পূর্বের অংশ পড়ুন : মহানবীর (স) সাথে ইহুদিদের সম্পর্ক।
মুসলমানদের প্রধান শত্রু ইহুদিগণ মদীনা থেকে
বিতাড়িত ও নির্বাসিত হয়ে খায়বার নামক স্থানে বসবাস শুরু করে এবং সুসংগঠিত হতে থাকে। খায়বার
ছিল সিরিয়ার প্রান্তরে এক বিশাল মরূময়, শ্যামল এবং
শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অনেকগুলো দুর্গ সহ একটি উপত্যকা। মদিনা
হতে ১৫০ মাইল দূরে এটি অবস্থিত।
৬২৭
খ্রিস্টাব্দের খন্দকের যুদ্ধে আরব বেদুঈন গোত্র সমূহ,
মক্কার কুরাইশ এবং ইহুদিদের সম্মিলিত জোট মুসলমানদের কাছে পরাজিত হওয়ার
পরও তারা ক্ষান্ত হয় নি।
বিশেষকরে ইহুদিরা কোনভাবেই মদিনা রাষ্ট্রকে মেনে
নিতে পারছিলনা।
মদিনা
থেকে নির্বাসিত হওয়া এবং খন্দকের যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা আবারও মদীনা আক্রমণের
সুযোগ খুজে এবং আক্রমনাত্মক কার্যকলাপ করতে থাকে। এদিকে
খন্দকের যুদ্ধে পরাজয়ের পর মক্কার কুরাইশদের ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি অনেকটাই কমে
যায়। তাছাড়া
ইতিপূর্বে অর্থাৎ ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মক্কার কুরাইশ এবং মুসলমানদের মধ্যে সাক্ষরিত হয়
ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধি।
এই সন্ধি অনুসারে উভয় পক্ষের মধ্যে আগামী ১০
বছর পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ থাকবে বলে স্থির হয়। ফলে
মক্কার কুরাইশরা আপতত মুসলমানদের পথ থেকে সরে দাড়ায়। মক্কার
কুরাইশদের সহযোগিতা না পেয়ে খায়বারে অবস্থানরত ইহুদিরা আরবের দুর্দর্ষ বেদুঈন গোত্র
বনু সাদ এবং বানু গাতফানদের মুসলমানদের বিরোদ্ধে উত্তেজিত করতে থাকে।
তাছাড়া মদীনার মুনাফিকরা গুপ্তভাবে মুসলমানদের
সমস্ত সংবাদ সরবারহ করে ইহুদিদের উত্তেজিত তুলে। মোহাম্মদ
(স) ইহুদিদের সাথে সন্ধির প্রস্তাব করলেও মুনাফিকদের
উস্কানির কারণে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে
যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠে। তাছাড়া
ইহুদি ও বেদুইন গোত্র সমূহ মদীনার সীমান্তবর্তী এলাকায় লুটপাত করতো। মুসলমানদের
কাফেলায় আক্রমণ চালাতো এমনকি তারা মুসলিম নারীদের অপহরণের মত জগন্য কাজও করতো।
এই সকল দুস্কৃতিকারীদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য
মহানবী
(স)ও সমর প্রস্তুতি নিতে বাধ্য হন। অপরদিকে
খায়বারে অবস্থানরত বানু নাজির ও বানু কুরাইজা গোত্রের ইহুদিগণ মদিনা রাষ্ট্র ও ইসলামকে
ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নেতৃত্বে মোনফিক সম্প্রদায়,
বানু সাদ, বানু ঘাতফান এবং অন্যান্য আরব বেদুঈন
সম্প্রদায় মিলে ৪০০০ হাজার সৈন্যের একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে।
এবার মোহাম্মদ
(স) বিধর্মীদের মদীনা আক্রমণের সুযোগ না দিয়ে,
মুসলমানদের ইতিহাসে প্রথমবারের মত আক্রমণাত্মক যুদ্ধ অভিযানের সিদ্ধান্ত
নিলেন।
৬২৮
খ্রিস্টাব্দের মে মাসে মোহাম্মদ (স) ইহুদিদের সম্মিলিত জোটকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য ২০০ জন অশ্বারোহী সহ মোট ১৬০০
