পূর্বের অংশ পড়ুন : খন্দকের যুদ্ধ
অমুসলিমদের প্রতি মোহাম্মদ (স) এর সদয় ও সহানুভূতিশীল ব্যবহার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মোহাম্মদ (স) এর উপর মারাত্মক নির্যাতন ও অত্যাচার চালানো সত্ত্বেও তিনি যে উদারতা প্রদর্শন করেন ইতিহাসে তার নজির সত্যিই বিরল। একথা চিরন্তন সত্য যে, ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদ (স) এর হিজরতের সময় তৎকালীন মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্র, ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিক সম্প্রদায় তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল।
অন্যদিকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ি মোহাম্মদ (স) মদিনায় শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন। এই সনদে মদিনার সকল সম্প্রদায়কে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করা হয় এবং মদিনা বহিঃশত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক সম্প্রদায় মুসলমানদের সাথে মদিনা রক্ষায় প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে বলে প্রতিশ্রুতি ও স্বাক্ষর প্রদান করে।
তৎকালীন মদিনায় ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য ছিল বানু নাজির, বানু কাইনুকা এবং বানু কুরাইজা। তাওরাত কিতাবের প্রতিশ্রুতি নবী হিসেবে ইহুদিরা মোহাম্মদ (স) কে হিজরতের সময় মদিনায় সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। কিন্তু এর মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে মহানবী (স) তথা মুসলমানদের সাথে ইহুদিদের সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।
সম্পর্কের অবনতি হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল- প্রথমত, ইহুদিরা মোহাম্মদ (স) কে মদিনায় শুধু ধর্মগুরু হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু মহানবী (স) যখন সামাজিক, রাজনৈতিক, সামরিক,ধর্মীয় এককথায় মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে সবক্ষেত্রে অজেয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখন ইহুদিরা মহানবী (স) এর বিরুধিতা করতে শুরু করে।
দ্বিতীয়ত, ইহুদিরা
সুদের ব্যবসা করে মদিনায় ধনী সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু
মহানবী
(স) সুদকে হারাম ঘোষণা করে নতুন ইসলামী অর্থনৈতিক
ব্যবস্থা প্রণয়ন করলে ইহুদিদের স্বার্থে আঘাত হানে । এতে
তারা মহানবী (স) এর প্রতি ক্ষুধ্য
হয়।
তৃতীয়ত, ইহুদিরা চেয়েছিল
মহানবী (স) ও মুসলিমগণ সমগ্র জীবন তাদের
উপর নীর্ভরশীল ও আশ্রিত থাকবে।
কিন্তু
বিভিন্ন কাজে ও নেতৃত্বে ইহুদিদের স্বার্থবাদী পরামর্শ মতো না চলায় ইহুদিরা মহানবী
(স) এর বিরোধিতা করতে থাকে।
সর্বোপরি, ৬২৪
খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের ফলে মহানবী (স) ও মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি পেলে ইহুদিরা সঙ্কিত হয়ে
উঠে।
এর
ফলে তারা মদিনা থেকে মুসলমানদের বিতাড়ন করে নিজেদের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে
মক্কার কুরাইশদের সাথে মিলিত হয়ে মুসলমানদের বিরোদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে।
অন্যদিকে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হওয়া উহুদের যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক ইহুদিরা মুসলমানদের গুপ্ত সংবাদ প্রেরণের মাধ্যমে মক্কার কাফেরদের সহায়তা করে। ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতকতা উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল। পরবর্তীতে ইহুদিরা আরব বেদুঈনগুলোকে মুসলমানদের বিরোদ্ধে প্ররোচিত করতে থাকে। এমনকি ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হওয়া খন্দকের যুদ্ধে ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজা মদিনা রাষ্ট্র ও মুসলমানদের বিরোদ্ধে গিয়ে অমুসলিম বাহিনীর ত্রিশক্তি জোটে যোগদান করে। এবং মুসলমানদের বিরোদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
শুধু তাই নই, ইহুদি কবিরা মুসলিম নারী ও ইসলামের বিধি বিধান নিয়ে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করতো। ইহুদি গোত্র বনি নাজির প্রথমে মহানবী (স) কে বিষপানে এবং পরবর্তীতে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার ব্যার্থ চেষ্টা করে। ইহুদিদের কুকর্মের কারণে মহানবী (স) তাদের অনেকবার ক্ষমা করলেও, প্রত্যেকবার তারা বিশ্বাসঘাতকা করতো।
অতঃপর মদিনা সনদের শর্ত ভঙ্গ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার কারণে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে বদরের যুদ্ধের পর ইহুদি গোত্র বনু কাইনুকা, ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ উহুদের যুদ্ধের পর বনু নাজির এবং সর্বশেষ ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে খন্দকের যুদ্ধের পর বনু কুরাইজাকে মহানবী (স) মদীনা থেকে নির্বাসিত করে শাস্তি প্রদান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই নির্বাসিত ইহুদিরা মদনিা থেকে ১৫০ কিমি দূরে অবস্থিত খাইবার নামক মরু অঞ্চলে দুর্ধর্ষ আরব বেদুঈন গোত্র বানু সাদ ও বানু ঘাতফানকে মুসলমানদের বিরোদ্ধে উত্তেজিত করতে থাকে।
এবং একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে খাইবারের প্রান্তরে মুসলমানদের বিরোদ্ধে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এই যুদ্ধে ইহুদিদের পরাজয় বরণ এবং জয়নব নামের এক ইহুদি নারির মোহাম্মদ (স) কে বিষপানে হত্যা চেষ্ঠা সত্ত্বেও মহানবী (স) জয়নব ব্যাতিত তাদের সবাইকে ক্ষমা করে খাইবারে বসবাসের অনুমতি প্রদান করেন। ইহুদিদের প্রতি মহানবী (স) যে দয়া ও নমনীয় ব্যবহার করেছেন তা ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
যদিও পরবর্তীতে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকার দায়ে ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উমর রাঃ সিরিয়া তথা সমগ্র আরব দেশ থেকে ইহুদিদের বিতাড়িত করে মুসলিম রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করেন। এরপর ইহুদিরা তাদের কুকর্মের জন্য আরব দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর পেরিয়ে যায় শতশত বছর। বিশ শতকের মধ্যভাগে বিশ্বাসঘাতক ইহুদিরা আমেরিকা ও ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ফিলিস্তিনিদের মাটিতেই প্রতিষ্ঠা করে অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের বিষপোড়া খ্যাত এই ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা চিরতরে বিলীন হয়েছে।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : খায়বারের যুদ্ধ
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট
0 মন্তব্যসমূহ