প্রাচীন বাংলার জনপদ সমূহের পরিচিতি। ১৬ টি প্রাচীন বাংলার জনপদ সম্পর্কে জানোন। Janapadas of Ancient Bengal । The Sixteen Janapadas of Ancient Bengal.
বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি দেশ। এটি বর্তমানে ৮ বিভাগীয় এবং ৬৪ টি জিলা অঞ্চল নিয়ে গঠিত। তবে প্রাচীন কালে বাংলাদেশ বলতে কোন নাম কিংবা দেশের অস্তিত্ব ছিল না। বাংলাদেশ বলতে এখন যে দেশটিকে বুঝায়, তখন সে অঞ্চলে কোন অখন্ড রাজ্যও ছিল না। এদেশ তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এ রাজ্যগুলোকে সেই সময় বিভিন্ন জনপদ নামে অভিহিত করা হত। প্রাচীন বাংলায় মোট ১৬ টি জনপদ ছিল। তার মধ্যে ১০ টি জনপদের সমষ্টি নিয়ে গঠিত হয় বর্তমান বাংলাদেশ।
প্রাচীন বাংলার জনপদ সমূহ কি কি ছিল? বর্তমানের কোন কোন অঞ্চল
নিয়ে এই জনপদ সমূহ গঠিত ছিল? সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ
পড়ুন।
১.প্রাচীন বাংলার প্রথম জনপদটি ছিল- বঙ্গ। বঙ্গ জনপদটি বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা জেলা নিয়ে গঠিত ছিল। বঙ্গে প্রাচীন কালে একটি বৃহৎ রাজ্য ছিল। ঢাকার সোনারগাও বা সুবর্ণগ্রাম ছিল এ জনপদের রাজধানী। এমনকি বঙ্গ থেকে বাংলা নামের উৎপত্তি হয়।
২.বাংলার প্রাচীনতম জনপদের মধ্যে দ্বিতীয়টি ছিল পুন্ড্র। বর্তমান বাংলাদেশের বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী এবং দিনাজপুর পুন্ড্র জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বগুড়া জেলার মহাস্থান গড়কে তখন পুন্ড্রনগর বলা হত। আর এই পুন্ড্রনগর ছিল পুন্ড্র জনপদের রাজধানী।
আরও পড়ুন: রাজা শশাঙ্ক সম্পর্কে জানোন।
৩.তৃতীয় প্রধান জনপদ ছিল গৌড়। বর্তমান বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে গৌড়ের অবস্থান ছিল না। তবে বর্তমান ভারতের পশ্চিম বঙ্গের মালদাহ, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বর্ধমান ও হুগলি জেলার অংশ নিয়ে গৌড় জনপদ গড়ে উঠেছিল। সপ্তম শতাব্দীতে গৌড়ের রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদের নিকটবর্তী কর্ণসুবর্ণা। বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর সন্নিকটের এলাকা গৌড় রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই জনপদকে কেন্দ্র করে রাজা শশাঙ্ক বাংলার প্রথম স্বাধীন গৌড় রাজ্য স্থাপন করেন। মুসলিম শাসনামলে গৌড়কে লখনৌতি নামকরণ করা হয়।
![]() |
৪.রাঢ ছিল প্রাচীন বাংলার চতুর্থ জনপদ। রাঢের অপর নাম ছিল সুক্ষ। ভাগরথী নদীর পশ্চিম তীরে রাঢ জনপদের অবস্থান ছিল। অজয় নদ এই্ জনপদকে উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ নামে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। প্রাচীন বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ নদী বন্দর ‘‘ সপ্তগ্রাম’’ দক্ষিণ রাঢ়ের ভগরীথী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল।
৫.প্রাচীন
বাংলার পঞ্চম জনপদ ছিল সমতট। বাংলাদেশের কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলা নিয়ে
সমতট গঠিত ছিল। কুমিল্লা জেলা ছিল সমতটের প্রধান কেন্দ্র। সমতট রাজ্যের রাজধানী ছিল
কুমিল্লার বড় কামতা।
৬.হরিকেল ছিল প্রাচীন বাংলার ষষ্ট জনপদ। বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রাম নিয়ে হরিকেল জনপদ গড়ে উঠেছিল। সিলেটকে তখন বলা হত শ্রীহট্ট এবং চট্টগ্রামকে বলা হত চাটগাঁও। প্রসঙ্গত আরাকানি শব্দ চেত তৌ গাং হতে চাটগাঁও শব্দের উৎপত্তি। হরিকেল রাজ্যের রাজধানী বর্দ্ধমানপুর, কর্ণফুলী নদীর মোহনায় বর্তমান দোয়াব পাহাড়ের পূর্বে সাঙ্গু দেশে অবস্থিত ছিল।
