History of Mughal Empire | History of King Babur The Founder Ep.1 (1483-1494 AD)
সমসাময়িক মুসলিম বিশ্ব: পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ অর্থাৎ ১৫২৬ খ্রি. সম্রাট বাবর কর্তৃক ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠারও প্রায় অর্ধশত বছর আগের কথা। মোঙ্গলদের আক্রমণের ফলে পতন হওয়া বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফত তখন মিশরের মামলুক সালতানাতের আশ্রিত হয়ে পড়ে। আব্বাসীয় খলিফারা মামলুক সুলতানদের অধীনস্থ হয়ে নামেমাত্র ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবে ক্ষমতায় আসীন ছিল। অন্যদিকে এক সময়ে স্পেন ও পুর্তগাল বিজয়ের মধ্যদিয়ে ইউরোপে শান্তির মশাল বহনকারী মুসলমানরা স্পেন থেকে চূড়ান্তভাবে বিতাড়িত হয়েছিল। এ সময় সমগ্র মুসলিম বিশ্ব অনেক গুলো সাম্রাজ্য, সালতানাত কিংবা রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: সম্রাট বাবরের ইতিহাস (দ্বিতীয় পর্ব) বাবরের সিংহাসন আরোহণ ও ভাগ্য বিপরযয়।
এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা এই তিন মহাদেশ বিস্তৃত উসমানীয় সাম্রাজ্য ইসলামের বিজয় কেতন উড়াচ্ছিল পৃথিবীর দিকবেদিকে। মিশর এবং মধ্যপ্রাচ্যে সহ বিস্তৃর্ণ অঞ্চল ছিল মামলুক সালতানাতের অধীনে। পারস্যের শাসন ক্ষমতায় ছিল শিয়া ধর্ম মতালম্বি সাফাভিদ সাম্রাজ্য। ভারতবর্ষের দিল্লি সালতানাতের অধীপতি ছিল লোদী রাজবংশ। তখন আমাদের বাংলায় চলছিল অন্ধকার যুগ খ্যাত হাবশী শাসন।
চতুর্দশ শতাব্দীতে বিখ্যাত দুর্ধর্ষ চাঘতাই তুর্কি বীর আমির তৈমুর লঙ্গ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হওয়া তৈমুরিদ সাম্রাজ্যের পতনের পর সমগ্র মধ্য এশিয়া জুড়ে এই সময় অসংখ্য ক্ষুদ্র-বৃহৎ রাজ্যের উদ্ভব হয়। এই রাজ্য সমূহের শাসক ছিল তৈমুর লঙ্গের বংশধরেরা। রাজ্যে সমূহের মধ্য সবচেয়ে শক্তিশালী ও বৃহৎ ছিল বোখারা কেন্দ্রীক সাইবানী খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাইবানীদ রাজবংশ। আর সবচেয়ে ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ছিল তৎকালীন মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তানের ফরগানা রাজ্য।
![]() |
| তৈমুর লঙ্গ |
বাবরের জন্ম ও বংশ পরিচয়: ফরগানা রাজ্যটি আধুনিক ইরান এবং কাজাখস্তানের শহর তুর্কিস্তানের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতবর্ষের মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের জীবনের ইতিহাস শুরু হয় মূলত এই ক্ষুদ্র রাজ্য পরগানা থেকে। তখন এই পরগানা রাজ্যের শাসক ছিল আমীর ওমর শেষ মির্জা। তিনি ছিলেন আমীর তৈমুর লঙ্গের বংশধরদের মধ্যে অন্যতম একজন।
আরও পড়ুন: সম্রাট বাবরের (তৃতীয় পর্ব) আফগানিস্তানে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং পান্জাব বিজয়
১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রোজ শুক্রুবার এই ফরগানা
রাজ্যের রাজধানী আন্দিজানে ওমর শেখ মির্জা এবং তার স্ত্রী কুতলুঘ নিগারের রাজ প্রাসাদ
আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করে একটি ফুটেফুটে শিশু।
জন্মের পর শিশুটির নামকরণ করা হয় জহির উদ্দিন মোহাম্মদ নামে। তবে পরবর্তীতে শিশুটি ইতিহাসে বাবর নামে সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করে। মূলত বাবর ছিল তার উপাধী। বাবর তুর্কি শব্দ, এর অর্থ সিংহ। বাস্তবিকই তিনি সিংহের ন্যায় সাহসী ছিলেন। তেজ ও সাহসিকতা দ্বারা তিনি বাবর নামের সার্থকতা প্রমাণিত করেন। এই জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ বাবরই ছিলেন ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।
আরও পড়ুন: ভারতবের্ষ তুর্কিদের আগমন কিভাবে হয়?
