আরও পড়ুন : পারস্যে আকামেনিদ সাম্রাজ্যের ইতিহাস
আকামেনিদ
সাম্রাজ্য বিজয়ের অল্প কয়েক বছর পরই আলেকজান্ডার মাত্র ৩২ বছর বয়সে ব্যাবিলনে
মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কাউকেই তার সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত
করে যাননি। ফলে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর পরই সুবিশাল মেসিডোনীয় সাম্রাজ্যের
অধিপতি কে হবেন তা নিয়ে শুরু হল বাক-বিতণ্ডা এবং আলেকজান্ডারের জেনারেলরা লিপ্ত
হলেন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে।
আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরবর্তী কয়েকবছরে সংঘটিত বেশ কিছু যুদ্ধের পর সুবিশাল মেসিডোনীয় সাম্রাজ্য ক্যাসান্ডার, প্রথম টলেমী, লাইসিম্যাকাস এবং সেলিউকাস নিকেটর- এই চারজন জেনারেলের মাঝে ভাগ হয়ে যায়। ক্যাসান্ডার পেলেন গ্রিস, প্রথম টলেমী মিশর, লাইসিম্যাকাস থ্রেস এবং সেলিউকাস নিকেটর পেলেন পারস্য, মেসোপটেমিয়া এবং মধ্য এশিয়ার নিয়ন্ত্রণ। ৩০১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সংঘটিত ইপসাসের যুদ্ধে অ্যান্টিগোনাসকে পরাজিত করার মাধ্যমে সেলিউকাস আনাতোলিয়া তথা আধুনিক তুরস্ক এবং সিরিয়ার উত্তরাংশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন।
আলেকজান্ডারের এই পাঁচজন জেনারেলের মধ্যে সেলিউকাস নিকেটরকেই সবচেয়ে সফল বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। কেননা একমাত্র তিনিই আলেকজান্ডারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সফল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে একটি বহুজাতিক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যা ইতিহাসে সেলিউসিড সাম্রাজ্য নামে পরিচিত।
![]() |
| সেলিসিউড সাম্রাজ্য ম্যাপ |
সেলুসিডদের পথচলা কখনোই মসৃণ হয়নি। সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে পূর্বে এবং পশ্চিমে অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। সেলিউকাস যখন ক্ষমতায় আরোহণ করেন ততদিনে ভারতে রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ক্ষমতায় জাঁকিয়ে বসেছেন। ৩০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি সেলুসিড সাম্রাজ্যের বেশ কিছু অঞ্চল পুনর্দখল করে নেন যেগুলো আলেকজান্ডারের সময়ে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। দুই বছর যুদ্ধের পর সম্রাট সেলিউকাস এবং চন্দ্রগুপ্তের মাঝে একটি শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি অনুসারে সেলিউকাস ৫০০ রণহস্তীর বিনিময়ে দখল হওয়া অঞ্চলগুলো রাজা চন্দ্রগুপ্তের কাছে ছেড়ে দেন।
আরও পড়ুন: ইরান, দেশ পরিচিতি ও ইতিহাস
সেলিউকাসের মৃত্যুর পর তার ছেলে প্রথম অ্যান্টিওকাস সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। তিনি তার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সর্বদা পারসিক অভিজাতদের সাথে পারিবারিক বন্ধনের মাধমে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। তার শাসনামলে রাজ্যে শাসন ব্যবস্থা আরো দৃঢ় এবং সুসংহত হয়। তার শাসনামলে সাম্রাজ্য ভূমধ্যসাগরীয় সমুদ্রবন্দরগুলোর অধিকারকে কেন্দ্র করে মিশরের টলেমীদের সাথে দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী শত্রুতায় জড়িয়ে পড়ে যা প্রায় পরবর্তী ৭০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই সময়কালে দুই পক্ষের মধ্যে সাতটি যুদ্ধ সংগঠিত হয় যা ইতিহাসে সিরিয় যুদ্ধ নামে পরিচিত।
প্রথম অ্যান্টিওকাসের পুত্র দ্বিতীয়
অ্যান্টিওকাসের সময় অনেক এলাকা হাতছাড়া হয়ে যায়। এসময় সেলুসিডদেরকে এশিয়া মাইনরে
