প্রাচীন মিশরের ইতিহাস | History of Ancient Egypt

প্রাচীন মিশরের ইতিহাস। মিশরীয় সভ্যতার ইতিহাস। মিশরের ফারাওদের বিস্ময়কর ইতিহাস। History of Ancient Egypt, Egypt Civilization, Story of Pharaoh.

                                                            


মিশরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন, সমৃদ্ধ, এবং রহস্যময়। নীল নদ ও পিরামিডের দেশ মিশর আফ্রিকা মহাদেশের মহাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণে ও এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত একটি আন্তঃমহাদেশীয় ভূমধ্যসাগরীয় স্বাধীন রাষ্ট্র। মিশর আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। মিশরের পশ্চিমে লিবিয়া, দক্ষিণে সুদান, উত্তর-পূর্বে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত গাজা উপত্যকার সীমান্ত রয়েছে।

মিশরের উত্তরে ভূমধ্যসাগর এবং পূর্বে আকাবা উপসাগর ও লোহিত সাগর।দেশটির পূর্ণ সরকারী নাম মিশর আরব প্রজাতন্ত্র। প্রাচীন যুগে মিশর সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সভ্যতা ছিল। এরপর বহু রাজবংশ ও সাম্রাজ্য মিশর শাসন করে। সর্বশেষ ১৯২২ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং ১৯৫৩ রাজতন্ত্রের পতনের মাধ্যমে প্রজাতান্ত্রিক মিশর প্রতিষ্ঠিত হয়।

কিভাবে মিশরীয় সভ্যতার উত্থান ও পতন হয়? কোন কোন সাম্রাজ্য মিশর শাসন করে? এবং মুসলমানরা কিভবে মিশর বিজয় করে? সেই সম্পর্কে জানতে আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ পড়ুন।

                     

প্রথিবীর ইতিহাসে প্রাচীনতম সভ্যতা সমূহের মধ্যে অন্যতম মিশরীয় সভ্যতা। এই সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে নীল নদের অববাহিকায়। প্রচীন মিশরীয় সভ্যতাকে প্রায় ৩১ টি রাজবংশ শাসন করেছিল। এই সভ্যতার রাজনৈতিক সময়কালকে চারভাগে ভাগ করা হয়।

                                           

নিল নদ ও পিরামিড

প্রথমত, প্রাক রাজবংশীয় যুগ, এই যুগের শাসনকাল ছিল ৫০০০ অব্দ থেকে ৩২০০ অব্দ পর্যন্ত। এই যুগে মিশর ভৌগোলিকভাবে দুইভাগে বিভক্ত ছিল। যথা Upper Egypt অর্থাৎ উচ্চ মিশর বা দক্ষিণাঞ্চল এবং  Lower egypt অর্থাৎ নিন্ম মিশর বা উত্তারঞ্চল। ৪৩০০ অব্দে নিন্ম মিশরের ‘নামার’ নামের এক বীর যুদ্ধা উচ্চ ও নিন্ম মিশরকে সর্বপ্রথম রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি ছিলেন মিশরের প্রথম ফারাও রাজা বা শাসক। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ফারওদের ফেরাউন নামে অভিহিত করা হয়েছে। 

 

দ্বিতীয়ত, প্রাচীন রাজবংশীয় যুগ, এই যুগের শাসন কাল ছিল ৩২০০ অব্দ থেকে ২২৩২ অব্দ পর্যন্ত। ১ম থেকে দশম রাজবংশ এই সময় মিশর শাসন করে। বীর যুদ্ধা নামারের ঐক্যবদ্ধ মিশর পরবর্তীতে বিভক্ত হয়ে গেলে,  ৩২০০ অব্দে উচ্চ মিশরের নেতা মেনেসের নেতৃত্বে মিশর পুনরায় একত্রিত হয়। তিনি মিশরে রাজবংশীয় যুগের সূচনা করে। তাই তাকে প্রথম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। প্রাচীন রাজবংশীয় যুগের তৃতীয় ও চতুর্থ রাজবংশের শাসনামলে নির্মিত হয় বিখ্যাত পিরামিড। এটি নির্মাণ করে ফারাও কুফুর।

 

