সুলতান তুঘ্রিল বেগ কিভাবে ইসলামি খেলাফতকে রক্ষা করেছিলেন?

                                 

   পূর্বের অংশ পড়ুন :  সেলজুক তুর্কিদের উত্থান : সেলজুক বেগের অবদান।

মদীনা কেন্দ্রীক ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী একটি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন এবং ইসলামকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠা করে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের শেষ নবী মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ ইন্তেকাল করেন। মহানবীর স. মৃত্যুর পর ইসলমী রাষ্ট্র এবং মুসলিম জাতির প্রতিনিধি হিসেবে খলিফাদের আবির্ভাব হয়। মূলত খলিফাদের শাসনকালকে খেলাফত বলা হয়। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে হযরত আবু বকর রাঃ এর নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু করে, দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর রাঃ, দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওসমনা রাঃ এবং সর্বশেষ ৬১১ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রাঃ এর মৃত্যু পর‌্যন্ত এই চারজন খলিফার খেলাফতকালকে ইসলামের ইতিহাসে খুলাফায়ে রাশেদীন হিসেবে অভিহিত করা হয়।                                        

 ৭৩২ থেকে ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে পর‌্যন্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সময়কাল ছিল ইসলামের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। এরপর ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে হযরত মুয়াবিয়া রাঃ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে উমাইয়া রাজবংশ বা উমাইয়া খেলাফত। এ সময় ইসলামী সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বেশী বিস্তার লাভ করে। অতপর ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খেলাফতের পতনের পর আবুল আব্বাস আসসাফার হাত ধরে উত্থান হয় আব্বাসীয় খেলাফতের। এ খেলাফতকালে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তার তেমন না হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি দিক দিয়ে বিশ্বে মুসলিমরা শীর্ষ স্থান দখল করে।    

 

কিন্তু ৮০৯ খ্রিস্টাব্দে মহান আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের ইন্তেকালের পর থেকে আব্বাসীয় খেলাফত দুর্বল হতে থাকে। অবশেষে ৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে খলিফা মামুনের ওফাতের পর খলিফা মু’তাসিম বিল্লাহ সমরকন্দ, ফরগনা ও ‍তুর্কিস্তান থেকে হাজার হাজার যুবকদের সংগ্রহ করে খলিফা স্বয়ং নিজের তত্ত্বাবধানে বিশাল এক তুর্কি বাহিনী গঠন করেন। এই তুর্কি বাহিনী খলিফার ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও সমগ্র সাম্রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। খলিফা মু’তাসিম বিল্লাহর সময় থেকে প্রায় ১০০ বছর পর‌্যন্ত তারা খলিফার নামে সর্বময় ক্ষমতা ভোগ করত।

                                           

রাশেদুন খিলাফত

 এক পর‌্যায়ে তাদের ক্ষমতা এতটাই বৃদ্ধি পাই যে, খলিফাদের ক্ষমতা গ্রহণ ও পদচ্যুতি এই তুর্কি বাহিনীর মর্জির উপর নির্ভর করে। তারা ইচ্ছে করলেই যে কোন খলিফাকে পদচ্যুত করতে পারতো আবার চাইলে খলিফা পদে যে কাউকে নিযুক্ত করতে পারতো। অতঃপর তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি খর্ব করার জন্য ৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে খলিফা মুসতাকফি বিল্লাহ শিয়া বুয়াহিয়া নেতা আহমদ ইবনে আবু সুজা বুয়াইয়াকে বাগদাদে আমন্ত্রণ জানান।           

আরও পড়ুন: রুমের সেলজুক সালতানাতের ইতিহাস      

 

আহমদ বাগদাদ অভিযান পরিচালনা করে তুর্কিদের প্রভাব থেকে খলিফাকে মুক্ত করলেন। কিন্তু তুর্কি অক্টোপাস থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য বুয়াইয়াদের ডেকে এনে খলিফা মুসতাকফী বিল্লাহ খাল কেটে কুমির এনেছিলেন। কেননা ৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১০৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর‌্যন্ত আব্বাসীয় সুন্নি মুসলিম খেলাফত মূলত শিয়া পন্থী বুয়াইয়া আমির-উমরাদের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে। তারাও খলিফাদের পুনরায় ক্রিড়ানকে পরিণত করে সর্বময় ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং সুন্নি মুসলমানদের অধিকার খর্ব করতে থাকে। তারা সুন্নি আব্বাসীয় খেলাফতের চেয়ে মিশর  ও উত্তর আফ্রিকার শিয়া ফাতেমী খেলাফতকে বেশী মর‌্যাদা দিত।

 

এই প্রেক্ষাপটে বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাদের অনেকেই বুয়াহিদদের অক্টোপাস থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন কিন্তু পারেন নি। অবশেষে ১০৫৫ খ্রিস্টাব্দে দুর্বল ও ক্রিড়ানক আব্বাসীয় খলিফা আল কাইম বিল্লাহ বুয়াইয়া আমিরের প্রতাপ-প্রতিপত্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের খপ্পর থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য পথ খুজতে থাকে।

কিন্তু সে সময় এমন কোন মুসলিম শাসক কিংবা বীর ছিল না, যে খলিফাকে সাহায্য করতে পারে। তখন ভারতবর্ষ বিজয়ি মুসলিম বীর সুলতান মাহমুদ গজনবী মৃত্যু বরণ করেন এবং তার মৃত্যুর ফলে শক্তিশালী গজনী সাম্রাজ্য পতনের দিকে দাবিত হতে থাকে।

                                   

সুলতান মাহমুদ
স্পেনের মুসলিম সাম্রাজ্য ভেঙ্গে তছনছ হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়। অপরদিকে মিশর ও উত্তর আফ্রিকার শিয়া পন্থি ফাতেমীয় খলিফা মুসতানসির আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে গ্রাস করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এমন মুহূর্তে চিত্রপটে উত্থান ঘটে সেলজুক সালতানাতের, মুসলিম ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে আগমন ঘটে সাহসী তুর্কি বীর তুঘ্রীল বেগের। তিনি ইতিপূর্বে খোরাসান, ইস্পেহান,নশাপুর, মার্ভ, বলখ, খাওয়ারিজম, হামাদান, আর রায়ি ইত্যিাদি রাজ্য জয় করে শক্তি শালী সেলজুক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। অতপর তিনি খলিফা আল কাইম বিল্লাহ’র আমন্ত্রণে বাগদাদে অভিযান পরিচালনা করে শিয়া পন্থি বুয়াইয়া আমিরদের পদানত করে খলিফার গৌরব এবং সম্মান ফিরিয়ে দেন।

 

পৃথিবীর বুকে আবারও সুপ্রতিষ্ঠিত করেন মুসলিম খেলাফতকে। খলিফা আল কাইম বিল্লাহ তুঘ্রীল বেগকেও কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সুলতান উপাধিতে ভূষিত করেন।


পরবর্তী পর্ব পড়ুন : সুলতান তুঘ্রিল বেগ : সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সুলতান

             ভিডিও দেখুন:

                                      

তথ্যের উৎস:

  • আরব জাতীর ইতিহাস - ড. লৎফর রহমান                  
  • সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাস - ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লবি 
  • ইসলামের ইতিহাস - ড. মাহমুবুর রহমান
  • উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট

                                                 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