সম্রাট বাবরের সিংহাসন আরোহণ এবং ভাগ্য বিপরযয়। Babur The Founder Ep.2

History of Mughal Empire | History of King Babur The Founder Ep.1 (1494-1500 AD)                                                                          

মধ্য এশিয়ায় চাগতাই তুর্কি বীর তৈমুর লঙ্গ কর্তৃক প্রতিষ্ঠীত তৈমরীদ সাম্রাজ্যের পতনের যুগে মধ্য এশিয়া জুড়ে অসংখ ক্ষুদ্র-বৃহৎ রাজ্য গড়ে উঠে। এই রাজ্য সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ও শক্তিশালী ছিল সাইবানি খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাইবানীদ রাজবংশ আর ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তৎকালীন তুর্কিস্তানের পরগানা রাজ্য। এই পরগানা রাজ্যের অধিপতি ছিলেন আমীর তৈমুর লঙ্গের অন্যতম বংশধর আমীর ওমর শেখ মীর্জা। ১৪৯৪ খ্র্রিস্টাব্দে এক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তার আকস্মিক মৃত্যু হয়।

তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওয়া পরগানা রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন তার জৈষ্ঠ পুত্র মাত্র এগারো বছর বয়সী জহিরুদ্দীন মোহাম্মদ বাবর। বাবরের ফরগানার সিংহাসন আরোহণ, সমরকন্দ অভিযান এবং ফরগানা রাজ্য ও সমরকন্দ হারিয়ে যেভাবে বাবরের জীবনে ভাগ্যবিপরয ঘটে সে সম্পর্কে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ পড়ুন।

আরও পড়ুন: সম্রাট বাবরের (প্রথম পর্ব) জন্ম ও বংশ পরিচিতি এবং প্রাথমিক জীবন

সিংহাসন আরোহণ: ১৪৯৪ খ্রি. ৮ জুন মাত্র ১১ বছর বয়সে ফরগানার সিংহাসনে আরোহণ করে বাবর তার শত্রুতাভাবাপন্ন আত্মীয় স্বজন এবং মধ্য এশিয়ার উজবেক নেতা শাইবানী খানের মত শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন। শাইবানী খান মধ্য এশিয়ায় বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে অন্যান্য রাজ্য বিজয়ের পর পরগানা রাজ্য বিজয়ের সুযোগ খুজছিলেন। শাইবানী খান হয়তু ভেবেছিলেন আমীর ওমর শেখ মীর্জার মৃত্যু তার সে সুযোগ এনে দিয়েছে।

                                                      

ওমর শেখ মির্জা

কিন্তু ওমর শেখ মীর্জার সুযোগ্য পুত্র বাবর ছিলেন নির্ভীক ও দৃঢ়চেতা মনোভাবের অধীকারী। তিনি সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে নির্ভিগ্নে শাসন কার‌্য পরিচালনা করতে থাকেন। এমনকি তিনি তার আমীর ওমরা ও অনুগত প্রজাদের সাহায্যে প্রতিদন্ধিদের পরাজিত করে নিজের সিংহাসনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তাই সাইবানী খানের পরগানা রাজ্য আক্রমণের পরিকল্পনা ব্যার্থ হয়।           

সমরকন্দ অভিযান: সমরকন্দ ছিল মধ্য এশিয়ার সমৃদ্ধশালী এবং সৈান্দরযময়ী নগরী। এটি ছিল আমীর তৈমুর লঙ্গের তৈমুরিদ সাম্রাজ্যের রাজধানী। উচ্চাভিলাষী, নির্ভীক এবং দৃঢ়চেতা বাবর শৈশব থেকে তার পূর্বপুরুষ আমীর তৈমুর লঙ্গের স্মৃতিবিজড়িত রাজধানী শহর সমরকন্দ বিজয়ের ইচ্ছা পোষণ করতেন। তিনি সিংহাসন আরোহণের পর থেকে সমরকন্দে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করতে থাকেন। এর প্রেক্ষিতে মাত্র ১৩ বছর বয়সে, আমীর-উমরাদের নিষেধকে উপেক্ষা করে তিনি ১৪৯৬ খ্রি. সমরকন্দে বিজয় অভিযান পরিচালনা করেন কিন্তু এই অভিযানে তিনি ব্যার্থ হন।   

আরও পড়ুন:  ভারতবর্ষে তুর্কি মুসলমানদের উত্থান

কিন্ত ব্যার্থ হলেও অধ্যাবসায়ী ও দৃঢ়চেতা বাবর দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। অবশেষে আমীর তৈমুর লঙ্গের বংশধরদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সুযোগে ১৪৯৭ খ্রি. বাবর সমরকন্দ বিজয় করতে সক্ষম হন। এই বিজয়ের মাধ্যমে বাবরের শৈশবের ইচ্ছে পূরণ হয়।

