বদরের যুদ্ধ : মুসলমানদের প্রথম সমর ও প্রথম বিজয় |

 

                             পূর্বের অংশ পড়ুন : মদিনা সনদ : পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান

বদরের যুদ্ধ মুসলমানদের প্রথম সমর ও প্রথম বিজয়। এটি এমন একটি যুদ্ধ ছিল, যে যুদ্ধে পরাজিত হলে ইসলাম ও মুসলিম জাতির অস্ত্বিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারতো! বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা ও মদীনা শরীফের মধ্যবর্তী অঞ্চল “বদর” নামক প্রান্তরে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ মোতাবেক ১৭ রমাজন দ্বিতীয় হিজরিতে মক্কার বিধর্মী এবং মুসলমানদের মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তা ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ নামে পরচিত। বিভিন্ন কারণে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বদরের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মদিনায় ইসলামের ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি।

৬২২ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের পর থেকে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে পরযন্ত মাত্র দুই বছরের মধ্যে হযরত মুহাম্মদ (স) কলহ ও দ্বন্দে লিপ্ত মদিনাবাসীদের একটি শান্তিপ্রিয় ও সুসংবদ্ধ জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হন। মদিনায় ধর্মভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা এবং দিনি দিন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মক্কার বিধর্মী কুরাইশরা ইর্ষান্বিত হয়ে উঠে। ফলে তারা মহানবী (স) এবং নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে।

তাছাড়া মদিনার মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এবং বিশ্বাসঘাতক ইহুদিরা সংঘবদ্ধ হয়ে মহানবী (স) তথা ইসলামের ধ্বংস সাধনের জন্য তীব্র ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা মদিনা সনদের শর্তাবলি লঙ্ঘন করে মক্কার বিধর্মীদের সাথে ষড়যন্ত্র ও গুপ্ত সংবাদ প্রেরণ করে। তারা বিধর্মী কুরাইশদের মদিনা আক্রমণের জন্যও প্ররোচিত করতে থাকে।

তখন মক্কার বিধর্মী কুরাইশদের অনুগত কিছু আরব গোত্র মদিনার সীমান্তবর্তী মুসলমানদের শস্য ক্ষেত্র জ্বালিয়ে দিত, ফলবান বৃক্ষ ধ্বংস করতো এবং উঠ, ছাগল লুটতরাজ করতো। মহানবী (স) তাদের লুটতরাজ বন্ধ করার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে জুহাজের নেত্রত্বে ১২ জনের একটি গোয়েন্দা দল প্রেরণ করেন। সেই সময় পবিত্র মাস হওয়ায় মহানবী (স) তাদেরকে বিধর্মীদের কোন কাফেলা আক্রমণ করতে নিষেধ করেন।

                                                 

কিন্তু আব্দুল্লাহ ভুলবশত নাখলা নামক স্থানে কাফেরদের কাফেলায় আক্রমণ  করলে সেখানে নাখলার খন্ড যুদ্ধ সংঘটিত জয়। এই যুদ্ধে মক্কার কাফেরদের বেশ কিছু নেতা নিহত হয়। এই নাখলার খন্ড যুদ্ধকে বদরের যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এদিকে ইসলামের চির শত্রু আবু সুফিয়ান অস্ত্র সংগ্রহের জন্য বাণিজ্যের অজুহাতে সিরিয়ায় গমন করেছিল।

কিন্তু ফেরার পথে আবু সুফিয়ানের কাফেলা মুসলমানদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল বলে গুজব উঠে। অতঃপর এই গুজুবের সত্যতা যাচাই না করে আক্রমণাত্মক নীতি অনুসরণ করে মক্কার কাফেরদের নেতা আবু জাহেল এক হাজার সৈন্য নিয়ে আবু সুফিয়ানের সাহায্যার্থে মদিনার অভিমুখে যুদ্ধের যাত্রা শুরু করে ।

কুরাইশদের যুদ্ধাভিযানের খবর শুনে মহনবী (স) খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন। এমতবস্থায় তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী তথা প্রত্যাদেশ লাভ করেন, মহান আল্লাহ বলেন “ আল্লাহর পথে তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে। তবে সীমা লঙ্গন করিও না, কারণ আল্লাহ সীমা লঙ্গনকারীদের পছ্নদ করেন না”[মহাগ্রন্থ আল কুরআন, সূরা বাকারাহ আয়াত ১৯০]। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের আদেশ পেয়ে এবং মদিনা রাষ্ট্রের যুদ্ধ সংক্রান্ত মন্ত্রণাসভার পরামর্শক্রমে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ তথা দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজানে ২৫৩ জন আনসার এবং ৬০ জন মোহাজেরিন নিয়ে গঠিত একটি মুসলিম বাহিনী মক্কার বিধর্মী কুরাইশ বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য প্রেরিত হয়।

