বঙ্গ, বাংলা এবং বাংলাদেশ। এই তিনটি শব্দ শুনতে একই রকম লাগলেও, বাস্তবিক অর্থে এই তিনটি শব্দ দ্বারা পৃথক তিনটি অঞ্চলকে বুঝায়। বঙ্গ হলো প্রাচীন বাংলার ষোড়শ জনপদের অন্যতম একটি জনপদ। বাংলাদেশ বলতে বুঝায় আধুনিক স্বাধীন বাংলাদেশকে। অন্যদিকে প্রাচীন ও মধ্যযুগে বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশকে অখন্ডভাবে বাংলা বলে অভহিত করা হত।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাস বলতে অখন্ড বাংলা এবং তার সাথে বিহার, আসাম ও উড়িষ্যার ইতিহাসকে বুঝায়। বাংলায় সর্বপ্রথম কখন মানুষের বসতি গড়ে উঠে, তা সঠিকভাবে বলা যায় না। তাই সুপ্রাচীন কালের বাংলার ইতিহাসও অন্ধকারাচ্ছন্ন। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে গ্রীক বীর আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ অর্থাৎ গ্রীকদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত প্রাচীন বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে কিছু জানা যায় না।
আলেকজান্ডারের ভারত ত্যাগের পর ভারতবর্ষে মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থান হয়। মৌর্য বংশের পতনের পর ভারতের শাসন ক্ষমতায় আসে গুপ্ত রাজবংশ। বাংলার সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে গুপ্তশাসন আমল থেকে শুরু হয়।
![]() |
| গঙ্গারিডই |
আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় বাংলায় গঙ্গা নদীর অববাহিকায় গঙ্গারিডই নামে এক শক্তিশালী জাতী বাস করত। গঙ্গারিডই রাজ্যের পশ্চিমে বাস করত প্রাসিয়েই নামের আরেক জাতী। গঙ্গা রডিই ও প্রাসিয়ই মগধ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। তখন এই সাম্রাজ্যের শাসন ক্ষমাতয় ছিল নন্দ বংশের সম্রাট পদ্মনন্দ। মগধ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটালিপুত্র অর্থাৎ বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের রাজধানী পাটনায়।
আরও পড়ুন:বাংলাদেশের নামকরণের ইতিহাস
মগধ সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি সমগ্র ভারতে অপ্রতিদ্বন্দি ছিল। এই সাম্রাজ্যের বিশাল সৈন্যবাহিনী এবং চার হাজার রণহস্তি ছিল। তাই স্বয়ং আলেকজান্ডার বাংলার মগধ সাম্রাজ্য আক্রমণের দুরাশা ত্যাগ করেন। মগধের নন্দ বংশীয় শেষ রাজা ধননন্দ ছিলেন অত্যাচারী শাসক। তাকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ অব্দে পরাজিত করে, মগধ দখল করে।
এর পর চন্দগুপ্ত শুধুমাত্র গ্রিকদের আক্রমণ প্রতিহত করেন নি, বরং তিনি আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকাসকে পরাজিত করে উপমহাদেশ থেকে গ্রিকদের বিতাড়িত করেন। তিনি সেলিউকাসকে পরাজিত করে পান্জাব, কাবুল, কান্দাহার এবং হিরাত দখল করেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ অব্দে মগধের সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে ভারতবর্ষে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
![]() |
| মৌর্য সাম্রাজ্য |
আরও পড়ুন: বাঙ্গালি জাতির উৎপত্থি
খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩ থেকে ২৩২ অব্দে অশোকের
মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ ৪০ বছর সম্রাট অশোক ভারবর্ষে রাজত্ব করেন। অশোকের মৃত্যুর পর
তার দুর্বল উত্তরাধিকারীরা মৌর্য বংশের মর্যদা রক্ষা করতে ব্যার্থ
হয়। অবশেষে গৃহযুদ্ধ, দাক্ষিণাত্য ও কালিঙ্গের রাজন্যবর্গ এবং গ্রীক যাযাবরদের আক্রমণের
ফলে ১৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন হয়।
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতবর্ষে শুঙ্গ বংশের শাসনের সূচনা হয়। ২৭ খ্রিস্টপূর্বাদ্ব পর্যন্ত তাদের শাসন স্থায়ী ছিল। সুঙ্গ বংশের পতনের পর ভারতবর্ষে কুষাণ রাজবংশের শাসন শুরু হয়। গ্রিক ইউচি উপজাতির একটি শাখা কুষান নামে পরিচিত ছিল। ৫০ খ্রিস্টাব্দে কুষাণ নেতা কুজুলা কদফিস কাবুল ও কান্দাহার বিজয় করে।
![]() |
| কুষাণ সাম্রাজ্য |
তিনি গ্রিক ও পার্থিয়ানদের পরাজিত করে আফগানিস্তান দখল করেন। তার পুত্র বীম কদফিস ভারতবর্ষে একটি বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। করেন। কনিষ্ক কুষাণ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন। এই সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পুরুষপুর বা বর্তমান পাকিস্তানের পেশওয়ার। বাংলার এই সময়কার তেমন ইতিহাস জানা না গেলেও, ধারণা করা কুষাণ সাম্রাজ্য উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।
কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর সমগ্র ভারতে বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উদ্ভব হয়। বাংলাতেও এইরকম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের অস্তিস্তের কথা বিক্ষিপ্তভাবে জানা যায়। কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের প্রায় ১০০ বছর পর খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে ভারতবর্ষে গুপ্ত শাসনের সূচনা হয়। গুপ্ত যুগে বাংলার প্রায় সব জনপদই গুপ্ত সাম্রাজ্যভুক্ত হয়ে পড়ে। মূলত গুপ্ত যুগ থেকেই বাংলার ইতিহাস তার নিজেস্ব ধারায় প্রবাহিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাংলায় হিন্দু রাজাদের পতন ও মুসলমাদের উত্থান
ভিডিও দেখুন:
💻তথ্যের উৎস: 📌বাংলাদেশের ইতিহাস- কে আলী 📌বাংলাদেশের ইতিহাস- ড. মো: শাহাজাহান 📌বাংলার ইতিহাস- সূনিতী কুমার চট্টোপাধ্যায় 📌ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস- ড.এ.কে.এম আব্দুল আলীম 📌ভারতবর্ষের ইতিহাস- ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান




0 মন্তব্যসমূহ