মুসলিম যোদ্ধা নিয়ে খায়বারের অভিমুখে যুদ্ধ যাত্রা করেন।
যুদ্ধের প্রথমদিকে মোহাম্মদ
(স) হযরত আলী (রাঃ)
এর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে বেদুঈন গোত্র বনু সাদের বিরোদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে
বনু সাদ গোত্র পরাজিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ৫০০ টি উঠ ফেলে পলায়ন করে। এরপর
মোহাম্মদ
(স) ইহুদি শাসিত খায়বার উপত্যকা এবং বানু ঘাতফানিদের
মধ্যে যাতায়ত বন্ধ করেন।
প্রথমদিকে
ঘাতফানিরা মুসলমানদের বাধা দিতে চাইলেও, পরবর্তীতে
তারা ভয় পেয়ে মুসলমানদের সাথে একটি আগ্রাসণ বিরোধী চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এর
ফলে মুসলমানদের পিছন থেকে আক্রান্ত হওয়ার কোন সুযোগ থাকলো না।
আরব বেদু্ঈন গোত্র সমূহকে পরাজিত করে মুসলিম
বাহিনী ইহুদি শাসিত খায়বার উপত্যকা অবরুধ করেছিল। খায়বারে
ক্ষুদ্র-বৃহৎ অনেকগুলো ইহুদি গোত্র থাকলেও তার মধ্যে নায়িম, সাদ,
কামুখ এবং আল সালিম ছিল মূল দুর্গ। সর্বপ্রথম
মুসলিম বাহিনী হযরত আবু বকর রাঃ এবং উমর রাঃ এর নেতৃত্বে নায়িম ও সাদ দুর্গে অভিযান
চালিয়ে,
দুর্গ দুইটি বিজয় করে নেয়। কিন্তু
তারা দুই দিন তীব্র সংগ্রাম করার পরও অবশিষ্ট সালাম এবং কামুস দুর্গ জয় করতে পারছিল
না।
কামূস
দূর্গ ছিল পাহাড়ের উপর অবস্থিত ইহুদিদের সবচেয়ে সুরক্ষিত আর শক্তিশালি ঘাঁটি।
দূর্গের ভিতর খাবার আর পানির মজুদ ছিল পর্যাপ্ত, তাই ইহুদিদের
দূর্গের বাইরে আসার প্রয়োজন ছিল না। তাই কামূস
দূর্গে আবু বকর (রাঃ) এবং ওমর (রাঃ) নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী অভিযান চালালেও তা
ব্যার্থ হয়,
ফলে কামূস দূর্গ অজেয়ই থেকে যায়। এতে মুসলমানদের মনোবলেও খানিকটা
চিড় ধরে।
মুসলমানরা
তখন সবাই গিয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে বলেন, "হে আল্লাহর
রাসুল, মুসলমানরা কি তাহলে হেরে যাবে।" নবীজি তাদের অভয়
দিয়ে বলেন,"কাল সকালে আমি এমন একজনকে পতাকা দিবো,
যিনি আল্লাহ ও রাসুলের প্রিয়; আল্লাহ ও রাসুল
ও তার প্রিয়। আল্লাহ তার হাতেই দূর্গ জয় করাবেন ইন শা আল্লাহ।"
পরদিন
সকালে মুসলমানরা সকলে লাইনে দাঁড়ান সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি হওয়ার জন্য, কারণ
তারা জানতেন আর বিশ্বাস করতেন আল্লাহর নবীর কথা সবসময়ই সত্যি হয়। তবে পরদিন মহানবী
রাসূলে করিম (সঃ), হযরত আলী (রাঃ) এর হাতে যুদ্ধের সেনাপতির
দায়িত্ব দিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তার হাতে নিজের তরবারি জুলফিকার আর ইসলামের
পতাকা তুলে দিয়ে বললেন,
"এই পতাকা নিয়ে এগিয়ে যাও। আল্লাহ যতক্ষণ তোমার হাতে বিজয় না দেন, ততক্ষণ লড়াই করে যাও।"
হযরত
আলী (রাঃ) ছিলেন প্রচন্ড বলবীর্যবান ও পরাক্রমশালী অকুতোভয় সাহসী একজন যোদ্ধা।
তিনি প্রচন্ডবেগে মুসলমান সেনাবাহিনী নিয়ে কামূস দূর্গ আক্রমণ করতে গেলেন। দূর্গের
