আরও পড়ুন:মৌর্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস
কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রায় এক শতাব্দী ধরে ভারতবর্ষে তেমন কোন রাজ শক্তি ছিল না। ভারতবর্ষ তখন বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। রাজ্যসমূহ একে অপরের বিরোদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকতো। সমগ্র ভারতবর্ষের এই পরিস্থিতিতে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে গুপ্ত বংশের উত্থান হয়। রাজ্য বিজয়ের পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ও সংষ্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় গুপ্ত যুগকে প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বর্ণযুগ বলা হয়। মৌর্য সম্রাটরা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও, গুপ্তরা ছিল হিন্দু ধর্মের অনুসারী।
গুপ্তদের আদি নিবাস ছিল মগধ তথা বর্তমান বিহারে। তবে কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতে তাদের আদি নিবাস ছিল বাংলায় এবং তারা বাঙ্গালি ছিলেন। গুপ্ত বংশের আদি পুরুষ ছিলেন শ্রীগুপ্ত। কিন্তু শ্রীগুপ্ত ও তার পুত্র ঘটোৎকচ সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। ঘটোৎকচের পুত্র প্রথম চন্দ্রগুপ্ত মগধে গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
তাকে গুপ্তবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত করা হয়। সম্রাট প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ৩২০ খ্রিস্টাব্দে পাটলিপুত্রের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার শাসনামলে বাংলায় কতগুলো স্বাধীন রাজ্য ছিল। পুষ্করণ ছিল তৎকালীন বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্য। ৩৪০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর তার পুত্র সমুদ্রগুপ্ত পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। তাকে প্রাচীন ভারতের নেপোলিয়ন বলা হয়। সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত সমগ্র উত্তর ভারতে গুপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
আরও পড়ুন: বাংলায় সেনদের পতন ও মুসলমানদরে উত্থান
তার শাসনামলে পুষ্করণ রাজ্য সহ বাংলার অধিকাংশ জনপদ গুপ্ত সাম্রাজ্যভুক্ত হয়ে পড়ে।তিনি সমতট ছাড়া বাংলার অন্যান্য জনপদগুলো নিজের সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসেন। গুপ্ত শাসনামলে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিকৃত বাংলার জনপদ সমূহ পুন্ড্রবর্ধন ভুক্তি নামে বিবেচিত হত এবং এর রাজধানী ছিল পুন্ড্রনগর।
সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ৩৮০ সালে পাটালিপুত্রের সিংহাসনে বসেন। সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত পিতার সাম্রাজ্যকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তিৃত করেন। তিনি মালবের উজ্জয়িনীতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন। অনেক প্রতিভাবান ও গুণী ব্যক্তি তার দরবারে সমবেত হয়। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর্যভট্ট এবং জ্যোতির্বিদ মিহির।
![]() |
| সমুদ্র গুপ্তের মুদ্রা |
৪১৫ সালে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত মৃত্যর পর তার পুত্র কুমারগুপ্ত সম্রাট হন। তিনি ৪১৫ থেকে ৪৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। কুমার গুপ্তের মৃত্যুর পর তার পুত্র স্কন্দগুপ্ত সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার শাসনকালে মধ্য ভারতের পুষ্যমিত্র এবং মধ্য এশিয়ার হুন জাতী গুপ্ত সাম্রাজ্যে আক্রমণ করে। তিনি সফল ভাবে তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন। স্কন্দ গুপ্তকে শেষ শ্রেষ্ঠ গুপ্ত সম্রাট হিসেবে বিবেচিত করা হয়।
৪৬৭ খ্রিস্টাব্দে স্কন্দ গুপ্তের মৃত্যুর পর যথাক্রমে পুরু গুপ্ত ৪৬৭ থেকে ৪৭৩ খ্রি, দ্বিতীয় কুমারা গুপ্ত ৪৭৩-৪৭৬ খ্রি. , বুধা গুপ্ত ৪৭৬-৪৯৫ খ্রি. নরসিংহ গুপ্ত ৪৯৫-৫৩০ খ্রি. তৃতীয় কুমারা গুপ্ত ৫৩০-৫৪০ খ্রি. এবং ৫৪০ থেকে ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শেষ গুপ্ত সম্রাট ভিষ্ণু বা দামোদর গুপ্ত রাজত্ব করেন। মূলত ভিষ্ণু গুপ্তের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে বৃহত্তর গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এর সাথে সাথে বাংলায়ও গুপ্ত শানের অবসান হয়।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের নামকরণের ইতিহাস
ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে স্কন্দগুপ্তের পরবর্তী গুপ্ত সম্রাটদের মধ্যে অনেক গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই গৃহযুদ্ধের ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। গুপ্তদের দুর্বলতার সুযোগে ভুক্তি বা প্রদেশ সমূহতে বিদ্রোহ দেখা দেয়। অনেক সামান্ত শাসক বিভিন্ন প্রদেশে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করে।
নরসিংহ গুপ্তের শাসনকালে পুষ্যিমিত্র ও হুন জাতির আক্রমণের ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্য পতনের দিকে ধাবিত হয়। নরসিংহ গুপ্তের পরের গুপ্ত সম্রাটরা নামে মাত্র শাসন ক্ষমাতায় ছিল। ষষ্ঠ শতাব্দীতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের যুগে পশ্চিম ভারতে যশোধর্মন নামক একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ও নরপতির অভ্যুদয় ঘটে। তিনি ৫২৮ খ্রিস্টাব্দে হুনরাজ মিহিরকুলকে পরাজিত করে উত্তর ভারতে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতষ্ঠা করেন। ধারণা করা হয়, বাংলাও তিনি বিজয় করেছিলেন। ৫৪৫ খ্রিস্টাব্দে যশোধর্মনের মৃত্যুর পর সমগ্র ভারতবর্ষে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের আবির্ভাব ঘটে। এই রাজ্য সমূহ আবারও গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
এ সময় সমগ্র বাংলায় বঙ্গ ও গৌড় নামে দুইটি স্বাধীন রাজ্যের উত্থান হয়। এই রাজ্য দুইটিও পরস্পরের বিরোদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। প্রসঙ্গত ভারতবর্ষে যখন অরাজকতাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, ঠিক তখন ৫৭০ খ্রি. আরবের মক্কা নগরীতে আবির্ভাব ঘটে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, ইসলামের শেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (স) এর। মহানবীর (স) এবং ইসলামের আবির্ভাবের মধ্যদিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে নব অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।💻তথ্যের উৎস: 📌বাংলাদেশের ইতিহাস- কে আলী 📌বাংলাদেশের ইতিহাস- ড. মো: শাহাজাহান 📌বাংলার ইতিহাস- সূনিতী কুমার চট্টোপাধ্যায় 📌ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস- ড.এ.কে.এম আব্দুল আলীম 📌ভারতবর্ষের ইতিহাস- ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান 📌 উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন ওয়েবসাইট।




0 মন্তব্যসমূহ