২০০১ সালে ৯/১১- এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নর্দান অ্যালায়েন্সের সহযোগিতা নিয়ে আমেরিকা ও তার মিত্র ন্যাটো বাহিনী তালেবানকে পুরোপুরি হটিয়ে দেয় এবং আহমদ শাহ মাসুদের সমর্থক হামিদ কারজাই আফগানিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন। তিনি ২০১০ সালে দেশটিতে নতুন একটি নির্বাচন দেন এবং দেশকে নতুন একটি সংবিধান প্রদান করেন। মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ওই নির্বাচনে ৬০ লাখ আফগান ভোট দান করে। নির্বাচনে বিজয়ি হয়ে হামিদ কারজাই দেশটির প্রেসিডেন্ট হন।
২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হামদি
কারজাইকে পরাজিত করে আশরাফ গণি আফগানিস্তান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে
আমেরিকা ও তার মিত্র ন্যাটো বাহিনীর হামলার পর প্রথমে তালেবানরা মার্কিন সৈন্যদের দ্বারা নিশ্চিহ্ন হলেও ২০০৫ সাল থেকেই তালেবান নামক সংগঠনটি পুনরায় সংগঠিত হয়। সশস্ত্র গোষ্ঠীটি মার্কিন সেনা ও আফগান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এই যুদ্ধের বলি হতে হয়েছে অগণিত সাধারণ মানুষকে।
বরং তারা আগের থেকে শক্তিশালী রূপে আবির্ভূত হয়েছে।
সর্বোপরি তালেবানদের গুপ্ত হামলায় মার্কিন সেনাবাহিনীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তাছাড়া তাদের আর্থিক ক্ষতি চরমে ওঠে। অবশেষে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তালেবানদের সঙ্গে কাতারের সহযোগিতায় আলোচনা শুরু করে। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তালেবানের চুক্তি হয়েছিল যে পয়লা মে-র মধ্যে সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে, সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে নাইন-ইলেভেনের ২০ বছর পূর্তিকালে অর্থাৎ ২০২১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ন্যাটোভুক্ত সব সৈন্যকে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। এতকিছুর পরও আফগান যুদ্ধের ফলাফল হচ্ছে শূন্য। অর্থাৎ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানে ভয়াবহ আক্রমণ চালিয়ে আমেরিকা ও তার মিত্ররা যে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, ২০ বছরব্যাপী ব্যাপক প্রাণহানী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পরও সেই তালেবানদেরই ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে রেখে পরাজিত হয়ে লজ্জাজনকভাবে বিদায় নিতে হচ্ছে!
মূলত আগ্রাসনের পরিণতি এই-ই হয়। এর আগে সোভিয়েত ইউনিয়নেরও লজ্জাকর পরাজয় ঘটেছে আফগানিস্তানে। তারও আগে ব্রিটিশরা পরাভূত হয়েছে দেশটিতে। যে-ই আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালিয়েছে, সে-ই রক্ষা পায়নি চরম দুর্ধর্ষ আফগানদের হাত থেকে। যদিও ওয়ান-ইলেভেনের প্রতিশোধ নেওয়া যদি আমেরিকার প্রধান ইস্যু হতো তাহলে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার পর পরই তারা আফগানিস্তান ছাড়তে পারতো। কিন্তু তালেবানকে নিশ্চিহ্ন করার মিশনে তাদের সম্পূর্ণরুপে ব্যার্থ হয়েছে। মাঝখানে তারা আমেরিকার জনগণের ২ ট্রিলিয়ন ডলার বরবাদ করেছে এবং শতশত মার্কিন সৈন্যের প্রাণ বিসর্জন করতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানে সোভিয়ত রাশিয়ার আগ্রাসন
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালের এপ্রিলে এক ঘোষণায় ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহারের কথা জানান। পরে জুলাই সময়সীমা আরো কমিয়ে এনে ৩১ আগস্টের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন তিনি। চুক্তি অনুযায়ী এর মধ্যে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটার সৈন্যর অধিকাংশ চলে গেছে
কিন্তু মার্কিনিদের সাথে চুক্তি অনুসারে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সরকারের সাথে তালেবানের সমঝোতায় আসার কথা থাকলে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ। সমঝোতায় না পৌঁছানোর জেরে তালেবান আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরু করে। ৬ আগস্ট ২০২১ সালে প্রথম প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলীয় নিমরোজ প্রদেশের রাজধানী যারানজ দখল করে তারা। এরপর দেশটির অনেক প্রাদেশিক শহর বিজয় করতে থাকে তালেবান।
নিমনোজ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ১০ দিনের মাথায় অর্থাৎ ১৫ আগস্ট রোববার কাবুল বিজয় করে তালেবান যোদ্ধারা। কাবুল বিজয়ের পর আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ফলে সমগ্র আফগানিস্তানে তালেবানদের পুনরায় আধিপত্য প্রতিষ্টিত হয়। এর মাধ্যমে ২০০১ সালে পতন হওয়া তালেবানদের ২০ বছর পর আফগানিস্তানের মাটিতে পুনরুত্থান হয়।* আধুনিক মুসলিম বিশ্ব - তুরস্ক-ইরান-আফগানিস্তান
* মধ্যপ্রাচ্যে অতীত ও বর্তমান - ইয়াহিয়া আরমাজানী
ভিডিও দেখুন:




0 মন্তব্যসমূহ