তৃতীয়ত, মধ্য রাজবংশীয় যুগ, একাদশ থেকে সপ্তদশ রাজবংশ ২১৩২ থেকে ১৫৭৩ অব্দ পর্যন্ত এই যুগে মিশর শাসন করে। এ সময় সিরিয়া থেকে আগত হিকস যাযাবর জাতী মিশর আক্রমণ করে দেশটি দখল করে।

                           

চতুর্থত, নতুন রাজবংশের যুগ, অষ্টাদশ থেকে একত্রিশ রাজবংশ ১৫৭৩ থেকে ৩৩২ অব্দ পর্যন্ত এই যুগে মিশর শাসন করে। অষ্টাদশ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম আহমোজ ১৫৭৩ অব্দে হিক্সদের মিশর থেকে বিতাড়িত করে মিশরে নতুন রাজবংশীয় যুগের সূচনা করেন। উনবিংশ রাজবংশের অন্যতম বিখ্যাত ফারাও ছিলেন দ্বিতীয় রামিসিসি, তার শাসনামলে অর্থাৎ ১৩০০-১২৫০ অব্দে মূসা (আ) বনি ইসরাইল তথা ইহুদীদের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে মিশরের সিনাই উপদ্বীপে আগমন করেন।

                                           

মেসোডোনিয়া সাম্রাজ্য

নতুন রাজবংশীয় শাসনের পতনের যুগে অর্থাৎ ৫২৫ অব্দে পারস্যের আকেমেনিড সাম্রাজ্য মিশর দখল করলে, মিশরের নতুন রাজবংশ যুগের অধ:পতন ঘটে। পারসিয়ানরা ৫২৫ অব্দ থেকে ৩৩২ অব্দ পর্যন্ত মিশর শাসন করে।  এরপর ৩৩২ অব্দে মেসোডোনিয়া সাম্রাজ্যের রাজা গ্রীক বীর আলেকজান্ডার পারসিকদের পরাজিত করে মিশর দখল করে। ৩২৩ অব্দে আরেকজান্ডারের মৃত্যুর পর, তার সমগ্র সাম্রাজ্য সেনাপতিদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। এরই প্রেক্ষাপটে আলেকজান্ডারের অন্যতম সেনাপতি টলেমি মিশরে টলেমি রাজবংশের শাসনের সূচনা করে।

টলেমি রাজবংশের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত শাসক ছিলেন রাণী ক্লিওপেট্রা। তাকে নীল নদের সাপ বলা হয়। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৫১ থেকে ৩০ অব্দ পর্যন্ত মিশরের শাসন করেন। প্রাচীন মিশরের পরবর্তী ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ঘুরে আসতে হবে ঐতিহাসিক রুম থেকে। ২০০০ অব্দে রোমিউলাস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রোমান সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসক জুলিয়াস সিজার ৪৪ অব্দে নিহত হলে রোম ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অবশেষে তিন রোমান নেতা অক্টোভিয়াস সিজার, মার্ক এন্টনি এবং লেপিডাস একসাথে ক্ষমতায় আসেন। এ তিনজনের একত্রে শাসনকে ইতিহাসে ত্রয়ী শাসন বলা হয়।

                                    

রোমান সাম্রাজ্য

শক্তিবৃদ্ধির জন্য রোমান শাসক মার্ক এন্টনি বিয়ে করেন মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রাকে। যদিও খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দে সংঘটিত হওয়া ত্রয়ী যুদ্ধে অক্টোভিয়াস সিজারের কাছে প্রথমে লেপিডাস এবং পরে মার্ক এন্টনি ও রাণী ক্লিওপেট্রা পরাজয় বরণ করে। ফলে আক্টোভিয়াস সিজার শুধুমাত্র রোমান সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হননি একই সাথে তিনি মিশরের টলেমি সাম্রাজ্যকে রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেন। প্রসঙ্গত রোমান সম্রাট অক্টোভিয়াস সিজারের শাসনামলে অর্থাৎ ১ খ্রিস্টাব্দে হযরত ইসা (আ) এবং কথিত খ্রিস্ট ধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তখন থেকে সাল গণনার ইতিহাসে খ্রিস্টপূর্বের সমাপ্তি এবং খ্রিস্টাব্দের সূত্রপাত হয়।                  

