খন্দক, পরিখা বা আহযাবের যুদ্ধ : মুসলমানদের অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ ।

                                                       


  

পূর্বের অংশটি পড়ুন : দ্বিতীয় বদরের যুদ্ধ ও বীর মাওনার ঘটনা। 

একদিকে উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের বিপযর্য় অন্যদিকে বীর মাওনার ঘটনায় ৬৯ জন মুসলিম শিক্ষক ও ধর্মপ্রচারক সাহাবীকে হারানোর ফলে মহানবী (স) যখন এক কঠিন সময় পার করছিলেন। তখন মদীনা হতে বিতাড়িত ইহুদি সম্প্রদায়, দুর্দর্ষ আরব বেদুঈন এবং মক্কার কুরাইশরা সম্মিলিত জোট গঠন করে বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে মদিনার অভিমুখে যুদ্ধ যাত্রার প্রস্তুতি নিতে থাকে।

কাফেরদের উদ্দেশ্য ছিল এ যাত্রায় তারা মুসলমানদের পরাজিত করবে এবং মহানবী (স) এর নেতৃত্বকে আজীবনের জন্য বিনষ্ট করবে। যদিও তারা ইতিপূর্বে বারবার সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইসলামকে নিশ্চিন্ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু ইসলাম বিরাট বটবৃক্ষের ন্যায় দাড়িয়ে গিয়েছিল। তাই সহজে কাফেররা ইসলাম ও মুসলমানদের কোন ক্ষতি করতে পারছিল না।

এতকিছু সত্ত্বেও কাফেররা আরও একবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করতে থাকে। এ যুদ্ধের আরও কিছু কারণ ছিল- তার মধ্যে বিচ্ছিৃঙ্খল আরব বেদুঈন গোত্র সমূহের ইসলাম ও মুসলিম বিরোধিতা, বিশ্বাষঘাতক ও নির্বাসিত দুই ইহুদি গোত্রের কুপ্রচরনা, মদিনা রাষ্ট্র ও ইসলামের শক্তিবৃদ্ধি এবং কুরাইশদের স্বার্থ হানি ছিল খন্দকের যুদ্ধের মূল কারণ। প্রসঙ্গত উহুদের যুদ্ধের পর মহানবী (স) মক্কাবাসীর জন্য মদিনার পথ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল, ফলে তারা সিরিয়া ও মিশরের সাথে বাণিজ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়।

৬২৭ খ্রিঃ ৩১ মার্চ, মক্কার কুরাইশ বাহিনী, নির্বাসিত ইহুদি ও বেদুঈনদের একটি সম্মিলিত বাহিনী নিয়ে বিধর্মী সেনাপতি আবু সুফিয়ান মদিনার অভিমুখে যুদ্ধ যাত্রা শুরু করে। এই সম্মিলিত শক্তির সর্বমোট ১০,০০০ পদাতিক ও ৬০০ অশ্বারোহী সৈন্য ছিল। অরপদিকে তখন মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০০ জন। কুরাইশদের যুদ্ধ যাত্রার খবর পেয়ে মহানবী (স) মজলিশে সূরা তথা মন্ত্রণালয় পরিষদের বৈঠক আহবান করেন।

প্রসঙ্গত মদিনার তিনদিকে ঘর বাড়ি ও খেজুর বাগান ছিল এবং একদিক ছিল উন্মোক্ত। অতঃপর পারস্যের সাহাবী বিখ্যাত সমর বিদ হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) এর পরামর্শ ও মজলিশে সূরার সিদ্ধান্তক্রমে ৩০০০ মুসলিম বাহিনী ২০ দিনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে মদিনার উন্মোক্ত স্থানে ১০ হাত গভীর, ১০ হাত প্রস্থ এবং ৬ হাজার হাত দীর্ঘ পরিখা খনন করেন। পরিখার মধ্যে মুসলিম বাহিনী প্রতিরক্ষা বুহ্য তৈরি করে।

এই স্থানেই সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক খন্দকের যুদ্ধ। পরিখা খননের মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্র রক্ষার ব্যবস্থা করা হয় বলে একে খন্দক বা পরিখার যুদ্ধ বলা হয়। তাছাড়া কাফেররা সম্মিলিত ভাবে মুসলমানদের বিরোদ্ধে যুদ্ধ করেছিল বলে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ যুদ্ধকে আহযাব বা সম্মিলিত শক্তিসমূহের যুদ্ধ বলা হয়।

