সুলতান আহমেদ সেনজারের অজানা ইতিহাস।

  

আরও পড়ুন: সুলতান তুঘ্রিল বেগের ইতিহাস

১০৫৫ খ্রিস্টাব্দে, সুলতান তুঘ্রীল বেগের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, সেলজুক সাম্রাজ্য গৌঁরবের সাথে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিয়েছিল, প্রায় অর্ধ শতাব্দি ধরে। ১০৯২ খ্রিস্টাব্দে সেলজুক সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সুলতান, মালিক শাহের মৃত্যুর পর, সিংহাসন দখলকে কেন্দ্র করে উত্তরাধিকারী দ্বন্দ, খ্রিস্টান বায়জান্টাইনদের আক্রমণ, শিয়া ফাতেমী কিংবা গুপ্তঘাতক দল বাতেনীদের ষড়যন্ত্রের ফলে, সাম্রাজ্যটি পতনের দিকে ধাবিত হতে থাকে।

এই পতন উম্মুক সাম্রাজ্যের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, যে সেলজুক শাসক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তিনি হলেন সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ সেলজুক সুলতান আহমেদ সান্জার। তিনি রাজ্যের বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন করে, সাম্রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। কিন্তু মধ্য এশিয়ার আরও একটি তুর্কি রাজবংশের কাছে, পরাজিত হওয়ার ফলে, সুলতান আহমেদ সান্জারের ক্ষমতা হ্রাস পাই। এবং এই পরাজয় তার পতন ডেকে নিয়ে আসে।

                                  

সুলতান আহমেদ সেনজার

সুলতান আহমেদ সান্জার ছিলেন, সুলতান মালিক শাহের তৃতীয় পুত্র। মালিক শাহের রাজত্বকালে, তিনি সফলভাবে অনেকগুলো বিজয় অভিযান পরিচালনা করেন। বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন করে, সাম্রাজ্যের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্টা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার যোগ্যতায় সন্তুষ্ঠ হয়ে, সুলতান মালিক শাহ আহমেদ সান্জারকে, ১০৯৬ সালে খোরাসানের আমির হিসেবে নিযুক্ত করেন।

আরও পড়ুন: সুলতান মালিক শাহ

 

খোরাসান ছিল সেলজুক সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রদেশ। সুলতান মালিক শাহের মৃত্যুর পর, আহমেদ সেনজারের অন্য ভাইয়েরা সাম্রাজ্যের সুলতান হলেও, তিনি খোরাসানে স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতেন। ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১১১৮ খ্রিস্টাব্দ পর‌্যন্ত তিনি খোরাসানের সেলজু,ক শাসক হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

১১১৮ খ্র্রিস্টাব্দে, তৎকালীন সেলজুক শাসক সুলতান মুহাম্মদ তপারের মৃত্যু্র পর, তার নাবালক পুত্র দ্বিতীয় মাহমুদ, সাম্রাজ্যের নতুন সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ নাবালক হওয়ায়, সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রকৃত ক্ষমতা মূলত আহমেদ সান্জারের হাতে চলে আসে। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের শাসনকালে, তার দুর্বলতার সুযোগে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। বিশেষ করে ইয়াজদ প্রদেশের আমির দ্বিতীয় গারশাপের বিদ্রোহ ছিল, সবচেয়ে ভয়াবহ। সে বিদ্রোহের সাথে সাথে সুলতানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকে।

এসব কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে, সুলতান আমির গারশাপের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, তাকে পরাজিত ও বন্দী করে। পরবর্তীতে আমির গারশাপ, কারাগার থেকে কোন রকম পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং খোরাসানের আমির আহমেদ চেঞ্জারের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করে। এরপর আমির গারশাপ সেনজারকে, সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের বিরুদ্ধে উস্কানী দিয়ে, সুলতানের বিরোদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। এবং আহমেদ সেন্জারকে গারশাপ সব রকমের তথ্য দিয়ে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