আক্টোভিয়াস সিজার কর্তৃক ৩০ অব্দে রোমানদের মিশর বিজয় থেকে ৪৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ওয়েস্টার্ন বা পশ্চিমের রোমান সাম্রাজ্য মিশর শাসন করে। ৪৭৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়েস্টার্ন এম্পায়ারের পতন ঘটলে ইস্টার্ন রোমান বা বায়জান্টাইন সাম্রাজ্য মিশরে আধিপত্য বিস্তার করে। এরপর থেকে রোমান বায়জান্টাইন সাম্রাজ্য এবং পারস্যের সাসানীদ সাম্রাজ্যের মধ্যে মিশর দখলকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ চলতে থাকে।

প্রায় দেড়শত বছর পরের কথা! ৬১৯ খ্রি. আরবের মক্কা নগরীতে ইসলামের শেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (স) কুরাইশ কাফেরদের বয়কেট থেকে মুক্তি পেলেন। একই সাথে তিনি হারালেন প্রিয়তম স্ত্রী খাদিজা (রা) এবং একমাত্র অভিবাভক চাচা আবু তালিবকে। তাই এই বছর কে আমুল হুযন বা মহানবীর (স) জীবনের দু:খের বছর বলা হয়।

এই সময় পারস্যের সাসানিদ সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় খসরু পারভেজ। যিনি পরবর্তীতে মহানবীর (স) ইসলামের দাওয়াত পত্রকে টুকর টুকর করে ছিড়ে ফেলেছিলেন। সম্রাট দ্বিতীয় খসরু পারভেজ বায়জান্টাইন সম্রাট মারকুইসকে পরাজিত করে মিশর দখল করে। এরপর ৬১৯ থেকে ৬২৮ খ্রি. পর্যন্ত মিশর সাসানিদ সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে থোকে। ৬২৮ খ্রি. বিখ্যাত বায়জান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াস পারসিকদের পুনরায় পরাজিত করে মিশরে পুনরুদ্ধার করেন।

                                            

মুসলমানদের মিশর বিজয়

৬৩৯ খ্রি. পর্যন্ত মিশর বায়জান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। অতপর রাশেদিন খিলাফত এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা) এর শাসনামলে ৬৩৯ থেকে ৬৪১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বায়জান্টাইন খ্রিস্টাদের পরাজিত করে মুসলমানরা মিশর বিজয় করে। মুসলমানদের বিজয়ের মাধ্যমে মিশরের প্রাচীন ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে।

৬৩৯ থেকে ১৮৬৭ খ্রি. পর্যন্ত মিশর শাসন করে বিভিন্ন মুসলিম সাম্রাজ্য কিংবা রাজবংশ। ১৮৮২ থেকে ১৯২২ খ্রি, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরা ব্রিটিশরা মিশর দখল করে। ১৯২২ খ্রি. তৎকালীন মিশরের রাজবংশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে নামেমাত্র স্বাধীনতা লাভ করে। অবশষে ১৯৫৩ খ্রি. রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে কর্নেল জামাল নাসের প্রজাতান্ত্রিক মিশর প্রতিষ্ঠা করেন।

তথ্যের উৎস :

📘 মিশরের ইতিহাস - আইজাক আসিমভ, অনুবাদ - দ্বিরেন্দ্রনাথ রমন

📘 প্রাচীন মিশরের রুপকথা ও রুপান্তর - তুষার ঘুষ

📘 মিশরীয় সভ্যতা - ড. এ.কে.এম শাহনেওয়াজ।

📘 প্রাচীন মিশর - শাহাদাত হোসেন খান

📘 মিশরীয় সভ্যতা - আলী ইমাম

📘 উত্তর আফ্রিকা ও মিশরে মুসলিম শাসনের ইতিহাস - ড. গোলাম কিবরিয়া ভূইয়া

📘 উত্তর আফ্রিকা ও মিশরের ইতিহাস - এ.এইচ.এম শামসুর রহমান

📘 সিরিয়া, মিশর ও উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস - ড. আব্দুল করিম

📘 মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস - কে. আলী

📘 মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস - ড. ইনামুল হক

📘 আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য - সফিউদ্দীন জোয়ারদার

📘 মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস (অটোমান সাম্রাজ্য থেকে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রাষ্ট্র) - এ.বি.এম হোসেন

📘 উইকিপিড়িয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া এবং বিভিন্ন ব্লগ ও অনলাইস ওয়েব সাইট

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