শৃঙ্খলের যুদ্ধ । খালিদ ও মুসান্নার পারস্য অভিযান । আবু বকর (রা) । রাশেদিন খিলাফত


                                                 

হযরত আবু বকর (রা) এর সংক্ষিপ্ত খেলাফতকালের প্রথম বছর অর্থাৎ ৬৩২ থেকে ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর‌্যন্ত অভ্যন্তরীন বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন এবং রিদ্দার যুদ্ধ পরিচালনার মাধ্যমে অতিবাহিত হয়। অভ্যন্তরীন বিদ্রোহ দমন শেষে তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উত্তর পূর্বে পারসিক শাসিত ইরাক এবং উত্তর পশ্চিমের বায়জান্টাইন শাসিত সিরিয়ার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। খলিফা আবু বকর প্রথমে মুসান্না এবং খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে পারসিকদের বিরোদ্ধে যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করেন। ফলে সাসানিদ সাম্রাজ্যের পারসিক ও মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক শৃঙ্খলের যুদ্ধ। এটি ছিল প্রথম মুসলিম সাসানিদ সংঘর্ষ।

আরও পড়ুন: আবু বকর (রা) এর খেলাফত লাভ

৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (স) পারসিক সাসানিয় রাজা খসরু পারভেজকে ইসলামের দাওয়াতপত্র দিয়ে তার নিকট দূত প্রেরণ করেন। এতে সম্রাট ক্ষিপ্ত হয়ে পত্র ছিড়ে ফেলে এবং মুসলিম দূতকে অপমান করে। এই ঘটনায় মর্মাহত হয়ে মহানবী (স) খসরুকে অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, “ মহান আল্লাহ একদিনে খসরু ও তার সাম্রাজ্যকে চিঠির মত টুকরু টুকরু করে ধ্বংস করবে। এরই ঠিক কয়েকদিন পর খসরু পারভেজ তার এক আত্মীয়ের হাতে নিহত হয়।

মহানবী (স) এর ওফাতের পর ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবু বকর (রা) যখন ভন্ডনবীদের বিরোদ্ধে এবং আরবের বিভিন্ন বিদ্রোহী গোত্রদের বিরোদ্ধে যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করেন তখন পারসিকরা বাহারাইন ও ওমান সহ বিভিন্ন গোত্রকে মুসলমানদের বিরোদ্ধে সামারিক সহায়তা প্রদান করে। তাছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের উত্তর পূর্ব সীমান্তে থাকা পারসিক শাসিত ইরাকের বিভিন্ন বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসমূলক কর্মকান্ডের ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।

আরও পড়ুন: মহানবীর (স) বিদেশে দূত প্রেরণ

এসব কারণে ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে খলিফা আবু বকর (রা) পারস্যের সীমান্তে মুসান্নার নেতৃত্বে ৮০০০ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে তাদের উস্কানিমূলক কর্মকান্ড বন্ধের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু পারসিকখ্রিস্টান এবং পৌত্তলিকদের সম্মিলিত বাহিনী আল কাতিফ অঞ্চলে মুসান্নার বাহিনীর গতিপথ রুদ্ধ করে। এরপর খলিফা আ্বু বকর (রা) খালিদ বিন ওয়ালিদকে ১০,০০০ সৈন্য সহ মুসান্নার সাহায্যে প্রেরণ করেন। অতপর মুসান্না ও খালিদের সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী উবাল্লাহ হাফির নামক স্থানে পারসিক বাহিনীর সাথে মুখামুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

এই যুদ্ধে পারস্যবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হরমুজ যুদ্ধ কৌশল হিসেবে তার সৈন্যবাহিনীর পেছনের সারিকে লৈাহ শৃঙ্খল দ্বারা মাটির সাথে বেধে রাখে, যাতে কাপুরুষের ন্যায় যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে কোন সৈন্য পালিয়ে না গিয়ে বীরের মত যুদ্ধ করে। সেনাপতি হরমুজের এ যুদ্ধ কৌশলের কারণে ইসলামের ইতিহাসে এটিকে শৃঙ্খলের যুদ্ধ বা Battle of Chain বলা হয়।