৭.চন্দ্রদ্বীপ ছিল প্রাচীন বাংলার সপ্তম প্রসিদ্ধ জনপদ। এ জনপদটির অবস্থান ছিল বর্তমান বাংলাদেশের বাখেরগন্জ অর্থাৎ বরিশাল জেলায়।
৮.বাংলার অষ্টম জনপদ ছিল বরেন্দ্র। বর্তমান বাংলোদেশের বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলা এবং চাপাইনবাবগন্জ, নওগা, নাটোর পাবনার কিছু অংশ নিয়ে বরেন্দ্র জনপদ গড়ে উঠে। তাছাড়া ভারতের পশ্চিম বঙ্গের মালদাহ, কুচবিহার এবং দার্জিলিং এর কিছু অংশ বরেন্দ্র জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতে, বরেন্দ্র পুন্ড্রনগর ভুক্তির অন্তুর্ভুক্ত ছিল।
আরও পড়ুৃন: বাঙ্গালি জাতির উৎপত্তি
৯.প্রাচীন বাংলার নবম জনপদ ছিল অঙ্গ। এটি প্রাচীন ভারতের ষোড়শ জনপদের মধ্যেও অন্যতম একটি ছিল। অঙ্গ রাজ্যের রাজধানী ছিল চম্পা। বঙ্গ রাজ্যের প্রবেশ পথে অঙ্গ জনপদের অবস্থান ছিল বলে, এটিকে দ্বার বঙ্গও বলা হত। গুপ্ত শাসনামলে অঙ্গ জনপদ তীরভুক্তি নামেও পরচিত ছিল। তীরভুক্তি থেকে ত্রিহুত নামের উৎপত্তি হয়। আর মধ্য যুগে ত্রিহুত মিথিলা নামেই অধীক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সে যুগে মিথিলা ধর্ম, বিদ্যা ও সংষ্কৃতি চর্চার কেন্দ্রস্থল ছিল। মিথিলার বিখ্যাত কবি ছিলেন বিদ্যাপতি। পরবর্তীতে অঙ্গ রা্জ্যকে পূর্ণিয়া নামেও অভিহিত করা হয়।
১০.বঙ্গাল ছিল প্রাচীন বাংলার দশম জনপদ। কোন কোন ঐতিহাসিক বঙ্গ ও বঙ্গালকে এক ও অভিন্ন জনপদ হিসেবে উল্লেখ করলেও প্রকৃতপক্ষে এ দুইটি পৃথক জনপদ ছিল। এই দুইটি জনপদের মধ্যে সীমানা ছিল গঙ্গা ও ভাগীরথী নদী।
১১.একাদশ জনপদ বর্ধ্দমান ভুক্তি গুপ্ত যুগ একটি পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠে। অনেক সময় দক্ষিণ রাঢ় বর্ধ্বমান মুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভগরীথীর নদীর তীরে অবস্থিত সপ্তগ্রাম সমুদ্র বন্দর বর্ধ্দমান ভুক্তির অন্তর্গত ছিল।
![]() |
| তাম্রলিপ্তি বন্দর |
১২.প্রাচীন বাংলার দ্বাদশ জনপদ হলো- তাম্রলিপ্তি বা দন্ডভুক্তি। দন্ডভুক্তি বর্ধমানভুক্তির দক্ষিণে অবস্থিত ছিল। বর্তমান ভারতের উড়িষ্যা ও মেদীনীপুর এই জনপদের অন্তর্ভুক্তি ছিল। পরবর্তীতে দন্ডভুক্তি তাম্রলিপ্তি নামে পরিচিতি লাভ করে। তাম্রলিপ্তি জনপদের রাজধানী ছিল তাম্রলিপ্ত বন্দর। এটি ছিল পূর্ব ভারতের অন্যতম বিখ্যাত সমুদ্র বন্দর।
১৩.শ্রীহট্টমন্ডল ছিল ত্রয়োদশ জনপদ। প্রধানত সুরমা ও কুশিয়ারার দোয়াব অঞ্চল নিয়ে মূল শ্রীহট্ট মন্ডল গঠিত ছিল। বর্তমান সিলেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল এই জনপদ
১৪. চতুর্দশ জনপদ হলো কঙ্কাগ্রাম ভুক্তি। ময়ুরাক্ষী নদীর অববাহিকতা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।
১৫.প্রাচীন বাংলার পঞ্চদশ জনপদ ছিল বরাকমন্ডল। ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে বরাকমন্ডলের নাম পাওয়া যায়। প্রধানত দক্ষিণ ও মধ্যবঙ্গ বরাকমন্ডল নামে পরিচিত ছিল।
১৬.প্রাচীন বাংলার ষোড়শ ও সর্বশেষ জনপদ ছিল কজঙ্গল। বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতাল পরগনা, বাকুড়া, পুরুলিয়া ইত্যাদী জেলা নিয়ে প্রাচীন কালে কজঙ্গল জনপদ গঠিত হয়েছিল।
উক্ত ১৬ টি জনপদের মধ্যে বঙ্গ, গৌড়, পুন্ড্র, রাঢ়, সমতট, হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, বরেন্দ্র, শ্রীহট্টমন্ডল, বর্ধ্দমান ভুক্তি এই জনপদের অংশবিশেষ নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ গঠিত। সপ্তম শতকের প্রারম্ভে রাজা শশাঙ্ক গৌড়ের ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়ে বিভিন্ন জনপদকে একত্রিত করে অখন্ড বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা শুরু করেন। পরবর্তীতে পাল ও সেন যুগে সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে।
আরও পড়ুন: বখতিয়ার খলজির বাংলা ও বিহার বিজয়
অবশেষে মুসলিম শাসনামলে ঐক্যবদ্ধ বাংলা গঠনের প্রচেষ্টা স্বার্থক হয়্। ১২০৪ খ্রি. তুর্কি মুসলিম বীর বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের পর প্রাচীন বাংলার জনপদ সমূহ গৌড় বা লখনৌতি এবং বঙ্গ রাজ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। অত:পর ১২৪২ খ্রি থেকে ১২৪৪ খ্রি মধ্যে ইলিয়াস শাহ লখনৌতি ও বঙ্গকে একত্রিক করে বাঙ্গালা নামে অভিহিত করেন। এই বাঙ্গালা নাম থকে পরবর্তীতে বাংলা এবং বাংলাদেশ নামের উৎপত্তি হয়।
ইলিয়াশ শাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ঐক্যৈবদ্ধ বাংলা রাষ্ট্রের জনগণ বাঙ্গালী নামে আত্মপ্রকাশ করে। ইলিয়াশ শাহ নিজেকে বাংলা রাষ্ট্রের স্বাধীন ও সার্বভৌম সুলতান হিসেবে এবং বাঙ্গালীদের জাতীয় শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি শাহ-ই-বাঙ্গালা এবং শাহ ই বাঙ্গালি উপাধী ধারণ করেন। তাই তাকে অখন্ড বাংলার প্রথম স্বাধীন শাসক হিসেবে বিবেচিত করা হয়।
![]() |
| সুলাতন ইলিয়াশ শাহ |
মুগল আমলে এই অঞ্চল সুবা বাংলা নামে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজ শাসনামলে বাংলা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি বলতে বর্তমান বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যাকে বুঝাত। পরে শুধু বাংলা ভাষাভাষীদের সমন্বয়ে বাংলা প্রদেশ গঠিত হয়।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতীতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হলে বাঙালি মুসলমান অধ্যূষিত এলাকা পূর্ব বাংলা পাকিন্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। তখন পূর্ব বাংলার নতুন নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান । অবশেষে ১৯৭১ খ্রি. মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তান, পাকিস্তানের বিরোদ্ধে বিজয় লাভ করে পৃথিবীর বুকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নব্য এ স্বাধীন ভূখন্ড বাংলাদেশ নামধারণ করে। এভাবে প্রাচীন জনপদ সমূহ থেকে বর্তমান বাংলাদেশের উদ্ভব হয়।
📘বাংলাদেশের ইতিহাস- কে আলী 📘বাংলাদেশের ইতিহাস- ড. মো: শাহাজাহান 📘বাংলার ইতিহাস- সূনিতী কুমার চট্টোপাধ্যায় 📘ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস- ড.এ.কে.এম আব্দুল আলীম 📘ভারতবর্ষের ইতিহাস- ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান
📘 প্রাচীন বাংলার ইতিহাস - ড. এ.কে.এম শাহানেওয়াজ
📘 প্রাচীন বাংলার ইতিহাস - ড. আবু নোমান
📘 উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন ওয়েবসাইট।
📘 বাংলার ইতিহাস (প্রাচীন কাল) - রমেশচন্দ্র মুজমদার।
📘 বাংলার ইতিহাস (আদিকাল-১২০৬ খ্রি.) - আবদুস ছালাম
📘 বাংলার ইতিহাস - মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন
📘 ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান
📘 উইকিপিড়িয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া এবং বিভিন্ন ব্লগ ও অনলাইস ওয়েব সাইট




0 মন্তব্যসমূহ