বাবরের শিরা উপশিরায় মাতা ও পিতা উভয় দিক হতে মধ্য এশিয়ার দুই দুর্ধর্ষ বীরের রক্ত প্রবাহিত ছিল। পিতা ওমর শেখ মির্জা যেমন বিখ্যাত চাঘতাই তুর্কি বীর আমীর তৈমুর লঙ্গের অধস্তন পঞ্চম পুরুষ ছিলেন। তেমনি তার মাতা কুতলুঘ নিগার খানম ছিলেন মধ্য এশিয়ার মোঙ্গল নেতা ইউনুস খানের কন্যা। মাতার দিক দিয়ে তিনি মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চেঙ্গিস খানের অধস্তন চতুর্দশ পুরুষ ছিলেন।
![]() |
| ওমর শেখ মির্জা |
মোগল নামের উৎপত্তি: মাতার দিক হতে মোঙ্গলদের সাথে বাবরের সম্পর্ক থাকলেও বাবর মোঙ্গল ছিলেন না। তিনি ছিলেন চাগতাই তুর্কি। প্রকৃত পক্ষে চেঙ্গিস খানের দ্বিতীয় পুত্র চাঘতাই এর বংশদ্ভূত বলে বাবরের বংশধরদের চাঘতাই তুর্কি বলা হয়। বাবর তার আত্মচরিত “বাবরনামায়“ নিজেকে চাগতাই তুর্কি বলে উল্লেখ করেছেন এবং মোঙ্গলদের প্রতি তিনি অত্যন্ত ঘৃণাবাচক কটূক্তি করেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বাবর ইতিহাসে ‘মোগল’ হিসেবে পরিচিত।
যেহেতু মোঙ্গলদের মত বাবরও মধ্য এশিয়া থেকে ভারতবর্ষে অভিযান পরিচালনা করে স্বীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, তাই ভারতবর্ষের জনগণ বাবর এবং তার বংশীয়দের মোঙ্গল বলে অভিহিত করত। পরবর্তীতে এই মোঙ্গল থেকে মোগল নামের উৎপত্তি হয়। এবং এভাবে বাবরের প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ বা সাম্রাজ্য ইতিহাসে ‘মোগল সাম্রাজ্য’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
প্রাথমিক জীবন: বাবরের বাল্য জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তিনি তার আত্মজীবনীতে পিতা-মাতা ব্যাতিত দুজন ব্যাক্তির নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন। একজন তার শিক্ষক শেখ মজিদ এবং অন্যজন তার মাতামহী আয়মন দৌলত বেগম। শিক্ষক শেখ মজিদ থেকে তিনি তুর্কি, আরবি ও ফারসি ভাষা শিক্ষা লাভ করেন এবং কবিতা রচনায় দক্ষতা অর্জন করেন।
![]() |
| মাতামহী এবং বাবর |
অন্যদকে তার বুদ্ধিমতী মাতামহির সাহাচারযে ও প্রভাবে তিনি সাহসী, ধর্মভীরু, বিদ্বান ও সদাচারী হয়ে উঠেন। বাল্য জীবনে বাবরের চরিত্র গঠনে মাতামহীর দান অপরিসীম। প্রাথমিক জীবনে সুশিক্ষা লাভের ফলে বাবরের সংগ্রাম মুখর জীবন সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হয়েছিল। কিন্তু কৈশোরে তাকে নানা সমস্যা ও দুরযুগ মোকাবেলা করতে হয়েছিল। তাই নিশ্চিন্ত মনে ও একধ্যানে বিদ্যা অর্জনের সুযোগ তার হয়ে উঠেনি।
আরও পড়ুন: মুসলিম বিজয়ের পূর্বে ভারতবর্ষ কেমন ছিল?
১৪৯৪ খ্রি. পরগানার রাজ্যের সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন বাবরের পিতা আমীর ওমর শেখ মির্জা। তিনি ছিলেন একজন সুশাসক, কবি এবং পন্ডিত ব্যাক্তিত্ব। এ সময় সমগ্র মধ্য এশিয়া জুড়ে বিজয় অভিযান পরিচালনা করে সাইবানীদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সাইবানী খান। মধ্য এশিয়ায় অনেকগুলো রাজ্য তার সাম্রাজ্যভুক্ত করার পর সাইবানী খান দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ক্ষুদ্র রাজ্য পরগানার দিকে। এই সময় একটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মৃত্যু বরণ করে বাবরের পিতা ওমর শেখ মীর্জা। পিতার মৃত্যুর পর শত্রু বেষ্টিত পরগানার সিংহাসনে আরোহণ করেন ওমর শেখ মীর্জার জৈষ্ঠ পুত্র মাত্র এগারো বছর বয়সী বাবর।
ভিডিও দেখুন:
তথ্যের উৎস :
📘 ভারতবর্ষের ইতিহাস - ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান
📘 ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস – এ.কে.এম আবদুল আলীম
📘 মোগল সাম্রাজ্যের সোনালী অধ্যায় – শাহাদাত হোসেন খান
📘 ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস – ড. মুহাম্মদ ইনামুল হক
📘 ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ইতিহাস – ড. মোহাম্মদ গোলাম রসূল
📘 ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন – আব্দুল করিম
📘 মুঘল ভারতের ইতিহাস – মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান
📘 মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের ইতিহাস – অনিরুদ্ধ রায়
📘 উইকিপিড়িয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া এবং বিভিন্ন ব্লগ ও অনলাইস ওয়েব সাইট




0 মন্তব্যসমূহ