সেল্টিক আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়। এই সুযোগে ব্যাক্ট্রিয়া, পার্থিয়া, কাপাডোসিয়ার
মত প্রদেশগুলো নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে। তবে সম্রাট তৃতীয় অ্যান্টিওকাসের
সময়ে অবস্থার উন্নতি ঘটে। তিনি হারানো রাজ্যগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকেন। তিনি নিজে
সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে লেভান্ত থেকে ভারত পর্যন্ত ছয় বছরব্যাপী অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ২১০ থেকে ২০৪
খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এক অভিযান পরিচালনা করেন৷
এসময় তিনি ব্যাক্ট্রিয়া রাজ্য দমন,
পার্থিয়ার সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন এবং টলেমীদের নিকট হতে জুদাহ তথা বর্তমান
ইসরাইল এবং ফিলিস্তিন এবং সিরিয়া জয় করেন। তার শাসনামলে সেলুসিডদের পূনর্জাগরণ
ঘটার পাশাপাশি সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তার ঘটে। কিন্তু ততদিনে সাম্রাজ্যের পশ্চিমে রোম সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। গ্রিসের ছোট ছোট
নগর রাষ্ট্রগুলোয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ১৯৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে
রোম-সেলুসিড স্নায়ু যুদ্ধের সূচনা হয়।
আরও পড়ুন: মৌর্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস
২১৮ থেকে ২০১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সংঘটিত দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধে রোমানরা কার্থেজের বিপক্ষে জয় লাভ করলে সম্রাট তৃতীয় অ্যান্টিওকাস সন্দেহ করলেন যে তার সাম্রাজ্যের প্রভাব বলয়ে থাকা গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলো রোমের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তাই তিনি গ্রিস এবং এশিয়া মাইনরে ক্রমবর্ধমান রোমান প্রভাব ঠেকাতে হ্যানিবাল তথা কার্থেজের সেনাপতির পরামর্শে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন।
![]() |
| তৃতীয় এন্টউকাস |
১৯১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে
থার্মোপাইলির প্রান্তরে এবং ১৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ম্যাগনেসিয়ার প্রান্তরে তিনি
রোমানদের মুখোমুখি হন এবং দুইবারই যুদ্ধে পরাজিত হন। ফলে তিনি রোমানদের সাথে
একটি অপমানজনক চুক্তি সম্পাদন করতে বাধ্য হন।
আপামিয়ার চুক্তি নামে পরিচিত সম্পাদিত এই চুক্তি অনুযায়ী তৃতীয় অ্যান্টিওকাসকে
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণসহ সাম্রাজ্যের ইউরোপীয় অংশ এবং এশিয়া মাইনরের টরাস পর্বতমালা
থেকে পারগ্যামামের মধ্যবর্তী অংশ রোমানদের নিকট ছেড়ে দিতে হয়।
সম্রাট চতুর্থ অ্যান্টিওকাসের মৃত্যুর পর সেলিকিউড সাম্রাজ্য ক্রমেই অস্থিতিশীল হতে থাকে। ক্ষমতা নিয়ে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। ফলে সাম্রাজ্য ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে দ্রুতবেগে। ইহুদীরা বিদ্রোহ করে ১৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে স্বাধীন জুদাহ রাজ্য গঠন করে। পারস্যে পার্থিয়ানরা শক্তিশালী হতে থাকে এবং পারস্যের অধিকাংশ এলাকা দখল করে স্বাধীন পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করে। শেষদিকে সেলুসিড সাম্রাজ্য সিরিয়া এবং আনাতোলিয়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অবশেষে ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান জেনারেল পম্পে সেলুসিডদের পরাজিত করলে পতন ঘটে পরাক্রমশালী সেলুসিড সাম্রাজ্যের।
আরও পড়ুন: পারস্যে পার্থিয়ান শাসনের ইতিহাস



0 মন্তব্যসমূহ