রাশেদিন খিলাফতের ইতিহাস। হযরত আবু বকর (রা) এর খেলাফতকাল। আবু বকর (রা) এর ওমান, বাহরাইন এবং ইয়ামেনে বিদ্রোহ দমন।
আবু বকর (রা) এর খেলাফতকালে সংঘটিত হওয়া ঐতিহাসিক রিদ্দার যুদ্ধের তিনটি পরযায় ছিল। প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধ অভিযান ছিল যাকাত অস্বীকারকারী আরব গোত্রদের বিরোদ্ধে, দ্বিতীয় পরযায় ছিল ভন্ডনবীদের বিরোদ্ধে এবং তৃতীয় ও সর্বশেষ পর্যায়ে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহী গোত্রদের বিরোদ্ধে যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করা হয়। মধ্য ও উত্তর আরবের ভন্ডনবীদের বিদ্রোহ দমন করে হযরত আবু বকর (রা) দক্ষিণ ও পূর্ব আরবের বিদ্রোহ গোত্রদের বিরোদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। দক্ষিণ ও পূর্ব আরবের বিদ্রোহী অঞ্চলগুলোর মধ্যে বাহারায়েন, ওমান এবং ইয়ামেন ছিল অন্যতম প্রদেশ।
আরও পড়ুন: ভন্ডনবীদের বিরোদ্ধে অভিযান
মহানবী (স) এর সময়ে বাহারাইনের শাসক ছিলেন মুনজির। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মহানবী (স) ও মদিনা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। কিন্তু মহানবী (স) এবং মুনজিরের ইন্তেকালের পর বাহরাইনের বনি বকর গোত্র পারসিকদের সহয়তায় ইসলাম ত্যাগ করে মদিনা রাষ্ট্রের বিরোদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তবে বাহারাইনের ধর্মভিরু কায়েস গোত্র বনু বকরের কার্যকলাপের বিরোধিতা করে এবং বিদ্রোহ দমন করতে মদীনা রাষ্ট্রের সহযোগিতার অনুরুধ জানাই।
অতপর আবু বকর (রা) আলা বিন হাজরামিকে বকর গোত্রের বিরোদ্ধে যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে মুসান্নার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি সৈন্যদল আলা বিন হাজরামির বাহিনীতে যোগদান করে। অতপর আলা , মুসান্না ও কায়েস গোত্রের সম্মিলিত বাহনির কাছে বনু বকর ও পারসিকদের বাহিনী পরাজয় বরণ করে। বিদ্রোহ দমন করার পর কায়েস গোত্রকে বাহরাইনের শাসক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
বাহারাইনের বিদ্রোহ দমনের পর এবার খলিফা আবু বকর (রা) ওমানের দিকে দৃষ্টিপাত করেলেন।লাকিত বিন মালেক নামক এক শক্তিশালী গোত্রপতির নেতৃত্বে উমান প্রদেশে বিদ্রোহ সংগটিত হয়। এ বিদ্রোহ দমন করতে আবু বকর (রা) হুযায়ফার নেতৃত্বে একদল মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে ইকরামার বাহিনীও হুযায়ফার বাহিনীর সাথে যোগদান করে। অতপর হুযায়ফা ও ইকরামার বাহিনী দারার যুদ্ধে ওমানের বিদ্রোহীদের পরাজিত করেন। এবং হুযায়ফা ওমানের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হন।
আরও পড়ুন: যাকাত অস্কীকার কারীদের বিরোদ্ধে অভিযান
ওমানে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর আবু বকর (রা) ইয়েমেনের বি্দ্রোহ দমনের জন্য ব্যবস্থা নেন। মহানবী (সা) এর সময় ইয়ামেনের পারসিক শাসক বজান নিজ ইচ্ছাই ইসলাম গ্রহণ করে মহানবী (সা) এবং মদীনা রাষ্ট্রের কাছে আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। মহানবী (স)ও তাকে ইয়ামেনের শাসক হিসেবে পুনর্বহাল রাখেন। কিন্তু এর কয়েকবছর পর আসওয়াদ আনাসি নামক এক ভন্ডনবী তাকে পরাজিত করে ইয়েমেন দখল করে। তবে বজানের এক আত্বীয় ফিরাজ দাইলিমা আসওয়াদ আনাসীকে হত্যা করে।
পরবর্তীতে আসওয়াদ আনাসির সমর্থকেরা পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করলে আবু বকর (রা) ইয়েমেনের বিদ্রোহ দমনের জন্য মুহাজির বিন আবু উমাইয়াকে সেনাপতি নিযুক্ত করে একটি সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন্ । বিদ্রোহী নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ থাকায় মুহাজির সহজেই বিদ্রোহ দমন করতে সমর্থ হন। মুহাজিরকে আবু বকর (রা) ইয়েমেনের শাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন।
ইয়েমেনের বিদ্রোহ দমন করে মুসলিম বাহিনী হাজরামাউতের দিকে যাত্রা করে। তখন কিন্দা গোত্রের লোকেরা হাযরামাউত অঞ্চল শাসন করত। কিনদা নেতা আশাফ বিন বাসের মহানবী (স) এর জীবিতকালে ইসলাম গ্রহণ করে এবং মদীনা রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করে। কিন্তু মহানবী (স) এর মৃত্যুর পর সে ইসলাম ত্যাগ করে মদিনা রাষ্ট্রের বিরোদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
আরও পড়ুন: মহানবীর (স) ওফাতের মর্মান্তিক ঘটনা।
অত:পর মোহাজির ও ইকরামার নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনীর মুসলিম বাহিনীর নিকট আশাফ পরাজিত হয়। আশাফকে মদিনায় খলিফার নিকট প্রেরণ করা হলে, খলিফা আবু ববকর (রা) তাকে ক্ষমা করে দেন। আশফ পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে পারস্য ও ইরাকে অভিযানরত মুসলিম বাহিনীতে যোগদান করে। এভাবে হাজরামাউতে বিদ্রোহ দমন করে অঞ্ছলটিকে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মূলত হাজরামাউতের বিদ্রোহ দমনের মধ্যে দিয়ে ৬৩২ থেকে ৬৩৪ খ্রি. পরযন্ত চলমান রিদ্দার যুদ্ধের অবসান ঘটে। ইসলামের ইতিহাসে রিদ্দার যুদ্ধের গুরুত্ব অতুলনীয়। এ যুদ্ধের ফলে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব হয়। রিদ্দার যুদ্ধের মাধ্যমে একদিকে যেমন যাকাত অস্বীকারকারী ও ভন্ডনবীদের পরাজিত করে ইসলামকে বড় ধরনের সংকট থেকে রক্ষা করা হয়। অপরদিকে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহ দমন করার মাধ্যমে মদীনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হয়।
আরও পড়ুন: শৃঙ্খলের যুদ্ধ । আবু বকর (রা) এর পারস্য অভিযান
💻তথ্যের উৎস:
📌ইসলামের ইতিহাস- সৈয়দ মাহমদুল হাসান 📌ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি- সৈয়দ মাহমুদুল হাছান 📌ইসলামের ইতহিাস- মুহাম্মদ মিজানুর রশিদ 📌আরব জাতীর ইতিহাস- শেখ লুতফর রহমান 📌দ্যা লস্ট ইসলামিক হিস্ট্রি- ফিরাস আল খতিব 📌আবু বকর সিদ্দিক (রা)- ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি 📌খিলাফতে রাশেদা- মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম

0 মন্তব্যসমূহ