অতঃপর মদিনা হতে ৮০ মাইল দূরে বদরের উপত্যকায় মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে বিধর্মী কুরাইশদের সংঘর্ষ হয়্। মহানবী (স) স্বয়ং যুদ্ধ পরিচালনা করে অনুপ্রেরণা দান করেন। তিনি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে নির্দেশ দেন তোমরা কেউ সারি ভেঙ্গে এগিয়ে যেওনা এবং আমার আদেশ না পাওয়া পরযন্ত যুদ্ধ করিও না। মহানবী এমন এক স্থান নির্বাচন করেন, যার পাশে পানির কূপ ছিল এবং যেখানে সৌরযদয়ের পর যুদ্ধ শুরু হলে মুসলিম সৈন্যের চোখে কিরণ পড়বে না। প্রথমে প্রাচীন আরবের রীতি অনুসারে মল্ল যুদ্ধ হয়।

মহানবী (স) এর নির্দেশে যথাক্রমে আমীর হামজা রাঃ, হযরত আলী রাঃ এবং আবু উবায়দা রাঃ কুরাইশ বিধর্মীদের পক্ষের নেতা উতবা, শায়বা এবং ওয়ালিদ বিন উতবার সঙ্গে মল্লযুদ্ধে অবর্তীর্ণ হন। এই যুদ্ধে শত্রু পক্ষের সবাই পরাজিত ও নিহত হয়। অপরদিকে উপায়ন্তর না দেখে আবু জাহেল কাফের বাহিনীসহ মুসলমানদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। তারা মুসলমানদের উপর প্রচন্ড আক্রমণ করতে থাকে।

                                                                   

কিন্তু প্রতিকূল অবস্থায়ও সংবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করা বিধর্মী কুরাইশদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। অসামান্য রণ-নৈপুন্য, অপূর্ব বিক্রম ও অপরিসীম নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে যুদ্ধ করে মুসলমানরা বিধর্মীদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে, ইসলামের বিজয় কেতন উড়ায় বদরের প্রান্তরে। এই যুদ্ধে ৭০ জন্য বিধর্মী কুরাইশ সৈন্য নিহত এবং অসংখ্য সৈন্য আহত ও বন্দি হয়।


                                              বদর কূপ ও বদরের প্রান্তর

মক্কার কাফেরদের নেতা আবু জাহেল ও যুদ্ধে নিহত হয়। অপরদিকে মাত্র ১৪ জন মুসলিম সৈন্য শাহাদাৎ বরণ করে। যুদ্ধ বন্দিদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন ও মধুর ব্যবহার করে মহানবী (স) মহানুভবতার পরিচয় দেন, যা ইতিহাসে বিরল। মুক্তিপন দিতে অক্ষম ব্যাক্তিদের মুসলমানদের শিক্ষা প্রদানের বিনিময় মুক্তি দেয়া হয়েছিল।

বদরের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে একটি যুগ-সন্ধিক্ষণকারী ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিশাল কুরাইশ বাহিনী স্বল্প সংখ্যক মুসলিম সৈন্যদের নিকট পরাজিত হলে বিধর্মীগণ নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে। অপরদিকে মুসলমানদের মনে অসামান্য সাহস, উদ্দীপনা ও আত্মপ্রত্যয়ের সঞ্চার হয়। বদরের যুদ্ধের পর দলে দলে মদিনাবাসী মহানবী (স) এর বাহিনীতে যোগদান করতে থাকে। এ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা ইসলামী সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের সূচনা করে এবং যা পরবর্তী একশত বছরের মধ্যে সুদূর আফ্রিকা থেকে ইউরোপ, ভারতবর্ষ থেকে চীন ও মধ্য এশিয়া পর‌্যন্ত বিস্তার লাভ করে।

বদরের যুদ্ধের এই মহাবিজয় ইসলামকে শুধু আরবেই নই বরং অনারব অঞ্চলেও সর্বজনীন করে তুলে। বিশেষ করে এ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে বিধর্মীরা বিনা দ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এই বিজয় অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের এবং অজ্ঞতার বিরুদ্ধে জ্ঞানের। যুদ্ধে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সূচিত হয়ে যায়। জন্য এই যুদ্ধকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী যুদ্ধ বলা হয়। আল-কুরআনে এই দিনকেইয়াওমুল ফুরক্বানবলা হয়েছে।

পরবর্তী অংশ পড়ুন : ওহুদের যুদ্ধ এবং মুসলমানদের শিক্ষা


তথ্যের উৎস সমূহ:

১. আরব জাতির ইতিহাস - শেখ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ।
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান 
৩. ইসলামের ইতিহাস  ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।

৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট  

                                           

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