উসামার সিরিয়া অভিযান। আবু বকরের (রা) । রাশেদিন খেলাফত ।

                                                             



আরও পড়ুন: মহানবীর (স) বিদেশে দূত প্রেরণ
      

৬২৮ খ্রিস্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স) ইসলামের দাওয়াত পত্র নিয়ে, হারিস ইবনে উমাইয়া (রা) দূত হিসেবে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু যাত্রাপথে সিরিয়ার রোমান প্রাদেশিক শাসনকর্তা শুরাহবিল হারিস (রা) কে হত্যা করে। এরপর মহানবী (স) দূত হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে যায়েদ ইবনে হারিস, জাফর এবং আব্দুল্লাহ (রা) এর নেতৃত্বে শুরাহবিলের বিরোদ্ধে যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করেন।

এর প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক মু‘তার যুদ্ধ। যুদ্ধে তিনজন সেনাপতি শাহাদাত বরণ করলে পরবর্তীতে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে মুসলিম বীর খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। এই যুদ্ধে মাত্র ৩০০০ জন মুসলিম মুজাহিদ ১ লক্ষের অধিক খ্রিস্টান বাহিনিকে পরাজিত করেছিল। এই যুদ্ধে বিজয়ের ফলে সিরিয়ার অনেক আরব খ্রিস্টান গোত্র ইসলাম গ্রহণ ও মহানবীর (স) আধিপত্যকে স্বীকার করে নেয়।                     

যুদ্ধে শহিদ সেনাপতি যায়িদ ইবনে হারিস ছিলেন হারিস ইবনে উমাইয়ার পুত্র। মুতার যুদ্ধের কয়েক বছর পর, সিরিয়ার খ্রিস্টান  আরব গোত্র সমূহ পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাদের বিদ্রোহ দমন এবং পিতা ও দাদার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য, মহানবী (স) যায়েদের পুত্র উসামা বিন যায়েদের নেতৃত্বে, সিরিয়ায় অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (স) এর ওফাতের কারণে এই অভিযান স্থগিত হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: মু‘তার যুদ্ধের ইতিহাস

মহানবীর (স) ওফাতের পর আবু বকর (রা) মুসলিম জাহানের খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় মহানবীর (স) ওফাতের সুযোগে অনেক আরব গোত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে, অনেকে ইসলামের ফরজ বিধান যাকাত আদায়কে অস্বিকার করে। এমনকি অনেক নেতা মিথ্যা নবুওতের দাবি করে। তাছাড়া রোমান সাম্রাজ্য মদীনা আক্রমণের সুযোগ খুজতে থাকে।

এই দু:সময়েও মহানবী (স) এর অন্তিম ইচ্ছা পুরণের উদ্দেশ্য খলিফা আবু বকর (রা) উসামার নেতৃত্বে সিরিয়ায় অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মদিনার নিরাপত্তার কথা ভেবে সেনাবাহিনীকে বিভক্ত না করার জন্য, হযরত ওমর (রা) সহ অনেক সাহাবী, আবু বকর (রা) কে এই অভিযান স্থগিত করার জন্য অনুরোধ করেন। তাছাড়া যদি একান্ত অভিযান প্রেরণ করতে হয়, তাহলে ১৯ বছর বয়সী উসামার পরিবর্তে একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ সেনাপতি নিযুক্ত করার জন্য আহবান জানান তারা।                                  

উসামার নেতৃত্বে সিরিয়া অভিযানকে ঘিরে যখন সাহাবীদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিচ্ছিল, তখন আবু বকর (র) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, শপথ ঐ মহান সত্ত্বার, যার হাতে আমার প্রাণ, যদি মদিনা লোকশূন্য হয়ে যায়, আর আমি একাকী হয়ে পড়ি, তবুও রাসূল (সা) নির্দেশ ও অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী উসমান নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করবই। এরপর সব সাহাবী সিরিয়া অভিযানের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করে।

 আরও পড়ৃন : আবু বকরের খেলাফত লাভ

অতপর ৬৩২ খ্রি. আবু বকর (রা) উসামা বিন যায়েদের নেতৃত্বে ৭০০ জন মুসলিম মুজাহিদ নিয়ে সিরিয়ায় অভিযান প্রেরণ করেন। যাত্রাপথে তারা জুরাফ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে এবং সেখান থেকে সিরিয়ায় অভিযান শুরু করেন। প্রথমে তিনি কোজা গোত্রের লোকদের আক্রমণ করে তাদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন।

এরপর তিনি উবনা নামক স্থানে গমন করেন। উবনা ছিল ভূমধ্যসাগরের নিকটে আসকালান ও জাফফার মধ্যবর্তী শহর। ‍উবনায় দুই মাস অবস্থানকালে তিনি সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করে বিদ্রোহী আরব গোত্র সমূহকে পরাজিত করে মদীনা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার এবং কর দানে বাধ্য করেন। অবশেষে সিরিয়া অভিযান সাফল্যমন্ডিত হয় এবং তিনি বিজয়ীর বেশে মদিনায় প্রাত্যবর্তন করেন।                   

সিরিয়ার সফল অভিযানের ফলে বিদ্রোহী আরব গোত্র সমূহ এবং বায়জান্টাইন সাম্রাজ্য বুঝতে পারে যে, নব প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্র মহানবী (স) এর ওফাতের পরও শক্তিশালী ও সুসংবদ্ধ। অপরদিকে আবু বকর (রা) এর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এবং মহানবী (স) এর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের ফলে মুসলমানদের মনে আত্মবিশ্বাস এবং অনমনীয় মনোভাবের জন্ম নেয়। এরুপ মনোভাবের কারণেই পরবর্তীতে ইসলাম ধ্বংসকারী ভন্ডনবীদের নির্মূল করা সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন : আবু বকরের (রা) যাকাত বিরোধীদের বিরোদ্ধে অভিযান

💻তথ্যের উৎস:

📌ইসলামের ইতিহাস- সৈয়দ মাহমদুল হাসান 📌ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি- সৈয়দ মাহমুদুল হাছান 📌ইসলামের ইতহিাস- মুহাম্মদ মিজানুর রশিদ 📌আরব জাতীর ইতিহাস- শেখ লুতফর রহমান 📌দ্যা লস্ট ইসলামিক হিস্ট্রি- ফিরাস আল খতিব 📌আবু বকর সিদ্দিক (রা)- ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি 📌খিলাফতে রাশেদা- মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম

                       

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