ভারতবর্ষে আরব মুসলিম খেলাফতের পতন ! তুর্কি শাসনের উত্থান |

                                                            

আরও পড়ুন: মুসলমানদের সিন্ধু বিজয়ের ইতিহাস

৭০৫ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খেলাফতের রাজধানী দামেস্কের সিংহাসনে অধিষ্টিত হন পরাক্রমশালী খলিফা প্রথম ওয়ালিদ। তার শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা সুদূর ইউরোপের স্পেন,পুর্তগাল থেকে উত্তর আফ্রিকা, পশ্বিম আফ্রিকা থেকে পারস্য, মধ্য এশিয়া ও চীন থেকে ভারতবর্ষ পর‌্যযন্ত বিস্তিৃত হয়েছিল। মুসলিম বীর তারিক বিন যিয়াদ জয় করেন স্পেন, মুসা বিন নূসাইর উত্তর আফ্রিকা এবং কুতাইবা বিজয় করেন চীনের কাশগড় ও মধ্য এশিয়া।

এই সময়ে খলিফা ওয়ালিদের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহের সুযোগ্য শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের অদম্য প্রচেষ্টায় সর্বপ্রথম একটি সুসংঘবদ্ধ মুসলিম অভিযান ভারত বর্ষে প্রেরিত হয়। আর এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন হাজ্জাজের জামাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র ১৭ বছর বয়সি তরুণ মুসলিম বীর মুহাম্মদ বিন কাসিম।

                                                           মুহাম্মদ বিন কাসিম

৭১২ খ্রিস্টাব্দে অত্যচারি হিন্দু রাজা দহির ও তার বিশাল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারতবর্ষের সিন্ধু ও মুলতান বিজয় করেন। এই বিজয়ের ফলে ভারতীয় ‍উপমহাদেশের উক্ত অঞ্চল সমূহ মুসলিম সাম্রাজ্যে ভুক্ত হয়ে পড়ে এবং ভারতবর্ষে মুসলিম বিজয়ের সূচনা হয়। অতপর মুহাম্মদ বিন কাসিম উমাইয়া খেলাফতের প্রতিনিধি হিসেবে সিন্ধুর শাসনভার গ্রহণ করেন।

তার সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে তিনি শাসনব্যবস্থাকে সহনশীলতা, উদারতা, ন্যায়বিচার ও পরমত সহিষ্ণুতার ‍উপর সুপ্রতিষ্টিত করেন। মুসলিম বিজয়ের পূর্বে বর্ণভেদ ও জাতিভেদ প্রথা এবং ব্রাক্ষণবাদী শোষণের প্রতি সিন্ধুর গণমানুষ বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। এই অপশাসন সমূলে উৎপাটন করে মুহাম্মদ বিন কাসিম ইনসাফভিত্তিক ইসলামী শাসনব্যবস্থা চালু করেন। এর ফলে সকলে ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে।

আরও পড়ুন: ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন

এমনকি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ মন্দিরসমূহ সরকারি খরচে মেরামত করা হয়। ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ভারত বিজয়ী মহান বীর মুহাম্মদ বিন কাসিমের অকাল মৃ্ত্যু হয়। তার মৃ্ত্যুর পর হতে ৭৪২ খ্রিস্টাব্দে পর‌্যন্ত সিন্ধু ও মুলতান অঞ্চলে মুসলিম খেলাফতের শাসনের প্রাধান্য বিদ্যমান ছিল সত্য কিন্তু শাসনকাল চিরস্থায়ী হতে পারে নি। এদিকে ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে খলিফা ওয়ালিদের মৃত্যুর পর পরবর্তী উমাইয়া খলিফাদের সুষ্ঠ এবং সুপরিকল্পিত নীতির অভাবে বিজিত সিন্ধু ও মুলতান অঞ্চলে একের পর এক শাসক ‍নিযুক্ত ও অপসারিত হতে থাকে।

