হুদায়বিয়ার সন্ধি : মুসলমানদের মহাবিজয় |

                                                           

                    পূর্বের অংশ পড়ুন : খায়বারের যুদ্ধ


৬২২ খ্রিস্টাব্দে হযরত মুহাম্মদ (স) মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের পর থেকে ৬২৮ খ্রি পর‌্যন্ত মহানবী (স) ও তার অনুসারীরা কেউ প্রাণপ্রিয় জন্মভূমি মক্কায় যাননি। ফলে সকলের মধ্যেই জন্মভূমি দর্শনের সুপ্ত বাসনা কাজ করছিল। এর প্রেক্ষিতে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে খন্দকের যুদ্ধে বিধর্মী বাহিনী পরাজিত করে মদিনায় নিজের অবস্থান সুসংহত এবং সুদৃঢ় করার পর মহানবী (স) প্রায় ১৪০০ সাহাবী সহ ওমরার করতে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

তারা দুই টুকরো ইহরামের কাপড় গায়ে জড়িয়ে বের হয়েছিলেন। তাদের কাছে আত্মরক্ষায় সামান্য তরবারি ছাড়া কোনো অস্ত্রও ছিল না। তাদের মধ্যে যুদ্ধের মানসিকতাই ছিল না। তাই তারা যুদ্ধের সাজ বা বর্ম কিছুই সঙ্গে নেননি। মোহাম্মদ (স) শুধু চাইছিলেন কাবাতে গিয়ে ওমরা সম্পন্ন করতে। কিন্তু তিনি সংবাদ পেলেন কুরাইশরা তাকে বাধা দিতে প্রস্তুতি নিয়েছে। তাই তিনি সোজা পথে না গিয়ে মক্কার অদূরে হুদায়বিয়া নামক একটি স্থানে পৌঁছলেন এবং তাবু স্থাপন করলেন। তিনি কুরাইশদের সাথে সংঘাত এড়িয়ে মক্কায় প্রবেশের জন্য সেখানেই অপেক্ষা করতে লাগলেন।

মক্কার লোকেরা মুসলিমদের এই কার্যক্রমকে প্রাথমিকভাবে স্পর্ধা হিসেবেই বিবেচনা করছিল। কারণ, মাত্র ছয় বছর আগে এই মুসলিমরাই মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিল। আর আজ তারা ফিরে এসে শহরে প্রবেশ করতে চাইছে। কিন্তু কুরাইশরা বুঝতেও পারছিল না, তারা কী করবে। যদি তারা মোহাম্মদ (স) এবং তার সঙ্গীদের মক্কায় প্রবেশের সুযোগ দেয়, তাহলে আরবের অন্য গোত্রদের কাছে তারা ছোটো হয়ে যাবে।

সবাই বলবে, অস্ত্রহীন একটি বাহিনীকেও কুরাইশরা নিয়ন্ত্রণ করতে বা দমাতে পারল না। তাছাড়া খন্দকের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার মক্কার কুরাইশদের শক্তি ও সামর্থ অনেকটা কমে গিয়েছিল। ফলে মুসলমানদের বিরোদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে, ঐতিহাসিকভাবে কুরাইশদের দায়িত্ব ছিল, যদি কেউ মক্কায় এসে হজ-ওমরা করতে চায়, তাহলে তারা তাকে সহযোগিতা করবে।

অতপর কুরাইশদের দূরভিসন্ধি জানতে পেরে মহানবী প্রথমে এক সাহাবীকে দূত হিসেবে মক্কার কুরাইশদের নিকট প্রেরণ করে তাদের জানালেন যে, তারা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। যুদ্ধ করতে নই বরং শুধু উমরা এবং পবিত্র কাবা ঘর পরিদর্শন করতে এসেছেন। এতেও মক্কার কুরাইশদের সম্মতি না পেলে মহানবী (স) প্রথমে কুরাইশ বিন উমাইয়া এবং পরে ওসমান (রা) কে সন্ধীর প্রস্তাব দিয়ে প্রেরণ করেন।

এদিকে মক্কা থেকে ওসমান (রা) এর প্রাত্যবর্তনে বিলম্ব হলে মুসলিম শিবিরে রব উঠে, কাফেররা ওসমান (রা”) কে হত্যা করেছে। ফলে মুসলিম যোদ্ধাগণ ওসমান (রা) এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য দীপ্ত কন্ঠে শপথ গ্রহণ করে। ইসলামের ইতিহাসে এই শপথ বায়াতুর রিজওয়ান বা Pledge of good pleasure বলা হয়।

