সোভিয়েতরা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মুজাহিদীনদের মধ্যে অর্ন্তদ্বন্দ্ব শুরু হয়। তাদের বাড়াবাড়িও আর লোকে পছন্দ করছিল না। এরকম অবস্থায় ১৯৯৬ সালে বুরহান উদ্দীন রব্বানী সরকারকে পরাজিত করে তালেবান যখন প্রথম দৃশ্যপটে আসে, তখন আফগানিস্তানের মানুষ সাধারণভাবে তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। তালেবানের প্রথম দিকের জনপ্রিয়তার মূলে ছিল কয়েকটি বিষয়: তারা দুর্নীতি দমনে সাফল্যে দেখিয়েছিল, আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিল, তারা তাদের নিয়ন্ত্রিত রাস্তা দিয়ে এবং অঞ্চলে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ করে দিয়েছিল।
তবে
তালেবান একই সঙ্গে তাদের জারি করা কঠোর শরিয়া শাসনের অধীনে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড
কার্যকরের মতো শাস্তি চালু করে। অপরাধী কিংবা ব্যাভিচারীদের প্রকাশ্যে হত্যা করা
হতো, চুরির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের হাত কেটে নেয়া হতো। আর পুরুষদের দাড়ি রাখা
এবং মেয়েদের পুরো শরীর ঢাকা বোরকা পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। তালেবান টেলিভিশন,
সঙ্গীত এবং সিনেমা নিষিদ্ধ করে। দশ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার
দরকার নেই বলে নিয়ম জারি করে।
তালেবান
তালেবানের
বিরুদ্ধে তথাকথিত বহু ধরণের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের
অভিযোগ উঠে। তাদের সবচেয়ে ভয়াবহ কাণ্ড ছিল ২০০১ সালে আফগানিস্তানের মধ্যাঞ্চলে
বিখ্যাত বামিয়ান বুদ্ধের মূর্তি ধ্বংস করা। এর বিরুদ্ধে তখন আন্তর্জাতিকভাবে
নিন্দার ঝড় উঠেছিল। এ
জন্য দুই-তিনটি দেশ অর্থাৎ
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত ছাড়া অন্যকোন দেশ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দান থেকে বিরত থাকে। পরিস্থিতি এক পর্যায়ে এমন দাড়ালো যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ আফগানিস্তানে অবরোধ জারী করে।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার আক্রমণ
ফলে আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক সংকট দেখা
দেয়। তাছাড়া যুদ্ধাবস্থার কারণে আফগানিস্তান থেকে গ্যাস ও তেল রপ্তানিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হতে
থাকে । অতঃপর আর্থিক দিক থেকে সঙ্কট দেখা দিলে সৌদি ধনকুবের ওসামা বিন লাদেন ১৯৯৬ সালে
তালেবান সরকার প্রধান মোল্লা ওমরের সাথে সখ্যতা গড়ে তালেন এবং সুদান থেকে বিতাড়িত
হয়ে তিনি আফগানিস্তানে আশ্রয় নেন।
মোল্লা ওমর ওসামা বিন লাদেনকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আফগানিস্তানের সম্পর্ক তিক্ত হয়। কারণ ওসামাকে সুদানে মার্কিন দূতাবাসে হামলা পরিকল্পনার জন্য দায়ী করা হয়। এছাড়া আমেরিকান তেল কোম্পানি UNOCAL আফগানিস্তান থেকে গ্যাস ও তেল রপ্তানি করতে না পারায় পশ্চিমাদেশে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জালানী গ্যাসের সংকট দেখা দেয়।
মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানার কারণে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলার সুযোগ খুজতে থাকে। যেহেতু আফগানিস্তানের ৯০ ভাগ তালেবানদের কর্তৃতাধীনে ছিল সেহেতু তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তানে কোন সামরিক অভিযান প্রেরণে আমেরিকার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অবশেষে যুক্তরাষ্টের হাতে সে সুযোগ চলে আসে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার চারটি যাত্রীবাহী বিমান অপহৃত হয়। এর মধ্যে দুটি বিমান নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে তথা বিশ্ব-বাণিজ্য কেন্দ্রের দফতরে ও একটি বিমান পেন্টাগন ভবনে আঘাত হানে।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানে রাজতন্ত্রের পতনের ইতিহাস
আর চতুর্থ বিমানটি অভিযান চালানোর সময় ভূপতিত হয়। এ ঘটনায় ৬ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। আফগানিস্তানে সোভিয়ত রাশিয়ার বিরোদ্ধে যুদ্ধ করার সময় মার্কিন সাহায্য ও মদদে গঠিত হওয়া আল কায়দার উপর ওই হামলার দোষ চাপানো হয়। তখন আল কায়দার ঘাটি ছিল তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে। ফলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আল কায়দার যোদ্ধাদের আফগানিস্তান থেকে বের করে দিতে তালেবানদের নির্দেশ দেন কিন্তু তালেবানরা ওই নির্দেশ উপেক্ষা করেন।
এরপর আফগানিস্তানে মোতায়েন করা হয় ১ লাখ বিদেশী সেনা। কিন্তু সন্ত্রাস দমনের নামে আমেরিকার নেতৃত্বে বহুজাতিক বাহিনীর ওই অভিযান শুরু হওয়া এ যুদ্ধে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে প্রায় ২ লাখ.৪১ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ২,৪৪২ জন মার্কিন সেনা, , ৩,৯৩৬ জন মার্কিন ঠিকাদার এবং মিত্র জোটের ১,১৪৪ জন সেনা, ৬৬,০৬৯ জন আফগান সেনা ও পুলিশ, পাকিস্তানের সেনা ৯,৩১৪ জন। এছাড়া, ৭১ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক, যার মধ্যে ৪৭ হাজার আফগানিস্তানের ও ২৪ হাজার পাকিস্তানের। অন্যদিকে, আফগান তালেবান ৫১ হাজার এবং পাকিস্তানের তালেবান ও তালেবানপন্থি গেরিলা ৩৩ হাজার মারা গেছে। এ যুদ্ধের ফলে আফগানিস্তানে ব্যাপক প্রাণহানী ঘটেছে এবং দেশটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
* আধুনিক মুসলিম বিশ্ব - তুরস্ক-ইরান-আফগানিস্তান
* মধ্যপ্রাচ্যে অতীত ও বর্তমান - ইয়াহিয়া আরমাজানী
ভিডিও দেখুন:



0 মন্তব্যসমূহ