থাকে

অতপর ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে আফগানিস্তানের গজনী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান মুইজউদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরী তৃতীয় পর‌্যায়ে ভারতবের্ষ অভিযান পরিচালনা করেন এবং ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম স্থায়ী মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার গৌরব অর্জন করেন এরপর মুইজউদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরী ভারতবর্ষের বিজিত অঞ্চলসমূহের কর্তৃত্ব তার সুযোগ্য ও বিশ্বস্ত সেনাপতি কুতুব উদ্দীন আইবেককে অর্পণ করে গজনীতে প্রত্যাবর্তন করেন।                        

                                                         মোহাম্মদ ঘুরী

কুতুব উদ্দীন আইবেক ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে মীরাট, আলিগড় ও দিল্লি বিজয় করেন এবং দিল্লিকে ভারতবের্ষর রাজধানী করে শাসনকার‌্য পরিচালনা করতে থাকেন এ সময় পূর্ব ভারতে যিনি ইসলামের বিজয় পতাকা বহন করে নিয়ে যান তিনি হলেন ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী তিনিই বাংলায় প্রথম মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন করেন উল্লেখ্য তার বাংলা বিজয়ের প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে অসংখ্য সাহাবী, তাবেঈ, সূফি-সাধক, দরবেশ এবং ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটে

আরও পড়ুন:বাংলায় সেনদের পতন ও মুসলিম শাসনের উত্থান।                                                 

বঙ্গবিজেতা ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী ইতিহাসে বখতিয়ার খলজী নামেই অধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন জাতীতে তুর্কি এবং বংশে খলজী। বখতিয়ার খলজি আফগানিস্তানের গরমশীর অঞ্চল তথা আধুনিক দাস্ত ই মার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশবকাল সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। তবে তিনি ছিলেন সাহসী এবং বীর যোদ্ধা।

নিজ কর্মশক্তিতে বিশ্বাসী বখতিয়ার খলজী জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে জীবিকার সন্ধানে ১১৯৫ খ্রিস্টাব্দে গজনীতে গমন করেন এবং গজনী সাম্রাজ্যের অধিপতী সুলতান মুইজ উদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরীর সৈন্যবিভাগে চাকরীর প্রার্থনা করেন। কিন্তু দৈহিকভাবে খাটো, লম্বা হাত ও কুৎসিত চেহারার জন্য তিনি সৈন্যধক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পারায় চাকরী লাভে ব্যার্থ হন।

অতএব বিফল মনোরথ হয়ে তিনি পুনরায় ভাগ্যের অন্বেষণে আফগানিস্তানের গজনী থেকে ভারতবর্ষের দিল্লীর পথে যাত্রা করেন। এ সময়ে মালিক কুতুব উদ্দীন আইবেক ছিলেন মুইজউদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরীর ভারতবর্ষের প্রতিনিধি বা শাসনকর্তা। কিন্তু একই কারণে বখতিয়ার খলজি দিল্লিতেও চাকরী পেলেন না। এতদ্বসত্ত্বেও ভাগ্যন্বেষী বখতিয়ার খলজি নিরাশ হলেন না। তার চোখে ছিল দুর্বার সাহস। অতএব আবারও তিনি ভাগ্য পরীক্ষার জন্য অজানা পথে যাত্রা করলেন।

      আরও পড়ুন:বাংলায় গুপ্ত শাসনের ইতিহাস                                                       

এবার বখতিয়ার খলজি আসলেন বাদায়ুনে। উল্লেখ্য, বাদায়ুন হলো বর্তমান ভারতরে উত্তর প্রদেশের একটি শহর। তখন বাদায়ুনের শাসনকর্তা ছিলেন মালিক হিযবুর উদ্দীন। এখানে তিনি চাকরী পেলেন এবং স্বল্প বেতনে একজন নগন্য সৈনিক হিসিবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু বেশিদিন তিনি এ চাকরি করলেন না। নিজের কর্মশক্তির উপর যার অগাধ বিশ্বাস, ভবিষ্যতের বিরাট সাফল্য সম্বন্ধে যিনি আশাবাদী, সামান্য সাধারণ সৈনিক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন সেনা জীবনে আবদ্ধ থাকতে পারেন না।