এই শপথের সংবাদ মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌছালে তারা হযরত উসমান (রা) কে ছেড়ে দেন এবং সুহাইল বিন আমরকে শান্তির প্রস্তাব নিয়ে মোহাম্মদ (স) এর নিকট প্রেরণ করেন। অনেক আলাপ আলোচনার পর কুরাইশ নেতা ও মোহাম্মদ (স) এর মধ্যে একটি চুক্তি সাক্ষরিত হয়। চুক্তিটিকে ঐ স্থানের নামানুসারে হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে অভিহিত করা হয়। হুদাবিয়ার সন্ধির শর্তাবলি ছিল-

                   

১. মুসলিমগনে এ বছর উমরা বা হজ না করে মদিনায় ফিরে যাবে।

২. আগামী বছর তথা ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানরা মক্কায় এসে হজ করতে পারবে। তবে তারা তিন দিনের বেশী মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না, আর এই তিনদিন মক্বাবাসীগণ নগর ছেড়ে অন্যত্রে  অবস্থান করবে।

৩. হজ করতে আসার সময় মুসলমানরা আত্মরক্ষার জন্য কোষবদ্ধ তরবারি ছাড়া আর কিছুই আনতে পারবে না।

৪. মক্কার কোন নবদীক্ষিত মুসলিম মদিনায় গিয়ে আশ্রয় চাইলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।

৫. পক্ষান্তরে মদিনা হতে কোন লোক মক্কায় আশ্রয় নিলে কুরাইশরা তাকে মুহাম্মাদ (স) এর নিকট ফিরিয়ে দিবে না।

৬. আগামী দশ বছরের মধ্যে অর্থাত ৬২৮-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর‌্যন্ত কুরাইশ ও মুসলিমদের মধ্যে যাবতীয় যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ থাকবে।

৭. চুক্তির সময়ে উভয় পক্ষের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে, কেউ লুন্ঠন বা আক্রমণ করবে না।

৮. আরবের যে কোন গোত্র বা গোত্রের লোক মুহাম্মাদ (স) অথবা কুরাইশদের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হতে কোন বাধা নিষেধ থাকবে না।

৯. সর্বশেষ সন্ধির শর্তাবলি উভয় পক্ষ পরিপূর্ণভাবে পালন করবে।

ইসলামের ইতিহাসে হুদায়বিয়ার সন্ধির গুরুত্ব ও এর সুদূর প্রসারী ফলাফল অপরিসীম। এ সন্ধির ফলে মক্কাবাসী আল্লাহর অস্তিত্ব, হযরত মুহাম্মদ (স) এর নবুয়ত এবং ইসলামের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেয়, ঠিক যেমনি ভাবে মদিনা সনদের মাধ্যমে মদিনাবাসী স্বীকার করেছিল। তাছাড়া এই সন্ধির পর অসংখ্য আরববাসী বিশেষ করে আরব বেদুঈন গোত্র সমূহ ইসলাম গ্রহণ করে। এমনকি অনেক মক্কাবাসীগণও ইসলামের সত্যের পথে সাথী হয়। ফলে মুসলমানদের সংখ্যা এবং ইসলামের শক্তি দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে।

প্রখ্যাত কুরাইশ বীর খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং আমর ইবনুল আস প্রমুখ এই সময় ইসলামের ‍সুশিতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই সন্ধির ফলে মক্কার কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ বিগ্রহ সমসাময়িকের জন্য বন্ধ হওয়ায়, মুসলমানরা শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পায় এবং ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হওয়া খায়বারের যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক ইহুদি ও দুর্দর্ষ আরব বেদুঈন গোত্র সমূহকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।

৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (স) মাত্র ১৪০০ জন সাহাবী নিয়ে মাতৃভূমি মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন কিন্তু সন্ধির ফলে মাত্র তিন বছর তথা ৬২৮-৬৩০ পর‌্যন্ত সময়ে সাহাবীদের সংখ্যা দাড়ায় প্রায় ১০,০০০ জনে। এই ১০,০০০ জন সাহাবী নিয়ে তিনি ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হুদায়বিয়ার সন্ধি ফলে মহানবী (স) পরবর্তীতে মক্কা বিজয় করে আরব উপদ্বীপে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠত করতে এবং ইসলামের মহান বাণী আরবের বাহিরেও প্রচার করতে সক্ষম হন। তাই মহান আল্লাহ মহাগ্রন্থ আল কুরআনে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে ফাতহুম মুবিন বা সুস্পষ্ঠ মহাবিজয় বলে অভিহিত করেছেন।

পরবর্তী অংশ পড়ুন : মুলতবি হজ : মুসলমানদের বিজয়ের বেশে মক্কায় ফেরা।

তথ্যের উৎস সমূহ:

১. আরব জাতির ইতিহাস - শেখ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ।
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান 
৩. ইসলামের ইতিহাস  ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।

৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