পূর্বের অংশটি পড়ুন : সুলতান মালিক শাহ : সেলজুক সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান
সুলতান বারকিয়ারুক ছিলেন সেলজুক সাম্রাজ্যের পঞ্চম সুলতান এবং মালিক শাহ এর জেষ্ঠ পুত্র। তার রাজত্ব কাল ছিল ১০৯৪ থেকে ১১০৫ সাল পর্যন্ত। সুলতান মালিক-শাহের পুত্র এবং উত্তরসূরি মোহাম্মদ বারকিয়ারুক এমন একটি পর্যায়ে সেলজুক রাজত্বের দ্বায়িত্ব পালন করছিলেন যখন সেলজুক সাম্রাজ্য মুলতঃ এগিয়ে যাচ্ছিল ভাঙ্গনের দিকে। সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাসে তা ছিল খুবই দুর্বল।
সেলজুক সাম্রাজ্য ভিতর ও বাহির সব দিক থেকেই তখন আক্রান্তের শিকার ৷ এমন পরিস্থিতি যা তুর্কমান বসতি এবং বেইলিকগুলোকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল, যা শেষ পর্যন্ত কিরমান থেকে আনাতোলিয়া এবং সিরিয়া পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। বার্কিয়ারুক তার শাসনকালের প্রায় সবটা সময়ে ভিতর বাহিরের নানান ঝামেলার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়েছিল। বিশেষ করে সিংহাসন লাভ নিয়ে সেলজুক শাজাদাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। তার মধ্যে মালিক শাহ এর ভাই মালিক তেকিসও ছিলেন অন্যতম।
![]() |
| সুলতান মালিক শাহের মুদ্রা |
আরও পড়ুন: রুমের সেলজুক সালতানাতের ইতিহাস
বারকিয়ারুক ছিলেন সুলতান মালিকশাহ এর প্রথম পুত্র। ১০৯২ সালের নভেম্বর মাসে যখন তার পিতা মালিক শাহ মৃত্যুবরণ করেন তখন আমির ও প্রাসাদের অভিজাতরা তার এক পুত্রকে সুলতান হিসেবে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে। পরবর্তীতে তারা তাকে সিংহাসনে বসাতে সক্ষম হয়, সে ছিল মালিক শাহের তৃতীয় স্ত্রী তেরকেন খাতুনের চার বছরের শিশুপুত্র মাহমুদ।
সুলতান মালিক-শাহের স্ত্রী তেরকেন খাতুন সেলজুক উজির তাজ আল-মুলকের সহযোগিতায় তার চার বছরের ছেলে মাহমুদকে ইস্পাহানের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। তিনি আব্বাসীয় খলিফাকে মাহমুদের সুলতান হওয়াকে সমর্থন জানাতে রাজি করেছিলেন। তিনি আমির কিওয়াম আল-দাওলা কিরবুকার অধীনে একটি সেনা প্রেরণ করে ইসফাহান অবরোধ করেন এবং বার্কিয়ারুককে ধরে আনেন।
অপরদিকে
শিয়া বাতিনিদের হাতে নিহত হওয়া সেলজুক উজির আতাবেগ খাজা নিজামুল মুলকের পরিবার তথা নিজামিয়রা
বারকিয়ারুককে সমর্থন করেছিলেন। তারা বার্কিয়ারুককে ইসফাহান থেকে উদ্ধার করে
নিয়ে যান এবং সাভে ও আভেহে তাঁর আতাবেগ তথা অভিভাবক গুমুস্তিগিনের কাছে প্রেরণ
করেন, যিনি তাকে রায়ের শহরে ক্ষমতার মুকুট পড়িয়েছিলেন।
![]() |
| নিজামুল মুলক |
তাছাড়া নিজামিয়রা সন্দেহ করত নিজামুল মুলুকের হত্যাকান্ডের পেছনে আমির তাজুল
মূলকের হাত রয়েছে। ফলে ১০৯৩ সালে তাজ-উল-মুলক ও নিজামুল মুলকের সমর্থকদের মধ্যে
যুদ্ধ সংগঠিত হয়, যুদ্ধে মাহমুদের সমর্থকরা পরাজিত হয় এবং তাজ আল-মুলককে ধরে নিয়ে
যায়। প্রতিশোধের তৃষ্ণার্ত নিজামিয়ারা একই বছর ১২ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুদণ্ড
কার্যকর করেছিলেন।
তেরকেন খাতুন শিগগিরই সেলজুক শাহাজাদা ইসমাইল ইবনে ইয়াকুতিকে
বার্কিয়ারুয়াককে আক্রমণ করার জন্য ডেকে পাঠালেন। কিন্তু বার্কিয়ারুকের আতাবেগ
গুমুশতেকিন তুর্কমানের যোদ্ধাদের নিয়ে ইয়াকুতিকে পরাজিত করেন। তেরকেন খাতুন তখন
মালিক তেকিসের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন, তবে হঠাৎ তার সন্তান মাহমুদ ১০৯৪
সালের দিকে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং এক মাসের মধ্যেই মারা যায়। এভাবে তেরকেন খাতুনের
সমস্যা শেষ হয়।