আরও পড়ুন: সুলতান আল্প আরসালান

অত:পর ১১১৮ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে, সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য, আহমেদ সান্জার দ্বিতীয় মাহমুদকে সিংহানচ্যুত করে, নিজে সিংহাসনে উপবিষ্ট হন। এরপর দ্বিতীয় মাহমুদের সাথে, আহমেদ সেন্জারের কন্যা মাহে মুলক খাতুনের সাথে বিবাহ দিয়ে শান্তিস্থাপন করেন। ১১১৮ খ্রিস্টাব্দ সিংহাসনে আরোহণ থেকে ১১৫৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর পূর্ব পর‌্যন্ত, সুলতান আহমেদ সেন্জার ক্ষমতায় ছিলেন। তার সিংহাসনে আরোহণের সময়, সেলজুক সাম্রাজ্য অনেকটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। যার ফলে সাম্রাজ্যের অনেক রাজ্যই স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে থাকে।                              

সেলজুক সাম্রাজ্য

সুলতান আহমেদ সেনজার, স্বীয় দূরদর্শিতা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন করে, সেলজুক সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। একই সময় খোরাসান হয়ে উঠে, সেলজুক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি। পরবর্তী বছরগুলোতে আহমদ সেনজার, ইস্পেহান ও নিশাপুর সহ সেলজুক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন রাজ্যের, একচ্ছত্র অধিপতিতে পরিণত হন। এবং খোরাসান থেকে সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন।

সুলতান আহমেদ সান্জারের রাজত্বকালের, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, হাসান সাব্বাহর বাতেনী তথা গুপ্তঘাতক ঘাতক সম্প্রদায়ের সাথে সংঘর্ষ। এই বাতেনি শিয়া মতলম্বি উগ্রদের উৎপাতের কারণে, সাধারণ মুসলিমরা শন্তিতে দিন কাটাতে পারতো না। ইতিপূর্বে এই গুপ্তঘাকত দলের আক্রমণে, সেলজুক সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা বলে পরিচিত উজির নিজামুল মুলক নিহত হন। এমনিক ধারণা করা হয়, সুলতান মালিক শাহকেও ,হাসান সব্বাহ এক বিশেষ ধরনের বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করে।

সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা প্রতিষ্টার পর, সুলতান আহমদ সেনজার হাসান সাব্বাহ ও তার প্রতিষ্ঠিত গুপ্তঘাকত দলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। তিনি গুপ্তঘাতকদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য, বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এবং সফলতা অর্জন করেছিলেন। তিনি কুইস্থান ও তাবাসা সহ, বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দুর্গ থেকে গুপ্তঘাকদের উচ্ছেদ করেন।

সুলতানের অভিরাম যুদ্ধ অভিযানের ফলে, হাসান সাব্বাহ যখন বুঝতে পরেছিল, আহমেদ সেনজার এবার বাতেনীদের কেন্দ্রীয় দুর্গ আলামুতে, অভিযান পরিচালনা করতে যাচ্ছেন। তখন আলামুতে অভিযানের পথে, নাটকিয় ভাবে সুলতান আহমেদ সেনজারকে হাসান সাব্বাহ একটি খোদাই-করা বার্তাবাহক খঞ্জর প্রেরণ করেন। যাতে লিখেছিল সে শান্তি চুক্তি করতে চায়।

আকস্মিক ঘটনায় সুলতান আহমেদ সেনজারও কিছুটা অবাক হন। এরপর তিনি হাসান সব্বাহ’র বার্তার সম্মতি দিয়ে প্রতিউত্তর প্রেরণ করে। চুক্তির মাধ্যমে তারা উভয়ে একে অপরের থেকে দূরে থাকার শর্তে রাজি হয়েছিল। এভাবে সুলতান সেলজুক সাম্রাজ্যের অন্যতম হুমকি স্বরূপ, গুপ্তঘাকদের দমন করে সাম্রাজ্যে শান্তি স্থাপন করতে সক্ষম হন।

 আরও পড়ুন: গুপ্তঘাতক দল বাতেনী সম্প্রদায়ের কিভাবে উত্থান হয়?

