আকামেনিদ সাম্রাজ্য । পারস্যে আকামেনিদ শাসনের ইতিহাস

                                 
পারস্য উপসাগরের উপকূল ঘেঁষে সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে জার্গোস পর্বতমালা। এই পর্বতমালার পাদদেশ থেকে পূর্ব দিকে ভারতীয় প্লেট পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানি মালভূমি। ভৌগলিকভাবে ত্রিকোণাকৃতির এই অঞ্চল ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত পারস্য নামে পরিচিত ছিল, যা আজকের দিনে ইরান নামে পরিচিত। এই অঞ্চলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইতিহাস বিখ্যাত পারস্য সাম্রাজ্য।

আরও পড়ুন: সেলিসিউড সাম্রাজ্যের ইতিহাসসে

পৃথিবীর ইতিহাসে আজ অবধি যতগুলো বৃহৎ এবং প্রভাবশালী সাম্রাজ্যের নাম পাওয়া যায়, তন্মধ্যে পারস্য সাম্রাজ্যের নাম একদম উপরের দিকেই থাকবে। সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেটের হাতে উৎপত্তি লাভ করা এই সাম্রাজ্যটিই পৃথিবীর প্রথম পরাশক্তি। পারস্য সাম্রাজ্য মূলত পারস্য অঞ্চলে ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্য পর্যায়ক্রমিকভাবে উৎপত্তি লাভ করা একাধিক সাম্রাজ্যের সমষ্টি।

ইতিহাসবিদগণ এই সময়কালকে মোট চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন- ১. আকামেনিদ সাম্রাজ্য , যা খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ পর‌্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। ২. সেলুসিড সাম্রাজ্য যার বিস্তৃতি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩১২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ পর‌্যন্ত । ৩. পার্থিয়ান সাম্রাজ্য যা খ্রিস্টপূর্ব ২৪৭ থেকে ২২৪ খ্রিস্টাব্দ পর‌্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। সর্বশেষ সাসানীয় সাম্রাজ্যে, এই সাম্রাজ্যের যাত্রা শুরু হয় ২২৬ খ্রিস্টাব্দে এবং মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে ৬৫১ খ্রিস্টাব্দ সাম্রাজ্যেটির পতন ঘটে।                       

আকামেনিদ সাম্রাজ্য ম্যাপ

এদের মধ্যে আকামেনিদ সাম্রাজ্য এবং সাসানীয় সাম্রাজ্য পারস্য সাম্রাজ্যে পারসিকদের শাসন। অপরদিকে, সেলুসিড এবং পার্থিয়ান সাম্রাজ্য মূলত পারস্য সাম্রাজ্যে গ্রিকদের শাসনকে বুঝায়। এই পর্ব জানবো আকামেনিদ সাম্রাজ্যের উত্থান পতন সম্পর্কে। 

সুবিস্তৃত ইরানি মালভূমিতে প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেরও বেশি সময় থেকে বিভিন্ন যাযাবর গোষ্ঠী বাস করত, যারা গরু, ছাগল, ভেড়া প্রভৃতি চড়াত। এরকমই এক গোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন দ্বিতীয় সাইরাস, ইতিহাসে যিনি সাইরাস দ্য গ্রেট নামে পরিচিত। ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি ঐ অঞ্চলের বিভিন্ন গোত্রকে একত্রে করতে সক্ষম হন, এবং পারস্যের উত্তরাংশে অবস্থিত শক্তিশালী মেদেস রাজ্য জয় করেন। মেদেস ছিল তারই নানা অ্যাসটিয়াজেসের রাজ্য, যার রাজধানী ছিল একবাটানা।

আরও পড়ুন: পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের ইতিহাস

তারপর তিনি একে একে লিডিয়া, ব্যাবিলনের মতো শক্তিশালী রাজ্যগুলোও জয় করলেন, এবং এই তিন রাজ্যকে অভিন্ন শাসনব্যবস্থায় নিয়ে এসে গোড়াপত্তন করলেন এক নতুন সাম্রাজ্যের- যা আকামেনিদ সাম্রাজ্য নামে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে। এই আকামেনিদ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমেই যাত্রা শুরু করে ইতিহাসের প্রথম পারস্য সাম্রাজ্য। সম্রাট সাইরাস ক্ষমতায় আরোহণ করেই 'পারস্যের শাহ'  উপাধি ধারণ করলেন। মূলত এই সময় থেকেই পারস্যের সম্রাটরা শাহ নামে পরিচিতি লাভ করে।                 

সম্রাট সাইরাস
এরপর সম্রাট সাইরাস প্যাসারগাড শহরের গোড়াপত্তন করে সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করলেন। আকামেনিদ সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট দারিয়ুস দ্য গ্রেটের শাসনামলে সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটে। এসময় এটি মধ্য এশিয়াসহ উত্তরে বলকান উপদ্বীপ তথা বর্তমান রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, ইউক্রেন, পশ্চিমে লিবিয়া, মিশর এবং পূর্বে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মানসভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সভ্যতা যথা মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, নীলনদকে ঘিরে গড়ে ওঠা মিশরীয় সভ্যতা এবং সিন্দু নদ অববাহিকায় সিন্দু সভ্যতা এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পৃথিবীর ইতিহাসে পারসিকরাই সর্বপ্রথম যারা এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মাঝে সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। পৃথিবীর প্রথম ডাকসেবা তার হাত ধরেই চালু হয়। এসব কারণে দারিয়ুস দ্য গ্রেটকে পারস্য সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে গণ্য করা হয়।

দারিয়ুস দ্য গ্রেটের সময়ে গ্রিস এবং পারস্যের মধ্যে সর্বপ্রথম ৪৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাটল অভ ম্যারাথন যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে পারসিকরা পরাজিত হয় এবং দারিয়ুস নিহত হয়। এই যুদ্ধের ঠিক ১০ বছর পর আরেকটি ইতিহাসখ্যাত যুদ্ধ সংঘটিত হয় দারিউসের সম্রাট জারজিস শাসনামলে। গ্রিসকে সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে পিতার পরাজয়ের প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে তিনি তার বিশাল সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনী নিয়ে গ্রিস অভিমুখে যাত্রা করলেন। থার্মোপাইলি নামক জায়গায় গ্রিক এবং পারস্য বাহিনী মুখোমুখি হয়।

                                               

আলকজান্ডারের পারস্য অভিযান

এই যুদ্ধ ইতিহাসে ব্যাটল অভ থার্মোপাইলি নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে গ্রিক বীর লিওনিডাসের নেতৃত্বে স্বল্পসংখ্যক স্পার্টান যোদ্ধারা পারসিকদের নিকট পরাজিত হলেও তাদের বীরত্বের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সম্রাট জারজিসের গ্রিস অভিযানের পর থেকেই সাম্রাজ্য ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার পাশাপাশি ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাজকোষ খালি করতে থাকে। সময়ই উত্থান ঘটে দিগ্বিজয়ী গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের। সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসের সাথে তার কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অবশেষে ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের হাতে পতন ঘটে প্রতাপশালী এই সাম্রাজ্যের।

 

আলেকজান্ডারের হাতে পতনের পর পারস্য ২৫০ বছরের জন্য গ্রিকদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সময় এখানে উত্থান ঘটে সেলুসিড সাম্রাজ্যের। পারস্য সাম্রাজ্য না হলেও রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে এই সময়কাল পারস্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিধায়।


তথ্যের উৎস:
  • উইকিপিডিয়া এবং এনসাইক্লোপিডিয়া
  • রওর বাংলা মিডিয়া
  • বিভন্ন ওয়েবসাইট ও ব্লগ 
                                 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