কিন্তু এর পর বার্কিয়ারুককে তার চাচা তেকিসকেও মোকাবেলা করতে হয়েছিল, যিনি জাজিরা
এবং পশ্চিম ইরানে আক্রমণ করেছিলেন এবং রায় শহর দখল করেছিলেন। ১০৯৫ সালের ২৫
ফেব্রুয়ারি বার্কিয়ারুক তার বাহিনী নিয়ে শহর আক্রমণ করে এবং শহরের কাছে চাচা
তেকিস হত্যা করেন। বার্কিয়ারুয়াক এভাবে পশ্চিম ইরান ও ইরাকে তার কর্তৃত্বকে
একীভূত করতে সক্ষম হয় এবং খলিফা কর্তৃক সুলতান হিসাবেও স্বীকৃত হন।
এই বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি চলাকালীন সময়ে মালিক-শাহের ভাই আরঘুন আরসলান নিজের
স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এজন্য তিনি নিশাপুর ব্যাতিত খুরাসানের
বেশিরভাগ অংশ জয় করেছিলেন। বার্কিয়ারুক প্রথম খুরাসানকে জয় করার জন্য তাঁর
চাচা বায়বার্স ইবনে আল্প-আরসলানের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন, কিন্তু
তিনি পরাজিত হন।
এরপর বারকিয়ারুক তার সৎ ভাই আহমদ সেনজার এর অধীনে ১০৯৭ সালে দ্বিতীয় বারের মতো অর্ঘুন-আরসালানের বিরুদ্ধে খোরাসানে সেনা প্রেরণ করেছিলেন, কিন্তু সেনাদল খোরাসানে পৌছানোর আগেই আরঘুন আরসলান তার প্রজাদের সাথে নির্মম আচরণের কারণে তার নিজের এক গোলামের হাতে নিহত হন। অতপর বার্কিয়ারুক আহমেদ সেনজারকে খোরাসানের শাসক হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন।
এরপরে কিছু ধারাবাহিক অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে পিষ্ট হয়ে, বার্কিয়ারুক সিরিয়ায় ১০৯৭ সালে সংগঠিত ক্রুসেডের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি। এ সময় ক্রুসেডাররা সিরিয়ার এন্টিওক দখল করে । অন্যদিকে সৎ ভাই মুহাম্মাদ তপারের সাথে দ্বন্দ্বে বার্কিয়ারুক সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। ১০৮৯ সালে মুহাম্মদ তপার বিদ্রোহ করেছিলেন। আরানের গঞ্জা শহরে মুহম্মদের ঘাঁটি থেকে এই বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। শহরটি বার্কিয়ারুক তাকে ভূমি অনুদান হিসাবে দিয়েছিল।
![]() |
| সুলতান তপারের মুদ্রা |
প্রতিনিয়ত রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সেলজুক সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে যাচ্ছিল। একই সাথে বার্কিয়ারুকের কর্তৃত্ব দুর্বল হতে থাকে এবং ১১০৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর কোষাগার প্রায় খালি হয়ে যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে একটি শান্তি চুক্তি হয়েছিল, যা মুহাম্মদকে দক্ষিণ ইরাক, উত্তর ইরান, দিয়ার বকর, মোসুল এবং সিরিয়ার শাসক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়, বারকিয়ারুক ইসফাহান সহ ইরানের বাকি অংশের এবং বাগদাদের শাসক হিসাবে স্বীকৃত হয়েছিল।
১১০৫ খ্রিস্টাব্দে ২৫ বছর বয়সে বুরুজেরদ শহরের নিকটস্থ একটি স্থানে
যক্ষা রোগে তিনি মারা যান এবং তাঁর পরে তাঁর পুত্র দ্বিতীয় মালিক-শাহ দ্বিতীয় সিংহাসনে
বসেন। পরবর্তীকালে বাগদাদ থেকে মুহাম্মদ তপার অভিযান পরিচালনা করে এবং বারকিয়ারুকের
পুত্র দ্বিতীয় মালিক-শাহকে সিংহাসনচ্যুত করে সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান হন।
পরবর্তী পর্বটি পড়ুন : সুলতান মুহাম্মদ তপার : পতনের যুগের সেলজুক শাসক ।
ভিডিও দেখুন:
তথ্যের উৎস:
- আরব জাতীর ইতিহাস - ড. লৎফর রহমান
- সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাস - ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লবি
- ইসলামের ইতিহাস - ড. মাহমুবুর রহমান
- উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট




0 মন্তব্যসমূহ