গুপ্তঘাতক বাতেনীদের দমনের পর, সুলতান আহমেদ সান্জার ১১৪১ সালে, সেলজুক সাম্রাজ্যের অন্যতম বড় হুমকি, কারা-খানিদদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। কারাখানিদ ছিল মধ্য এশিয়ার আরও একটি তুর্কি মুসলিম সাম্রাজ্য। সুলতান মালিক শাহের মৃত্যুর পর, সেলজুক সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে, তারা বোখারা কেন্দ্রীক একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এবং সেলজুক সাম্রাজ্যভুক্ত অঞ্চল সমূহ দখল করতে থাকে।

ফলে কারা-খানিদ রাজবংশের বিরোদ্ধে, যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করা অবশ্বম্ভাবী হয়ে পড়ে। ১১৪১ খ্রিস্টাব্দে সমরকন্দের নিকট সংঘটিত হওয়া, কাতওয়ানের যুদ্ধে সুলতান আহমেদ সেনজারের সৈন্য বাহিনী, কারা-খানিদদের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে, একদিকে সুলতানের সৈন্যবাহিনী সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস হয়ে যায়, অন্যদিকে প্রায় সমগ্র মধ্য এশিয়ার সেলজুক অঞ্চল, কারাখানিদের দখলে চলে যায়।

                                                 

কতোওয়ানের যুদ্ধ

তাছাড়া এই পরাজয়ের ফলে, সুলতান আহমেদ সান্জারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্য হয়। সুলতানের পরাজয়ের সুযোগে, বৃহৎ সেলজুক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশে প্রদেশে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এরপর ক্রমাগত বর্ধমান বিদ্রোহ, বিচ্ছৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধের কারণে সেলজুক সাম্রাজ্য আরও দুর্বল হতে থাকে। ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে সাম্রাজ্যের প্রদেশ গুলো প্রায় স্বাধীনভাবে, নিজেদের শানকার‌্য পরিচালনা করতে থাকে। কিন্তু বৃদ্ধ সুলতানের পক্ষে, সাম্রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা ও হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব হয়নি।

অবশেষে ১১৫৭ সালে সুলতান আহমেদ সেনজার মৃত্যুবরণ করেন। বস্তুত আহমেদ সেনজারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, সেলজুক সাম্রাজ্যের পতন অনিবার‌্য হয়ে পড়ে। যদিও তার মৃত্যুর পর আরও ৯ সুলতান, ১১৯৪ খ্রিস্টাব্দে পর‌্যন্ত শাসকার‌্য পরিচালনা করেছিল। কিন্তু তারা শুধু ইরান ও আজারবাইজানকেই নিয়ন্ত্রণ করেছিল। অবশেষে ১১৯৪ খ্রিস্টাব্দে, শেষ দুর্বল সেলজুক শাসক তৃতীয় তুঘ্রিল বেগের মৃত্যুর পর, পরাক্রমশালী সেলজুক সাম্রাজ্যের পরিসমাপ্তি ঘটে।

আরও পড়ুন: রুমের সেলজুক সালতানাতের ইতিহাস

এরপর সেলজুক সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পাঁচটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সালতানাতে পরিণত হয়। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো, আনাতোলিয়ার রুমের সেলজুক সালতানাত। ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে রোমের সেলজুক সালতানাতের পতনরে পর, আনাতোলিয়ার মাটিতে উসমান গাজীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়, তিন মহাদেশ বিস্তৃত উসমানীয় সাম্রাজ্য । ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে উসমানী খেলাফতের পতনের পর জন্ম হয় আধুনিক তুরস্কের ।

ভিডিও দেখুন:

তথ্যের উৎস:

  • আরব জাতীর ইতিহাস - ড. লৎফর রহমান                  
  • সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাস - ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লবি 
  • ইসলামের ইতিহাস - ড. মাহমুবুর রহমান
  • উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট

 

 

 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