আজনাদাইনের যুদ্ধের ইতিহাস । আবু বকরের (রা) সিরিয়া অভিযান ।

                                                    


আরও পড়ুন: শেকলের যুদ্ধ : আবু বকরের (রা) পারস্য অভিযান।

খলিফা আবু বকর (রা) মুসান্না ও খালিদের নেতৃত্বে পারস্যে অভিযান প্রেরণের পর, সিরিয়ায় যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করেন। সিরিয়া অভিযানে মুসলিম ও বায়জান্টাইনদের মধ্যে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক আজনাদাইনের যুদ্ধ।  আজনাদাইনের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সর্ববৃহৎ এবং রক্তক্ষয়ি সমর। এ যুদ্ধে ২ লক্ষ ৪০ হাজার বায়জান্টাইন খ্রিস্টান বাহিনীর মোকাবেলা করেছিল মাত্র ৪০ হাজারের মুসলিম বাহিনী। এই যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য সিরিয়া ও ফিলিস্তিন বিজয়ের দ্বার উন্মোচন হয়।

৬২৮ খ্রিস্টাব্দে বিদেশে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার সময় মহানবী (স) রোমান বায়জান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে মুসলিম দূত প্রেরণ করেন। হিরাক্লিয়াস ইসলাম গ্রহণ না করলেও মুসলিম দূতকে স-সম্মানে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি এবং সম্প্রসারণের ফলে হিরাক্লিয়াস ভীত ও ইর্ষান্বিত হয়ে উঠে। একপর‌্যায়ে সম্রাট হিরাক্লিয়াস ইসলামী রাষ্ট্র ও মুসলমানদের বিরোদ্ধে ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয়।

সম্রাট সিরিয়ার আরব গোত্র সমূহকে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তে আক্রমণ ও লুটপাত করতে সামরিক সহায়ত করত। মুসলিম ব্যাবসায়ীরা সিরিয়ায় নানাভাবে উৎপীড়ন ও নির‌্যাতনের স্বীকার হত। তাছাড়া ‍সুরাহবিল নামক সিরিয়ার এক বায়জান্টাইন প্রাদেশিক শাসনকর্তা এক মুসলিম দূতকে হত্যা করে। এমনকি খলিফা আবু বকরের খেলাফতকালে মহিলা ভন্ডনবী সাজাহকে সিরিয়ার খ্রিস্টানরা মুসলমানদের বিরোদ্ধে সহযোগিতা করে।             

এসব কারণে আবু বকর (রা) মুসলমানদের নিরাপত্তা বিধান ও ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা এবং বিদ্রোহী গোত্রদের উপযুক্ত শিক্ষা প্রদানের জন্য সিরিয়ায় যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করেন। ইতিপূর্বে ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (স) এর সময় সিরিয়ার বায়জানস্টাইন খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত হওয়া মুতার যুদ্ধ বায়জান্টাইনরা পরাজিত হয়েছিল। তারপরও তারা মহানবী (স) এর ওফাতের পর পুনরায় ইসলামী রাষ্ট্রের ধ্বংস সাধনে প্রচেষ্টা চালাতে থাকে।           

আবু বকর (রা) এর খেলাফত লাভের পর উসামার নেতৃত্বে সিরিয়ায় অভিযান প্রেরণ করেন। তিনিও তাদেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। উসমার সিরিয়া অভিযান সম্পর্কে জানতে আই বাটনের ভিডিওটি দেখতে পারেন।  তারপরও সিরিয়ায় খ্রিস্টানরা বায়জাস্টাইনদের সহযোগিতায় মুসলমানদের বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকেনি। অতপর ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবু বকর মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে ৩ ভাগে বিভক্ত করে একটি সুপরিকল্পিত উপায়ে ‍সিরিয়ায় যুদ্ধ অভিযানের প্রস্তুতি নেন। মুসান্না এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ ইরাকে পারসিকদের বিরোদ্ধে যুদ্ধ অভিযানে লিপ্ত থাকায় খলিফা আবু বকর আমর ইবনে আল আস, ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান এবং সোরাহবিল ইবনে হাসনকে তিনটি দলের সেনাপতি নিযুক্ত করেন। প্র্রতিটি দলে ৩০০০ করে সৈন্য ছিল।

