মহানবীর (স) ওফাত এবং নবুয়তের অবসান।

                                                                 


৬৩২ খ্রিস্টাব্দে শেষবারের মত হজ্জ সম্পন্ন করে মহানবী (স) আবারও মদিনায় ফিরে গেলেন, যেখানে তিনি ইসলামি সাম্রাজ্যের শক্ত ভিত্তি দাড় করিয়েছেন। প্রশিক্ষিত সাহাবিদের ইয়েমেন সহ আরবের বিভিন্ন দূরবর্তী স্থানে পাঠানো হলো, যাতে তারা ইসলাম গ্রহণকারী নওমুসলিমদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেন। আর রাসূল (স) এর উপস্থিতিতে মদিনা হয়ে উঠল জ্ঞান চর্চার নিবিড় এক কেন্দ্র, যা থেকে গোটা দুনিয়াতে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এমনকি রাসূল (স) এর অনুপস্থিতেও এই কাজে কোন সমস্যা হবে না।

অন্যদিকে উত্তরে বাইজেন্টাইনকে জয় করার জন্য প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপর শক্তিশালী বাহিনীও প্রস্তুত করা হলাে। এই প্রক্রিয়াগুলাে থেকে ইসলাম যুদ্ধনীতি প্রণীত হয়, যা পরবর্তী কয়েক শতাব্দীকাল ধরে মুসলিমদের উজ্জীবিত করে রেখেছে।

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো মুহাম্মাদ (স) কে আল্লাহ তার একজন বার্তাবাহক হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি মানুষকে আল্লাহর বাণীসমূহ পৌছে দিতে পারেন। গোটা মানবজাতির জন্য মহানবী (স) হলেন উত্তম আদর্শ, যিনি কুরআনের আলোকেই জীবনযাপন করে গেছেন। ২৩ বছর ধরে রিসালাতের দায়িত্ব পালন শেষে তাঁর দায়িত্ব পূর্ণ হলো। কুরআনের সকল আয়াত তখন হাড়ে, চামড়ায়, পাতায় লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, অনেক সাহাবি তখন গোটা কুরআন মুখস্থ করে ফেলেছেন।

যেহেতু আদিকাল থেকেই আরবরা দীর্ঘ কবিতা মুখস্থ রাখতে পারদর্শী, সে কারণে কুরআন মুখস্থ করতে সাহাবিদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। আর এভাবেই প্রকৃতিগতভাবে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থটি সংরক্ষিত হওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়।

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীষ্মের প্রথমদিকে জন্য মহানবী (স) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি প্রচণ্ড জ্বর ও মাথাব্যাথায় আক্রান্ত হন। এমতাবস্থায় তিনি তাঁর চাচাতো ভাই ও জামাতা আলী (র) এবং চাচা আব্বাস (স) -এর সহযোগিতায় চলাচল করতেন। যখন তিনি মসজিদে ইমামতি করার মতো শারীরিক সক্ষমতাও হারিয়ে ফেললেন, তখন ঘনিষ্ঠ সহচর আবু বকর (রা)-কে নামাজে ইমামতি করার দায়িত্ব দিলেন।

রাসূল এই জীবনের শেষ দিনগুলো তাঁর স্ত্রী আয়িশা (রা)-এর ঘরেই অতিবাহিত করেন, যা ছিল মসজিদে নববির একেবারে সন্নিকটে। তাই তার অনুপস্থিতিতে মুসলিমরা কীভাবে জামাতে নামাজ আদায় করছে, সেই দৃশ্যও তিনি ঘর থেকে।

দেখতে পান। নামাজে তাঁর এই অনুপস্থিতির বিষয়টি সাহাবিদের জন্য ভীষণ কষ্টদায়ক ছিল। বিশেষ করে, যারা এত দিন তাঁর দুঃসময়ে সব সময় তাঁর পাশে থেকেছেন, যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করেছেন, একসাথে মক্কা বিজয়। করেছেন, তাদের জন্য এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া অনেক কঠিন ছিল। কারণ, তাঁরা গোটা জীবনটাই রাসূল )-এর নেতৃত্ব ও পরামর্শের আলোকে পার করেছেন।

তাই রাসূল -এর মুখ থেকে অনবরত মৃত্যুর কথা শোনায় এবং নামাজে জামাতের ইমামতিতে তার অপারগতা সাহাবাদের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল। মহানবী (স)-এর শেষ দিনগুলো কাটে তাঁর স্ত্রী আয়িশা (রা)-এর সান্নিধ্যে। পরিবারের সদস্যরা এবং সাহাবিরা তখনও আশাবাদী ছিলেন যে, হয়তো তিনি পুনরায় সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু ইসলামের মৌলিক একটি বিষয় হলো একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যকে স্বীকার করে নেওয়া।

আল্লাহর রাসূল ও সব সময়ই শিক্ষা দিয়েছেন, কেবল আল্লাহই অবিনশ্বর, তা ছাড়া অন্য সব সৃষ্টি, সব প্রাণী, মানুষ সবাইকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সাহাবিরা মানসিকভাবে শক্তও হচ্ছিলেন। কারণ, রাসূল -এর অনুপস্থিতিতে ইসলামকে একইভাবে টিকিয়ে রাখতে হবে। তারপরও যে মানুষটি তাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছেন, বহু ঈশ্বর পূজার অসারতা থেকে বের করে এক আল্লাহর আনুগত্য করতে শিখিয়েছেন, গোত্রগত বিবাদের অবসান ঘটিয়েছেন, তাঁর অনুপস্থিতি। তারা কল্পনাও করতেও পারছিলেন না।

তারপরও সকলকে শোকের পাথারে ভাসিয়ে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন মহানবী (স) ইন্তেকাল করেন। আর এর মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুগের এবং ২৩ বছরের নবুওয়তি জীবনের সমাপ্তি ঘটল।


 তথ্যের উৎস সমূহ:

* আর রাহীকুল মাখতুম-

        লেখক : আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী

         অনুবাদ : খাদিজা আখতার রেজায়ী।

১. আরব জাতির ইতিহাস - শেখ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ।

২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান 

৩. ইসলামের ইতিহাস  ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট  

                               

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