পূর্বের অংশ পড়ুন : যুবক মুহাম্মদ (সঃ) এবং পৃথিবীর প্রথম শান্তি সংঘ হিলফুল ফুজুল ।
ছোটবেলা থেকেই হযরত মুহাম্মদ সঃ সত্যবাদী ছিলেন। এ কারণে আরবের বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যক্তিরা মুহাম্মদ (স.) কে আমানতদার হিসেবে গ্রহণ করে। নম্র ব্যবহার, সততা, সরলতা, বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা, প্রভৃতি কারণে তিনি আরববাসীর শ্রদ্ধা অর্জন করেন। তার প্রভূত কর্তব্য নিষ্ঠা, চরিত্রের মাধুরর্য, সরলতা, পবিত্রতা, সত্যের প্রতি অনুরাগ, ইত্যাদি কারণে মক্কাবাসীগণ তাকে আল আমীন বা বিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত করেন। পঁচিশ বছর বয়সেই তিনি সমগ্র আরবে আল আমীন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।
এর ফলে মুহাম্মদ সঃ
এর সরলতা,অনুপম চরিত্র,সত্যনিষ্ঠার খ্যাতি আরবের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আল আমীন
মুহাম্মদ (স.) এর সাধুতা ও বাণিজ্যিক দক্ষতা সর্বত্রে সুবিদিত ছিল। এ সময় মক্কায়
বিবি খাদিজা নামের একজন ধনাঢ্য মহিলা বাস করতেন। তিনি আরবের বনু সাদ গোত্রের এক
সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী মহিলা। তিনি মুহাম্মদ (স.) এর দূর সম্পর্কের চাচাতো বোন
ছিলেন। বিবি খাদিজা রাঃ অত্যন্ত সম্মানিত ও সচ্চরিত্রের অধিকারী মহিলা ছিলেন।
লোকেরা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে তাহিরা বা পবিত্রা বলে ডাকতো।
তামিম গোত্রের আবু হালা ইবনে জারারার সাথে তার প্রথম বিয়ে হয়। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর বিয়ে হয় বনু মখজুম গোত্রের আতিক ইবনে আয়াজের সাথে। দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর বিপুল ধনসম্পদ আসে তার হাতে।
এই দুই স্বামীর ঔরসে তার দুই পুত্র এবং এক কন্যা ছিল। তিনি বিভিন্ন লোক নিয়োজিত
করে ব্যবসা পরিচালনা করতনে। মুহাম্মদ সঃ এর সততা, কর্মদক্ষতা, বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতায়
মুগ্ধ হয়ে খদিজা রাঃ তাকে তার বাণিজ্যের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। হযরত মুহাম্মদ
সঃ তিনবার সিরিয়া সফরের মাধ্যমে ব্যবসায়ে অনেক ধন সম্পদ লাভ করেন।
বিত্তবান, সম্ভ্রান্ত, সুন্দরী, বুদ্ধিমতী বিধবা খাদিজার বিয়ের ব্যাপারে অনেকের আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না। সকলের প্রতিটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ তিনি জানতেন এ প্রস্তাবগুলো যারা নিয়ে এসেছে তারা মূলত তার ধন সম্পদের লোভে এই প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। তিনি একজন সৎ চরিত্রবান এবং বিশ্বস্থ মানুষ খুঁজছিলেন। বাণিজ্য কাফেলা ফিরে আসার পর মায়সারা নামের এক অনুচর মুহাম্মদ (স.) এর চরিত্র-বৈশিষ্ট্য আচার-আচরণ লেনদেন সবকিছুর সবিস্তার বর্ণনা দিলেন খাদিজা রাঃ এর কাছে এবং শুনে তিনি মুগ্ধ হলেন। এইভাবে বিবি খাদিজা মুহাম্মদ সঃ এর প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন।
তবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি পরামর্শ নেয়ার জন্যে চাচাতো ভাই প্রাজ্ঞ ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে গেলেন। ওয়ারাকা যুবক মুহাম্মদ (স.) এর বর্ণাঢ্য ভবিষ্যতের কথা বললেন। খাদিজা রাঃ এরপর তার
সহচারী নাফিসার মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব প্রেরণ করেন। বিবি খাদিজার বিবাহের
প্রস্তাব মুহাম্মদ সঃ চাচা আবু তালিবের সম্মতিক্রমে রাজি হলেন। বিয়ের দিন ক্ষন
নির্ধারিত হয়। নির্দষ্ট দিনে আবু তালিব, হযরত হামজা এবং বংশের অপরাপর বিশিষ্ট
ব্যক্তিদের নিয়ে হযরত মুহাম্মদ (স.) বিবি খাদিজার বাড়িতে
উপস্থিত হন।
বিবি
খাদিজার বাবা খওলিদ হারবুল ফিজার যুদ্ধে মারা যাওয়ায় তার চাচা ওমর বিন আসাদ
উপস্থিত থেকে বিয়ে দেন। আবু তালিব বিয়ের খুৎবা পাঠ করেন। পাঁচশ দিরহাম
স্বর্ণমুদ্রা বিবাহের মোহরানা নির্ধারিত হয়। বিয়ের সময় বিবি খাদিজা রাঃ এর বয়স ছিল
৪০ বছর এবং হযরত মুহাম্মদ (স.) এর বয়স ছিল ২৫ বছর। ৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের ইতিহাসে
অনুষ্ঠিত হয় এই অসাধারণ বিয়ে। বয়সের তারতম্য সত্ত্বেও তাদের দাম্পত্য জীবন খুবই
শান্তিপূর্ণ ও প্রীতিমধূর ছিল।
এই
মহিয়সী নারীর গর্ভে মুহাম্মদ (স.) এর তিন পুত্র এবং চার
কন্যা জন্মগ্রহণ করে। শৈশবেই তিন পুত্র কাসেম, তৈয়ব ও তাহেরের মৃত্যু হয়। চার
কন্যা ছিলেন যয়নব কুলসুম, রোকেয়া ও ফাতিমা। মুহাম্মদ সঃ এর প্রথম কন্যা যয়নবের
বিয়ে হয় চাচতো ভাই আবুল আস ইবনে রাবির সাথে। অপর দুই কন্যা রোকেয়া ও কুলসুমের
সঙ্গে হযরত ওসমানের বিবাহ হয়েছিল বলে তাকে যুন্নুরায়েন বা দুই জ্যেতির অধিকারী বলা
হয়। সর্বকনিষ্ঠা কন্যা ফাতেমা আজ জোহরার বিবাহ হয় হযরত আলী রাঃ এর সঙ্গে। হযরত
মুহাম্মদ সঃ এর বয়স যখন পঞ্চাশ বছর, তখন বিবি খাদিজা ইন্তেকাল করেন।
তাঁদের
দাম্পত্য জীবন সর্বমোট ২৪ বছর অব্যাহত ছিল। খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যু পর্যন্ত নবী
(সা.) অন্য কোনো বিয়ে করেননি। বিবি খাদিজা রাঃ সম্পর্কে বলা হয়, “ নবুয়ত
লাভের পর যখন কেউ মুহাম্মদ সঃ কে বিশ্বাস করে নাই তিনিই সর্বপ্রথম তার উপর বিশ্বাস
স্থাপন করেছিলেন, যখন কেউ তার বন্ধুত্ব গ্রহণ করে নাই, তখন তিনিই তাকে বন্ধুরূপে
আলিঙ্গন করেন ; যখন কেউ তাকে সাহায্য করে নাই, তখন তিনিই মুহাম্মদ সঃ কে সাহায্য
করেন।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : মুহাম্মদ (সঃ) নবুয়ত লাভ : ইসলামের প্রবর্তক বিষয়ে ভুল ধারণার নিরসন ।
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
0 মন্তব্যসমূহ