ইয়ামার যুদ্ধ ছিল রিদ্দার যুদ্ধের একটি অংশ। হযরত মুহাম্মদ (স) এর জীবদ্দশায় মধ্য আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত হানিফ গোত্রের দলপতি মুসায়লামা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কুরআনের ভাষা নকল করার মাধ্যমে জনসাধরণকে সে বিভ্রান্ত করে আল্লাহর ওহী বলে প্রচার করত।
আরও পড়ুন : যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরোদ্ধে অভিযান
সর্বপরি সে নিজেকে নবী
বলে দাবী করে। শুধু তাই নয় মুসায়লামা নিজেকে মহানবী (স) এর সমপরযায় ভুক্ত দাবি
করত। তাছাড়া আরেক মহিলা ভন্ড নবী সাজাহ মুসলামনদের কাছে পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়ে
তার সাথে একত্রিত হয়। তারা এক সাথে মিলিত হয়ে ইসলামের সার্বভৌমত্বের বিরোদ্ধে
চ্যালেন্জ ঘোষণা করে। এরপর বনি হানিফ, সাজাহ বাহিনী এবং আরবের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি গোত্রের প্রায় ৪০,০০০
লোকের একটি বিদ্রোহী বাহিনী গঠন করে মুসায়লামা ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস করতে উদ্যত
হয়।
অতপর ইসলাম ও মদিনা রাষ্ট্রের মরযদা রক্ষার জন্য খলিফা আবু বকর (রা) বিখ্যাত সেনাপতি ইকরামা ও শুরাহবিলের নেতৃতে্ব একটি মুসলিম মুজাহিদ দলকে মুসায়লামা ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করতে প্রেরণ করেন। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। মধ্য আরবের ইয়ামামর প্রান্তরে ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হওয়া এই যুদ্ধে মুসায়লামার বাহিনির কাছে মুসলিম বাহিনী পরাজয় বরণ করে।
মুসলমানদের পরাজয়ে বিচলিত
হয়ে আবু বকর (রা) বীরশ্রেষ্ঠ খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) এর নেতৃত্বে পুনরায় মুসায়লামার
বিরোদ্ধে যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করেন। এবার
খালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহনীর প্রচন্ড আক্রমণে মুসায়লামার বাহিনী পরাজিত
হয়ে আকরাবা নামক একটি প্রাচীর বেষ্টিত বাগানে আশ্রয় গ্রহণ করে।
আরও পড়ুন : ভন্ডনবীদের বিরোদ্ধে যুদ্ধ অভিযান
এই স্থানে উভয় পক্ষের তীর নিক্ষেপের ফলে বহু সৈন্য নিহত হয়। যুদ্ধের এক পরযায়ে বার বিন মালিক নামাক এক মুজাহিদ অসামান্য বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে প্রাচীর টপকিয়ে বাগানে প্রবেশ করে এবং দুর্গের ফটক খোলে দিতে সক্ষম হয়। সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম বাহিনী বিপুল বিক্রমে বাগানে আশ্রিত মুসায়লামর বাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। যুদ্ধের এক পরযায়ে ওয়াহাশী নামক এক নিগ্রো মুসলিমের বর্শার আঘাতে মুসায়লামা নিহত হয়।
ইয়ামামার যুদ্ধে মুসায়লামা সহ প্রায় ১০ হাজার শত্রু সৈন্য নিহত হয় এবং অনেকেই বন্দিত্ব বরণ করে। অপরদিকে ৩০০ জন কুরআনে হাফেজ সহ প্রায় ৭০০ জন মুজাহিদ শহিদ হয়। এই যুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ এত অধিক পরিমাণের ছিল যে, ঐতিহাসিকরা এটিকে মৃত্যু উদ্যানের যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে ইয়ামামর যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পর একদিকে বিদ্রোহী হানিফ গোত্রের লোকেরা পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে মদীনা রাষ্ট্র ও খলিফার আনুগত্য স্বীকার করে।
আরও পড়ুন: উহুদের যুদ্ধ
অন্যদিকে আরবের আর কোন
গোত্র ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোদ্ধে বিদ্রোহ করতে এবং কোন দলপতি নিজেকে নবী দাবী করতে
সাহস করেনি। ফলে ইসলামী রাষ্ট্র আরও একটি বড় ধরনের বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাই।
ইয়ামামর যুদ্ধে ৩০০ জন কুরআনে হাফেজ শহিদ হওয়ার কারণে কুরআন লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজন
দেখা দেয়। হযরত ওমর (রা) এর প্রস্তাবে আবু বকর (রা) কুরআন শরীফ লিপিবদ্ধ করেন। এভাবে
একটানা যুদ্ধ বিগ্রহ ও পরিশ্রমের ফলে মধ্য ও উত্তর আরবের ভন্ডনবীদের চিরতরে দমন
করা সম্ভব হয়। এর ফলে গোটা আরবে শান্তি-শৃঙ্খলা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
💻তথ্যের উৎস:
📌ইসলামের ইতিহাস- সৈয়দ মাহমদুল হাসান 📌ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি- সৈয়দ মাহমুদুল হাছান 📌ইসলামের ইতহিাস- মুহাম্মদ মিজানুর রশিদ 📌আরব জাতীর ইতিহাস- শেখ লুতফর রহমান 📌দ্যা লস্ট ইসলামিক হিস্ট্রি- ফিরাস আল খতিব 📌আবু বকর সিদ্দিক (রা)- ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি 📌খিলাফতে রাশেদা- মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম
0 মন্তব্যসমূহ