আমরের নেতৃত্বে থাকা প্রথম দলটি আইলা অঞ্চল থেকে বায়জান্টাইন শাসিত ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হয়। ইয়াজিদ ও সুরাহবিলের নেতৃত্ব মুসলিম বাহিনীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দল তাবুকের পথে রওনা হয়। পরবর্তীতে মুসলিম বীর সেনানী আবু উবায়দার নেতৃত্বে অপর একটি মুসলিম বাহিনী সিরিয়ার দামেস্কেরে দিকে যুদ্ধ যাত্রা করেন।

মরু সাগর ও আকাবা উপসাগরের নিকটবর্ত স্থানে আবস্থিত উপত্যকায় বায়জান্টাইনদের সাথে মুসলিম বাহিনীর প্রথম সংঘর্ষ হয়। এই যুদ্ধে ইয়াজিদের বাহিনী ফিলিস্তিনের বায়জেন্টাইন শাসনকর্তা সারাগিয়াসের বাহিনীকে পরাজিত করে। এরপর যুদ্ধে পরাজিত বায়জান্টাইন বাহিনী ঘাসসানরে দিকে পলায়ন করে। পলায়নরত পারসিক বাহিনীকে দাওয়া করে ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম বাহিনী তাদের সম্পূর্ণরূপে পরাজিত ও বিদ্ধস্ত করে।   

সারাগিয়াসের পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে বায়জান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াস তার ভাই থিওডোরাসের অধীনে ২ লক্ষ ৪০ হাজারের একটি বিশাল সেনাবাহিনী মুসলমানদের বিরোদ্ধে প্রেরণ করে। বায়জান্টাইনদের যুদ্ধ অভিযানের খবর পেয়ে খলিফা আবু বকর খালিদকে ইরাকের হিরা থেকে সিরিয়ার মুসলিম বাহিনীতে যোগদানের জন্য আদেশ প্রদান করেন।           

খলিফার আদেশ পেয়ে খালিদ সিরিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করে। পাচ দিন সফরের পর অবশেষে খালিদ আবু উবায়দা, ইয়াজিদ, সোহারাবিল এবং আমরের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ২ লক্ষ ৪০ হাজারের বিশাল বায়জান্টাইন বাহিনীর মোকাবেলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অপরদিকে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখা দাড়াই ৪০ হাজারের। খলিফা আবু বকরের আদেশে সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন খালিদ বিন ওয়ালিদ।

৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুলাই আজনাদাইনের প্রান্তরে মুসলিম বাহিনী ও বায়জান্টাইন বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। মুসলিম সেনাবাহিনীতে মাত্র ৪০,০০০ সৈন্য থাকা সত্ত্বেও খালিদের উন্নত রণকৌশলের মাধ্যমে মুসলিম ‍মুজাহিদরা বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে থিওডোরাসের নেতৃত্বে থাকা ২ লক্ষ ৪০ হাজারের বায়জান্টাইন সেনাবাহিনীতে পরাজিত করে। যুদ্ধে ১ লক্ষ ৪০ হাজার বায়জান্টাইন সৈন্য নিহত হয় এবং ৩ হাজার মুসলিম সৈন্য শহিদ হয়।

এই যুদ্ধে বিজয়ের ফলে সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন জয় করা মুসলমানদের জন্য সহজলভ্য হয়ে পড়ে। পরবর্তী খলিফা উমর (রা) এর খেলাফতকালে ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়া এবং ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম মুসলিম বাহিনী বিজয় করতে সক্ষম হয়। আজনাদাইনের যুদ্দে বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনী যখন সিরিয়া ও ফিলিন্তিন বিজয়ের দ্বার উন্মোচন করেন, তখন আবু বকর (রা) কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে ২৩ আগস্ট ৬১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা) তার ইন্তেকালের পূর্বে হযরত উমর (রা) কে তার উত্তরাধিকারী ও ইসলামী রাষ্ট্রের পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনিত করে যান।

আরও পড়ুন: রাশেদিন খেলাফতের সূচান ও আবু বকর (রা) এর খেলাফত লাভ

                         

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