যার ফলে মুসলিম শাসকদের রাজনৈতিক ঐক্য ও সংহতি কায়েম করা সম্ভব হয় নি।অন্যদিকে ভারতবর্ষের শক্তিশালী হিন্দু রাজারা মুসলমানদের অভিযানকে প্রতিরোধ ও মুসলিম শাসনের অবসানের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। ফলে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন হুমকির মুখে পড়ে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের মৃত্যুর পর তৎকালীন ইরাকের শাসকর্তা ইয়াজিদ বিন মুহাল্লব তার আত্মীয় হাবিবকে সিন্ধুর শাসনভার অর্পণ করেন। এর পর খলিফা হিশামের রাজত্বে আল জুনাইদ সিন্ধুর শাসনকর্তা ‍নিযুক্ত হন।

আল জুনাইদের মুত্যুর পর তার দুর্বল উত্তরাদিকারীদের সময়ে সিন্ধু ও মুলতানে মুসলিম খেলাফতের আধিপত্য বিনিষ্ট হয়ে যায়। অবশেষে ৮৭১ খ্রীস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আল মুতামিদ এর শাসকালে সিন্ধু ও মুলতান প্রদেশে মুসলিম খেলাফতের আধিপত্যের অবসান ঘটে। নবম শতাব্দী শেষ ভাগে প্রদেশ দুটি বাগদাদ কেন্দ্রীক আব্বাসীয় খেলাফতের অধিকার থেকে মুক্ত হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: মুসলিম বিজয়ের পূর্বে ভারতের অবস্খা

এর ফলে মুলতান ও সিন্ধু প্রদেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন মুসলিম রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সৈয়দ বংশীয় নেতৃবৃন্দ সিন্ধু ‍উপত্যকায় স্বাধীনভাবে শাসনকর্ম পরিচালনা করতে থাকে। ৮৭১ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু উপত্যকায় সৈয়দ বংশের উত্থানের সাথে সাথে ভারতবর্ষে আরব মুসলিম খেলাফতের শাসনের অবসান ঘটে। এর পর আর কখনো কোন মুসলিম খলিফা ভারতবর্ষে অভিযান চালাতে সক্ষম হয়নি।

                                                              সুলতান মাহমুদ গজনবী

ভারতবর্ষের ভাগ্যকাশ থেকে আরব মুসলিম খলিফাদের শাসনের পতনের প্রায় ১০০ বছর পর তুর্কি মুসলিম শাসকদের হাত ধরে পুনরায় ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের উত্থান হয়। আর যে তুর্কী বীর শাসক প্রথম ভারতবর্ষে সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করেন তিনি হলেন সমগ্র ভারতবের্ষ ইসলামের পতাকা উড্ডিয়নকারী সুলতার মাহমুদ গজনবী। তিনি ১০০০ থেকে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দে পর‌্যন্ত ২৭ বছরে ১৭ বার ভারতবর্ষে অভিযান পরিচালনা করে ভারতবর্ষে পৌত্তলিকতা ধ্বংস করে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তাৎপর‌্যপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সুলতান মাহমুদ গজনবী ছাড়াও ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মুইজউদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরি এবং মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ও ছিলেন তুর্কি জাতীর মহান বীর। আর মুসলিম বীর মুহাম্মদ বিন কাসিম সর্বপ্রথম ভারতবর্ষের অঞ্চল বিজয় করে ইসলামের সত্যে, শান্তি ও মুক্তির বাণী ছড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে তার দেখানো পথে তুর্কি বীরেরা ভারতবর্ষ বিজয় করে মুসলিম শাসন ও ইসলামকে এই উপমহাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। 

আরও পড়ুন: সিন্ধু বিজয়ী মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবনী

তথ্যসূত্র :

  • ভারতবর্ষের ইতিহাস (মুসলিম ও ব্রিটিশ শাসন)- ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাছান।
  • ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস - এ.কে,এম আব্দুল আলীম। 
  • ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস - এ.কে.এম শাহানেওয়াজ।
  • ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস - মাহমুবুর রহমান।
  • ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ইতিহাস- ড. মুহাম্মদ গোলাম রসূল।
  • উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