পূর্বের অংশ পড়ুন : বদরের যুদ্ধ : মুসলমানদের প্রথম সমর ও প্রথম বিজয়
৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ, মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী অঞ্চল বদরের প্রান্তরে মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম বীর যোদ্ধার কাছে পরাজিত হয় ১০০০ সৈন্যের মক্কার কাফের বাহিনী। এই যুদ্ধের পরাজয়ের ফলে তারা রাগে-ক্ষোভে, অপমানে ফেটে পড়ে। বদরের যুদ্ধের পরাজয়কে তারা কোন ভাবে মেনে নিতে পারেনি। তাই মক্কার কাফেররা পরের বছর আরও বড় এক বাহিনী সমবেত করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মদিনাকে এমনভাবে হেনস্ত করা, যাতে মুহাম্মদ (স) এর গড়ে উঠা ভাবমূর্তি ও সম্মান সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায় এবং এটা প্রমাণিত হয় যে, তিনি তার অনুসারীদের রক্ষা করতে অক্ষম।
তাছাড়া মক্কার কাফেরদের ষড়যন্ত্র ও প্রতিশোধ স্পৃহা, স্বার্থবাদী ইহুদি ও মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা, হাশেমি ও উমাইয়া বংশের শত্রুতা ইত্যাদি কারণেও ওহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।সর্বোপরি, ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (স) এর মদিনা হিজরত থেকে শুরু করে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে বদরের যুদ্ধের বিজয় পর্যন্ত সময়ে মদিনার মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি এবং মক্কার কুরাইশদের সামরিক বাহিনীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকে, কুরাইশরা নিজেদের উপর অপমান হিসেবে গ্রহণ করে এবং মুসলমানদের বিরোদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে।
অবশেষে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের
২১ মার্চ, মক্কার কাফের দলপতি আবু সুফিয়ান ৩০০০ সশস্ত্র
সৈন্য, ৩০০ উস্ট্রারোহী ও ২০০ অশ্বারোহী সহ মক্কা থেকে যুদ্ধাভিযান
করে মদিনা থেকে ৫ মাইল দূরে উহুদ উপত্যকায় উপস্থিত হয়। যাতে তারা স্থানীয় মদীনার কৃষক ও সাধারণ মানুষেদের হয়রানি করতে
পারে। মদিনা সনদ অনুযায়ি
মদিনা এবং তার অধিবাসীদের যে কোন নির্যাতন ও হয়রানি থেকে রক্ষা করা মহানবীর (স) দায়িত্ব ছিল।
মক্কার কাফেরদের সমরাভিযানের
সংবাদ পেয়ে তাই মহানবী (স)
১০০ জন বর্মধারী, ৫০ জন তীরন্দাজ সহ মোট ১০০০ জন
মুজাহিদ নিয়ে তাদের মোকাবেলা করার জন্য উহুদ উপত্যকার দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু যাত্রাপথে মুনাফেক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মিথ্যা
অজুহাতে ৩০০ জন সৈন্য নিয়ে পালিয়ে যায়। ফলে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭০০ যোদ্ধা নিয়ে মহানবী
(স) কে শত্রুদের বিরোদ্ধে যুদ্ধের অবতীর্ণ হতে
হয়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে
মহানবী (স) ৫০ জন তীরন্দাজ কে
আয়নায়ন পাহাড়ের সুড়ঙ্গ পথে অবস্থান করতে বলেন, যাতে কাফেররা পিছন
থেকে মুসলমানদের আক্রমণ করতে না পারে এবং আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত
তাদের স্থান ত্যাগ না করতে আদেশ দেন। অতঃপর আরবদের চিরচারিত নিয়ম অনুযায়ি মল্লযুদ্ধ হলে হযরত হামজা
