আল্লামা গোলাম আহমেদ মোর্তজার জীবনী

                                                           

ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসকে অমুসলিম ঐতিহাসিকরা যেভাবে বিকৃত করে বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করেছিল, তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে এবং সত্যিকারের ইতিহাসকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে যুগে যুগে অনেক বিখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিকদের আবির্ভাব ঘটে। ভারতীয় উপমহাদেশের জনপ্রিয় ইতিহাসবিদ ও গবেষক আল্লামা  গোলাম আহমাদ মোর্তজা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।

তিনি ১৯৩৮ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার মেমারিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বক্তা, গবেষক ও লেখক। তিনি দুই বাংলার অর্থাৎ ভারত বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন পলাশীর যুদ্ধ, অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ড, মহামতি আকবরের কথা সহ অনেক নতুন তথ্য তিনি প্রমাণসহ পেশ করেন।

 তার বই পাঠে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে পড়ে যায় পাঠক, কিন্তু গোলাম আহমাদ মোর্তজা এমনভাবে তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন। তাতে তাকে মেনে নিতে হয়েছে ভারতের বর্তমান ঐতিহাসিকদের। বিখ্যাত ইতিহাসবিদরা তার তথ্য মেনে নিয়েছেন এবং প্রশংসা করেছেন। ইতিহাসের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য দেন যা চাপা পড়ে ছিলো ইতিহাসের পাতায়। তিনি সেগুলোকে সামনে তুলে আনার চেষ্টা করেন।                                             

তাকে নিয়ে এ পর্যন্ত ভারতে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় তিনি বক্তব্য দিতেন এবং পশ্চিমবঙ্গে তিনি "বক্তা সম্রাট' নামে পরিচিত। তিনি বিখ্যাত হয়েছেন তার কয়েকটি ইতিহাসের বই ও ইতিহাসভিত্তিক বক্তব্যের মাধ্যমে। ইতিহাসের ইতিহাস, চেপেরাখা ইতিহাস, বাজেয়াপ্ত ইতিহাস, এ এক অন্যরকম ইতিহাস,বজ্র কলম, অনন্য জীবন, পুস্তক সম্রাটসহ অনন্য ইতিহাসের বইয়ের মাধ্যমে তিনি সর্বপ্রথম আলোচনায় আসেন।                   

ভারতের গতানুগতিক ইতিহাস বিষয়ক পাঠ্যপুস্তকগুলোতে মুসলিমদের নিয়ে লিখিত বিভিন্ন তথ্য তিনি বানোয়াট দাবী করেন। সেই তথ্যগুলোর বিরোধিতা করেন এবং সেগুলো মিথ্যা তথ্য তিনি প্রমাণসহকারে খণ্ডন করার চেষ্টা করেন এই বইগুলোতে। পাশাপাশি বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজি, রাজা রামমোহন রায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দেবেন্দ্ররনাথ ঠাকুর সম্বন্ধে সমালোচনা করেন তিনি, তাদের চাপা পড়া ইতিহাস সামনে তুলে এনে প্রমাণসহকারে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন।                

এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সরকার ১৯৮১ সালে তার ‘ইতিহাসের ইতিহাস’ বইটি বাজেয়াপ্ত করে। এরপর তিনি একের পর এক ইতিহাসের বই প্রকাশ করতে থাকেন, যার বেশির ভাগ বই সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের সরকার বাতিল করে। কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রতিটি বই বিপুল ভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তার বইগুলো করাচিতেও উর্দু ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।

গোলাম আহমেদ মোর্তজা রাসূল সাঃ এর জীবনীও লিখেছিলেন। সর্বশেষ "ধর্মের সহিংস ইতিহাস” নামের একটি গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেন। তিনি পবিত্র কুরানের আনুবাদও করেন। তিনি একদিকে ছিলেন যেমন সুবক্তা সুলেখক তেমনি ছিলেন সফল সমাজ কর্মী। তাঁর একান্ত উদ্যোগে বর্ধামানের মেমারিতে গড়ে ওঠে মদিনাতুল উলুম এবং মামুন ন্যাশনাল স্কুল। তিনি প্রথাগত শিক্ষার উর্ধ্বে উঠে কর্মমুখী শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। মাদ্রাসাতেও তিনি ভোকেশনাল ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেন।       

এই বিখ্যাত বাঙালি ইতিহাসবিদ, বুদ্ধিজীবী গবেষক  গত বৃহস্পতিবার তথা ১৫ এপ্রিল,  

২০২১সালে ভোর ৩টা ৩৫ কলকাতার জিডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । 

মৃত্যুকালে বর্ষীয়ান এই ইতিহাসবিদের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি পুত্র এক কন্যা

দেশ দেশের বাইরে অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী রেখে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বাংলাদেশ 

সহ সমগ্র পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষি পাঠকদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত ছিলেন প্রতিথযশা 

ইতিহাসবিদ আল্লামা গোলাম আহমেদ মোর্তজা।

       ভিডিও দেখুন:

                                                                          

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