বাবরের ভাগ্য বিপরযয়: ১৪৯৭ খ্রি. সমরকন্দ বিজয় করলেও, মাত্র ১০০ দিন এই শহর বাবরের অধীনে ছিল। এ সময় বাবর মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ফরগানার বাবরের বিরোদ্ধভাবাপন্ন আমীর-উমরারা তার মৃত্যু ঘোষণা করে। এমনকি তারা ফরগানার সিংহাসনে বাবরের ছোট ভাই জাহাঙ্গীরকে আরোহণ করায়। পরবর্তীতে বাবর সুস্থ হলে তার পিতৃব্য পুত্র আলীকে সমরকন্দের শাসনভার অর্পণ করে ফরগানার উদ্দেশ্যে গমন করে। 

কিন্তু বিদ্রোহ আমীর-উমরার হাত থেকে ফরগানা রাজ্য পুনরুদ্ধার করা বাবরের পক্ষে সম্ভব হয় নি। তাই তিনি পুনরায় সমরকন্দের দিকে যাত্রা করেন। কিন্তু ইতি মধ্যে পিত্রব্য পুত্র আলী বাবরের বিরোদ্ধে বিদ্রোহ করে সমরকন্দের সিংহাসনে উপবিষ্ঠ হয়। এর ফলে সমরকন্দও বাবরের হস্তচ্যুত হয়ে পড়ে। এভাবে ফরগানা রাজ্য ও সমরকন্দ হারিয়ে বাবরের জীবনে ভাগ্যে বিপরযয় ঘটে।

আরও পড়ুন: সম্রাট বাবরের (তৃতীয় পর্ব) আফগানিস্তানে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং পান্জাব বিজয়

অতঃপর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে রাজ্যচ্যুত বাবর পরিবার বর্গ ও সৈন্যসামন্ত নিয়ে ভবঘুরে জীবনযাপন করতে থাকে। এ সময় কেবল মাত্র পরগানা রাজ্যের খোজেন্দ শহর তার দখলে ছিল। এ চরম বিপরযয়েও বাবর ধৈর‌্য ও আত্মবিশ্বাস হারালেন না। তিনি হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালাতে লাগলেন। অবশেষে ১৪৯৯ খ্রি. তিনি যুদ্ধ অভিযান চালিয়ে পুনরায় ফরগানা রাজ্য দখল করতে সক্ষম হন।

                                               

পরগানা রাজ্য

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পরের বছর রাজ্যটি পুনরায় তার হস্তচ্যুত হয়ে যায়। তবে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি দ্বিতীয়বারের মত সমরকন্দ বিজয় করে সেখানে রাজত্ব করতে থাকেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ১৫০৩ খ্রি. সংঘটিত হওয়া আরচিয়ানের যুদ্ধে সায়বানি খানের নিকট পরাজিত হয়ে বাবর কেবলমাত্র সমরকন্দ থেকে নই, বরং পৈতৃক রাজ্য ফরগানা থেকেও বিতাড়িত হন। এরপর রাজ্যদ্বয় শায়বানী খান তার সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেয়।

আরও পড়ুন: মুসলমানদের সিন্ধু বিজয়ের ইতিহাস      

এভাবে ফরগানা রাজ্য এবং সমরকন্দ পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে, রাজ্য ও গৃহচ্যুত বাবর আশ্রয়ের সন্ধানে স্থান থেকে স্থানান্তরে ভাগ্যান্বষণে ঘুরতে থাকেন। মধ্য এশিয়ায় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় ব্যার্থ হয়ে দীর্ঘ এক বছর কাল নানা দুঃখ-দুর্দশায় রাজ্যহারা অবস্থায় দিন অতিবাহিত করে অবশেষে তিনি ভারতবর্ষ তথা হিন্দুস্তান বিজয়ের সংকল্প গ্রহণ করেন। কিন্তু মধ্য এশিয়া থেকে হিন্দুস্থান বিজয়ের প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল আফগানিস্তান। কেননা আফগানিস্তান দখল ব্যাতিত হিন্দুস্তান বিজয় করা প্রায় অসম্ভব।

ইতিপূর্বে গজনী সাম্রাজ্যের অধিপতি সুলতান মাহমুদ এবং ঘোর সাম্রাজ্যের অধীপতি সুলতান মুইজউদ্দীন মোহাম্মদ ঘুরী আফগানিস্তানের মাটি থেকে ভারতবর্ষে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তাই স্থির ও নির্ভীক বাবর ভারতবর্ষ বিজয়ের লক্ষ্যে প্রথমে হিন্দুকোশ পর্বতমালা অতিক্রম করে আফগানিস্তানের অভিমুখে যাত্রা করেন।

               ভিডিও দেখুন:

                                       


 


তথ্যের উৎস :

📘 ভারতবর্ষের ইতিহাস -  ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান

📘 ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস – এ.কে.এম আবদুল আলীম

📘 মোগল সাম্রাজ্যের সোনালী অধ্যায় – শাহাদাত হোসেন খান

📘 ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস – ড. মুহাম্মদ ইনামুল হক

📘 ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ইতিহাস – ড. মোহাম্মদ গোলাম রসূল

📘 ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন – আব্দুল করিম

📘 মুঘল ভারতের ইতিহাস – মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান

📘 মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের ইতিহাস – অনিরুদ্ধ রায়

📘 উইকিপিড়িয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া এবং বিভিন্ন ব্লগ ও অনলাইস ওয়েব সাইট

  

                      


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