রাঃ কুরাইশ বীর তালহাকে পরাজিত ও নিহত করেন। এরপর মুসলিম বাহিনী বীর বিক্রমে মক্কার কাফেরদের উপর ঝাপিয়ে
পড়ে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে কাফেরগণ ভয়ে রণভঙ্গ দিয়ে পালাতে শুরু করে।
কাফেরদের পালানো দেখে আয়নাইন
পাহাড়ে অবস্থানরত ৫০ জন তীরন্দাজের ৪৩ জন মহানবীর (স) আদেশ অমান্য করে গনীমতের মাল সংগ্রহ করার
জন্য অবস্থান ত্যাগ করলে মক্কার কুরাইশ বীর খালিদ বিন ওয়ালিদ ৩০০ জন অশ্বারোহী নিয়ে
পিছন থেকে মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করে। ফলে মুসলিম বাহনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। উহুদের যুদ্ধে হযরত হামজা রাঃ সহ ৭৩ জন সাহাবী শহীদ হন এবং অপরদিকে
মাত্র ২৩ জন কুরাইশ সৈন্য নিহত হয়।
হযরত আবু বকর, ওমর ও আলী রাঃ সহ ১১ জন প্রখ্যাত সাহাবি আহত
হন। এমনকি মহানবী (স) ও যুদ্ধের এক পর্যায়ে আহত হন। ইট ও পাথরের আঘাতে
মহানবীর (স) দুইটি দাত শহীদ হয়। উহুদের যুদ্ধের মুসলমানদের এরুপ করুণ পরিণতি দেখে মক্কার কাফেররা
ধরে নিয়েছিল তারা মুসলমানদের পরাজিত করতে এবং মহানবী (স) এর ভাবমূর্তি ক্ষুন্য
করতে পেরেছে। তাই তারা আনন্দের
সাথে যুদ্ধের ময়দান থেকে মক্কায় ফিরে যায়। ফলে এ যুদ্ধ অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়।
উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল আইনাইন পাহাড়ে অবস্থানরত তীরন্দাজদের মহানবীর (স) আদেশ অমান্য করে স্থান ত্যাগ। তাছাড়া কুরাইশ বীর খালেদ বীন ওয়ালিদের অসাধারণ সামরিক দক্ষতাও এই যুদ্ধে মুসলমানদের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। প্রসঙ্গত উহুদের যুদ্ধের মক্কার কুরাইশদের প্রধান সেনাপতি খালেদ বিন ওয়ালিদ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে অসংখ্য যুদ্ধে বিজয়ী হন এবং অনেকগুলো দেশ জয় করে ইসলামী খেলাফতের অধীনে নিয়ে আসেন।
ওহুদের পাহাড়সর্বোপরি, উহুদের যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। এই যুদ্ধ অমিমাংসিত করার মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুসলমানদের বিশেষ করে মহানবী (স) কে পরীক্ষা করেন। অপরদিকে মদিনা সনদের শর্তভঙ্গে করে বনু কাইনুকা ও বনু নাজির নামের ইহুদি গোত্রদ্বয় মুসলিমদের সাহায্যের পরিবর্তে মক্কার কাফেরদের সাহায্য ও মুসলমানদের বিরোদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। ফলে উহুদের যুদ্ধের পর মহানবী (স) মদিনা সনদের ধারা অনুযায়ী বিচারের মাধ্যমে উক্ত দুই ইহুদি গোত্রকে মদিনা থেকে নির্বাসিত করেন।
পরিশেষে উহুদের যুদ্ধ ছিল
মুসলমানদের জন্য চরম শিক্ষনীয়। এ যুদ্ধের বিপরর্যয় মুসলমানদের সুশৃঙ্খল সামরিক জাতিতে পরিণত
করে। অতি অল্পকালের মধ্যে
মুসলিম বাহিনী সম্মান ও ক্ষমতা পুনরুদ্ধানের লক্ষ্যে পরবর্তী যুদ্ধ গুলোর জন্য সুসংঘবদ্ধ
হয় এবং অসংখ্য যুদ্ধ বিজয়ী হয়ে মুসলমানরা তাদের সামরিক বাহিনীর শ্রেষ্টত্ব ধরে রাখতে
সক্ষম হয়।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : দ্বিতীয় বদরের যুদ্ধ এবং বীর মাওনার মর্মান্তিক ঘটনা।
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট


0 মন্তব্যসমূহ