কাফের সেনাপতি আবু সুফিয়ান সম্মিলিত বাহিনীর ১০,০০০ সৈন্য নিয়ে মদিনার উপকন্ঠে তাবু স্থাপন করে। মহানবী (স) ও ৩০০০ হাজার সৈন্য নিয়ে কাফেরদের মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধনীতি অনুযায়ি প্রথমে মল্লযুদ্ধ এবং পরে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এসছিল। কিন্তু শত্রুরা মুসলমানদের অভিনব যুদ্ধ কৌশল ও পরিখা খনন দেখে হতভম্ব ও বিস্মিত হয়ে যায়। কাফেরদের অশ্বারোহী ও উষ্ট্র বাহিনীও পরিখা দেখে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে।

কারণ ইতিপূর্বে আরবে এমন কৌশল অবলম্বনকরে কেউ যুদ্ধ করেনি। কাফের বাহিনী মুসলমানদের সকল প্রস্তুতি দেখে একযোগে পরিখায় মদিনার প্রতিরক্ষারত থাকা মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু খালিদ বিন ওয়ালিদ, ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের মত প্রমুখ খ্যাতনামা কুরাইশ বীররা মুসলিম বাহিনীর পাল্টা আক্রমণের মুখে টিকতে পারলো না।

সম্মুখ যুদ্বে সুবিধা করতে না পেরে কাফেররা মদিনা রাষ্ট্র অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু অবরোধের মেয়াদ যতই দীর্ঘ হয়, ততই কাফেরদের মনোবল হ্রাস পেতে থাকে। তখন শীতকাল হওয়ায় শত্রুতা কোন প্রকারের সুবিধা করতে পারছিল না। অন্যদিকে মহানবী (স) তার কূটনৈতিক বুদ্ধির দ্বারা কাফেরদের সম্মিলিত জোটের মধ্যে ভাঙ্গন ধরার চেষ্টা করেন এবং তিনি সফল হন। তাদের জোট ভেঙে্গ যাওয়ার ফলে কাফেরদের শক্তিও কমতে থাকে।

অতপর দীর্ঘ ২৭ দিন অবরোধ শেষে একদিন প্রবলবেগে বায়ু প্রবাহিত হয়। এতে কাফেরদের তাবুগুলো লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ঘোড়াগুলো ছুটাছুটি করতে থাকে। এরপর কুরাইশ, ইহুদি ও বেদুইনদের সম্মিলিত জোট পরাজিত ‍ও হতাশ হয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। আবু সুফিয়ানও বিফল মনোরথে বাধ্য হয়ে মক্কায় প্রাত্যবর্তন করতে বাধ্য হয়। প্রসঙ্গত এই বায়ু এসেছিল মুসলমানদের সহযোগিতা করার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে।

 এই প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে (প্রচণ্ড) ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে পাচ্ছিলে না। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।” [সূরা আহযাব, আয়াত – ৯]

 এ যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার ফলে মক্কার কুরাইশদের এমন দূরবস্থা হয় যে, তারা পরবর্তিতে মুসলমানদের বিরোদ্ধে যুদ্ধে করার মত সাহস ও শক্তি উভয় হারিয়ে পেলে। মক্কার কুরাইশদের মত এ যুদ্ধে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়ে ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজা। তারা মদিনা সনদের লঙ্ঘন করায় চুক্তির শর্ত অনুযায়ি তাদের শাস্তি পেতে হয়। বিশ্বাসঘাতকার শস্তি স্বরূপ তাদের অনেক পুরুষকে মৃত্যুদন্ড এবং শিশু-বৃদ্ধ ও নারী নারিদের নির্বাসিত করা হয়।

বদরের যুদ্ধের মত খন্দকের যুদ্ধও ইসলামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও যুগন্তকারী ঘটনা। বদর, উহুদ এবং খন্দকের যুদ্ধে কুরাইশ তথা বিধর্মীদের পরাজয়ে মুসলমানদের মনোবল যত চাঙ্গা হয়, তেমনি কাফেরদের নৈতিক মনোবল তত ভেঙ্গে যায়। গোটা আরবের সম্মিলিত শক্তিকে ব্যবহার করেও কুরাইশদের পরাজয় গোটা আরবে মুসলমানদের মর‌্যদা বহুগুনে বৃদ্ধি করে দেয়। এ যুদ্ধে জয়ের ফলে আরবের সাথে সাথে সুদূর পারস্য এবং রোমান সাম্রাজ্যেও মুসলমানদের বিজয়ধ্বনিতে কম্পিত হতে থাকে। বলা যায়, ইসলামের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে খন্দকের যুদ্ধ। এই যুদ্ধের পরই মুসলমানরা দুর্বার গতিতে এগিয়ে যায়। এবং এ যুদ্ধের পটভূমিতে হুদাবিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয় সম্ভব হয়।

পরবর্তী অংশ পড়ুন : মহানবীর (স) সাথে ইহুদিদের সম্পর্ক।

তথ্যের উৎস সমূহ:

১. আরব জাতির ইতিহাস - শেখ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ।
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান 
৩. ইসলামের ইতিহাস  ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।

৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট  

                                             

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