কাছে ইহুদিদের সাথে তার প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। দূর্গের গেটের সামনে ইহুদিদের
সবচেয়ে ভয়ংকর আর শক্তিশালী যোদ্ধা মারহাবের সাথে হযরত আলী (রাঃ) এর যুদ্ধ বাধে।
যুদ্ধে আলী রাঃ তাকে পরাজিত ও নিহত করেন। এরপর তিনি দূর্গের দরজা হাত দিয়ে খুলে
ফেলেন আর ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেন।
ফলে
দূর্গে ফাটল সৃষ্টি হয়,
আর মুসলমান সেনাবাহিনী দূর্গে প্রবেশ করে। কামুস দুর্গ জয়ের পর আল
সালিম সহ অন্যান ক্ষুদ্র-বৃহৎ দুর্গ সমূহ মুসলমানদের কাছে
আত্মসমার্পণ করে। এই যুদ্ধে অসাধারণ বীরত্বের জন্য নবী করিম (সাঃ), আলী (রাঃ) কে আসাদুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর সিংহ উপাধিতে ভুষিত করেন। খায়বারের
যুদ্ধে ইহুদিরা পরাজিত হওয়ার পরও মানবতার মুক্তির দূত মোহাম্মদ (স) তাদের ক্ষমা করে নির্বিঘ্নে সেখানে বসবাস করার
অনুমতি প্রদান করেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক ইহুদিরা জয়নব নামের এক ইহুদি নেতার
কন্যাকে দিয়ে বিষপ্রয়োগের মহানবী স. কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে।
কিন্তু
খাদ্যে বিষ প্রয়োগের ফলে মহানবী স. এর এক সাহাবী মৃত্যুবরণ
করলেও সৌভাগ্যক্রমে মহানবী (স) এর জীবন
রক্ষা পাই। তারপরও মহানবী স. সাহাবী বিসরের মৃত্যুর জন্য
জয়নবকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে সমস্ত ইহুদিদের ক্ষমা করেন এবং তাদের সাথে সন্ধি চুক্তির
মাধ্যমে খায়বারে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অনুমতি প্রদান করেন। চুক্তি মোতাবেক
ইসলামী রাষ্ট্রকে কর দেওয়ার মাধ্যমে ইহুদীদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জানমালের
পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। এই যুদ্ধে ১৯ জন সাহাবী শহীদ হয় এবং ইহুদিদের
পক্ষে ৯২ জন নিহত হয়।
খায়বারের
যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের প্রথম আক্রমণাত্মক অভিযান এবং বিজয়। এই যুদ্ধে বিজয়ের ফলে
ইহুদিদের বড় ধরণের ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটে এবং তারা আর কখনো মুসলমানদের উপর
প্রকাশ্যে হামলা করতে সাহস দেখায়নি। তাছাড়া হাজার হাজার বিধর্মী বাহিনী মাত্র ১৬০০
মুসলিম যোদ্ধার কাছে পরাজয়ের ফলে আরব উপদ্বীপে মুসলমানদের পরাশক্তি হিসেবে মেনে
নিতে সবাই বাধ্য হয়। খায়বারে যুদ্ধে বিজয়ের পথ ধরে ৬৩০ সালে মহানবী স. এর
নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মক্কা বিজয় করলে, মুসলমানদের
অগ্রযাত্রা রুধ করার মত কোন আরব শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। খায়বার জয়ের ফলে অপ্রতিরোদ্ধ
মুসলিম বাহিনী জন্য সুদূর পারস্য এবং রোমান সাম্রাজ্যে ইসলামের কেতন উড়ানোর বিজয়ের
দ্বার উন্মোচিত হয়্।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : মুলতবি হজ : বিজয়ের বেশে মুসলমানদের মক্কায় ফেরা
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট
0 মন্তব্যসমূহ