যুদ্ধের প্রথম পরযায়ে মুসলিম সেনাপতি খালিদ এবং পারসিক সেনাপ্রধান হরমুজের মধ্যে দ্বৈতযুদ্ধ সংঘটিত হয়। দুই জনই বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে । কিন্তু শেষ পরযায়ে খালিদের কাছে হরমুজ পরাজিত ও নিহত হয়। হরমুজের নিহত হওয়ার পর উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। নেতৃত্বহীন পারসিক বাহিনী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দিক বেদিক পালাতে থাকে।

আরও পড়ুন: খালিদের নেতৃত্বে ইয়ামার যুদ্ধ

এরপর মুসান্নার নেতৃত্বে একদল বাহিনী তাদের পশ্চাদগমন করতে করতে এক পারশিক রাজকন্যার দুর্গের কাছাকাছি চলে যায়। দুর্গটি মুসলিম বাহিনী বিজয় করে। মুসলিম বাহিনীর কাছে পারসিক বাহিনীর পরাজয়ের পর সাসানিদ সম্রাট ইয়াজদিগার্দ সেনাপতি বাহমানের নেতৃত্বে বিশাল এক বাহিনী মুসলমানদের বিরোদ্ধে প্রেরণ করে। কিন্তু খালিদ ও মুসান্নার বাহিনীর কাছে পারসিকরা এবারও পরাজিত হয়।

পরাজিত পারসিক বাহিনী মুসলমানদের আক্রমণ প্রতিহত করতে না পেরে উলিসা অঞ্চলের দিকে পলায়ন করে। এরপর খালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী উলিসার যুদ্ধে পারসিকদের পুনরায় পরাজিত করে তৎকালীন ইরাকের রাজধানী হীরা অবরোধ করে। অবরোধের পর মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের সংবাদে ভীত হয়ে হীরার পারসিক শাসক প্রাণভয়ে পালিয়ে যায়। এরপর মুসলিম সেনাপতি খালিদ অবরোদ্ধ হীরাবাসিকে ইসালামের দাওয়াত দেন এবং ইসলাম গ্রহণ না করলে তার পরিবর্তে নির্দিষ্ট হারে জিজিয়া দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

প্রসঙ্গত জিজিয়া হলো একপ্রকার কর, যা ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে নেওয়া হত। জিজিয়া প্রদান করলে অমুসলমানগণ ইসলামী রাষ্ট্রের জিম্মি প্রজাতে পরিণত হয় এবং তাদের রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্ব খলিফা গ্রহণ করেন। হীরাবাসি ইসলাম কবুল না করে জিজিয়া প্রদানে অঙ্গীকার করে হীরা সন্ধি সাক্ষর করে। এবং নিজেদের ধর্ম পালন করে হীরা রাজ্যে শন্তিতে বসবাস করতে থাকে। ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদিত হীরা চুক্তি ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আরবের উপদ্বীপের বাহিরে এটি মুসলমানদের প্রথম চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরাকের রাজধানী হীরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে।

আরও পড়ুন: জেরুজালেম নগরের গঠন বৈচিত্র

হীরা বিজয় সম্পন্ন হওয়ার পর খালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বীর সেনানিরা আরবের উত্তর দিকে অভিযান প্রেরণ করে ফোরাত নদীর তীরবর্তী পারসিক শাসিত অঞ্চল আনবার বিজয় করে। এরপর আনবার থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত আইন উত তামার এবং দুমা অঞ্চলও মুসলমানদের দ্বারা বিজতি হয়। মূলত আবু বকর (রা) এর খেলাফতকালে খালিদ ও মুসান্নার নেতৃত্বে পারস্য অভিযানের সূচনা ঘটে এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা) এর খেলাফতকালে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য মুসলমানরা বিজয় করে্ । ফলে মহানবী (স) এর ভবিষ্যৎবাণী সত্যে প্রতিফলিত হয়।


💻তথ্যের উৎস:

📌ইসলামের ইতিহাস- সৈয়দ মাহমদুল হাসান 📌ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি- সৈয়দ মাহমুদুল হাছান 📌ইসলামের ইতহিাস- মুহাম্মদ মিজানুর রশিদ 📌আরব জাতীর ইতিহাস- শেখ লুতফর রহমান 📌দ্যা লস্ট ইসলামিক হিস্ট্রি- ফিরাস আল খতিব 📌আবু বকর সিদ্দিক (রা)- ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি 📌খিলাফতে রাশেদা- মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