অতএব বাদায়ুন ত্যাগ করে তিনি অযোধ্যায় আসলেন। অযোধ্যা হলো বর্তমান ভারতের ‍উত্তর প্রদেশের ফয়াজাবাদ জেলার একটি শহর। অযোধ্যার শাসন কর্তা মালিক হুসাম উদ্দীন তার মধ্যে সাফল্যের উজ্জ্বল সম্ভাবনা লক্ষ্যে করে তাকে প্রথমে অঞ্চলের পর‌্যবেক্ষনের কাজে নিয়োগ দেন। পরে বখতিয়ার খলজীর সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর্তমান মির্জাপুর জেলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ভাগবৎ ও ভুইলী নামক দুইটি পরগণার জায়গীর প্রদান করেন। এখানে খলজী বীর তার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পান।

আরও পড়ুন:মহানবীর (স) সময়ে বাংলাদেশে ইসলামের আগমন হয়েছিল!

ক্রমে এ দুটি স্থান বখতিয়ার খলজীর শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠে। এখান থেকে তিনি হিন্দু গাঢ়বাল রাজ্যের সামন্ত নরপতিদের পরাজিত করে মুনের তথা বর্তমান পাঠনা এবং বিহার তথা বর্তমান বিহার শরীফ থেকে বহু গনিমত লাভ করেন। এই সম্পদ নিয়ে বখতিয়ার খলজি অশ্ব ক্রয় করে সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগলেন। এ সময়ে নব বিজিত হিন্দুস্থানে বহু তুর্কী ও খলজী জাতীর লোক জীবিকা অর্জনের আশায় ঘোরাফেরা করত।

                                                   বখতিয়ার খলজী

তাদের মধ্যে অনেকেই বখতিয়ার খলজীর খ্যাতি ও শৌর‌্য বীর‌্যে আকৃষ্ট হয়ে  তার দলে যোগদান করে। তিনি তাদের নিয়ে একটি শক্তি শালী সেনাবাহিনী গঠন করেন। ইতিমধ্যে বখতিয়ার খলজীর শক্তি, সাহস ও সাফল্যের কথা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে আমির কুতুব উদ্দীন আইবেক তাকে অভিনন্দন জানান। অভিনন্দনের চিহ্নস্বরূপ খিলাত তথা সম্মানসূচক পোশাক প্রদান করেন।                                           

খিলাতের সাথে তিনি প্রশাংসা ও উৎসাহ এর বাণীও প্রেরণ করেছিলেন। বখতিয়ার খলজী কুতুব উদ্দিন আইবেকের প্রাধান্য স্বীকার করেছিলেন। অপরদিকে বখতিয়ার খলজির কার‌্যবলি কুতুব উদ্দিন আইবেকের স্বীকৃতি ও সমর্থন লাভ করায় বহু মুসলমান বখতিয়ার খলজীর পতাকাতলে সমবেত হয়। তারা বখতিয়ার খলজীর বিজয়কে ইসলামের বিজয় বলে মনে করত। অবশেষে বখতিয়ার খলজী তার অধিনস্থ বীর মুজাহিদরে নিয়ে তিনি ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে বিহার, ১২০৪ সালে বাংলা ও গৌড় জয় করে ইসলামের বিজয় কেতন উড়িয়ে আলোকিত করেন অন্ধকার ও কুসংস্কারচ্ছন্ন বাংলাকে।

পরবর্তী অংশ পড়ুন : বখতিয়ার খলজীর বাংলা ও বিহার বিজয়

💻তথ্যের উৎস: 📌বাংলাদেশের ইতিহাস- কে আলী 📌বাংলাদেশের ইতিহাস- ড. মো: শাহাজাহান 📌বাংলার ইতিহাস- সূনিতী কুমার চট্টোপাধ্যায় 📌ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস- ড.এ.কে.এম আব্দুল আলীম 📌ভারতবর্ষের ইতিহাস- ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান 📌 উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন ওয়েবসাইট। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