পূর্বের অংশ পড়ুন : মুহাম্মদ সঃ এর বাল্যকাল এবং সিরিয়া গমন ।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বযুগের
সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তাঁর জীবনের প্রতিটি কাজ মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক ও আদর্শ শিক্ষা
হিসেবে সর্বজন সমাদৃত। মহানবী (সা.)-এর জীবনের তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে
'হিলফুল ফুজুল' প্রতিষ্ঠা। 'হিলফুল ফুজুল' অর্থ শান্তিসংঘ। নবুয়তপ্রাপ্তির ১৫ বছর আগে
মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি আরব সমাজের সব অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে
তাঁর সমবয়সী কিছু যুবককে নিয়ে এ শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আরব সমাজের সব অন্যায় প্রতিরোধের লক্ষ্যে হিলফুল ফুজুল গঠিত হলেও একটি বিশেষ যুদ্ধের ভয়াবহতার পরিপ্রেক্ষিতে মহানবী (সা.) এ সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন । এ যুদ্ধের নাম 'হরবুল ফুজ্জার' বা অন্যায় সমর। মুহাম্মদ সঃ চাচা আবু তালেবের সাথে সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরে আসার কিছুদিন পরের কথা। সম্ভবত ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে ওকাজ মেলার ঘোড়দৌড়, জুয়াখেলা ও কাব্য প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে পবিত্র জিলকদ মাসে মক্কার কোরাইশ ও কায়িস গোত্রের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। আরবে পবিত্র জিলকদ মাস ছিল শান্তির মাস।
এ মাসে আরব দেশে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। তাই জিলকদ মাসে শুরু হওয়া এ যুদ্ধকে
'হরবুল ফুজ্জার' বা অন্যায় সমর বলা হয়। ৫৮৫
থেকে ৫৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল এবং যুদ্ধে অনেক
লোক প্রাণ হারিয়েছিল। যেহেতু এই যুদ্ধ কুরাইশ
এবং কায়েস বংশের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল, তাই মুহাম্মদ সঃ কে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার চাচা
আবু তালেবের সাথে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল। মুহাম্মদ সঃ এবং তার চাচা যুবাইয়েরের
কাজ ছিল তীর সংগ্রহ করে চাচার হাতে তুলে দেওয়া। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর এই যুদ্ধ একটি সন্ধির
মাধ্যমে বন্ধ হয়।
.
.
কিন্তু এই যুদ্ধের বীভৎসলীলা দেখে
মুহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন এবং আরববাসীদের এরূপ ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে
পরিত্রাণের উপায় নিয়ে ভাবতে থাকেন। আরবে শান্তি বজায় রাখার জন্য তিনি একটি শান্তিসংঘ
গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে যুবক মুহাম্মদ সঃ তাঁর সমমনা নিঃস্বার্থ
কিছু উৎসাহী যুবক ও পিতৃব্য জুবাইরকে নিয়ে তিনি এ শান্তিসংঘ গঠন করেন। এ সংঘের চারজন
বিশিষ্ট সদস্য ফজল, ফাজেল, ফজায়েল ও মোফাজ্জেলের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল
'হিলফুল ফুজুল'।
এ সংঘের কর্মসূচি তথা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল যথাক্রমে: (১) দেশে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, (২) বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সদ্ভাব ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করা, (৩) অত্যাচারিতকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করা, (৪) দুর্বল, অসহায় ও এতিমদের সাহায্য করা, (৫) বিদেশি বণিকদের জান ও মালের নিরাপত্তা বিধান করা এবং (৬) সর্বোপরি সব ধরনের অন্যায় ও অবিচার অবসানের চেষ্টা করা। এ শান্তিসংঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে স্থায়ী হয়েছিল।
এভাবে মুহাম্মদ (সা.) মানুষের কল্যাণের
জন্য আত্মনিয়োগ করেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত হিলফুল ফুজুলই বিশ্ব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কল্যাণী
সেবাসংঘের মর্যাদা লাভ করে। আর এভাবে হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই শান্তির
অগ্রদূত হিসেবে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করেন। জাহেলি যুগে আরব সমাজের অন্যায়, অবিচার
প্রতিরোধ করার জন্য হিলফুল ফুজুল গঠিত হলেও মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে গঠিত এ সংগঠনটির
শিক্ষা সর্বকালের, সর্বসমাজের যুবকদের জন্য একটি আদর্শ শিক্ষা ও পথনির্দেশক হয়ে রয়েছে।
বর্তমান যুগে জাহেলি যুগের মতো কলুষিত সমাজ পরিলক্ষিত না হলেও পৃথিবীর সব দেশে, সব সমাজেই এখনো বহু অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্য রয়ে গেছে। এখনো সমাজে বহু মানুষ নিপীড়িত, নির্যাতিত ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এখনো সমাজে হত্যা, নারী নির্যাতন, সুদ, ঘুষ প্রভৃতি অসামাজিক কাজ কম-বেশি প্রচলিত রয়েছে। হিলফুল ফুজুলের মতো সংগঠিত হয়ে যুবসমাজ আজও সমাজের সব অন্যায় প্রতিরোধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ইসলাম ধর্মে যুবকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। যুবক বয়সের ইবাদত আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়। প্রকৃতপক্ষে যুবক বয়সই দেশ ও জাতি গঠনে দায়িত্ব পালনের শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় গায়ে থাকে শক্তি এবং মনে থাকে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও সাহস। এ শক্তি ও সাহস কাজে লাগিয়ে শুধু সামাজিক অসাম্য দূরীকরণই নয়, পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়ন ও সার্বিক কল্যাণ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব।
হিলফুল ফুজুল শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই শেখায়নি, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধনের শিক্ষা দিয়েছে। মহানবী (সা.)-এর এই সংগঠনের আলোকে প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন অনেকটাই নিশ্চিত হবে। মহানবী (সা.)-এর এ আদর্শ প্রত্যেক যুবকের মনে প্রতিফলিত হোক। আমিন।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : মুহাম্মদ সঃ এর সাথে বিবি খাদিজার বিয়ে ।
তথ্যের উৎস সমূহ:
১. আরব জাতির ইতিহাস - শেখ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ।
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট ।
0 মন্তব্যসমূহ