তালেবানের কারা ? আফগানিস্তানে কিভাবে তালেবানের উত্থান ও পতন হয় ?

                                                          

              পূর্বের অংশ পড়ুন : আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার আগ্রাসন

১৮৮৯ রুশ-আগ্রাসনের অবসানে মুজাহিদগণ একতাবদ্ধ হলেও রুশ বাহিনীর বিতাড়িত হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে তাদের মাঝে দ্বন্দ দেখা দেয়। ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত নজিবুল্লাহ রাশিয়ার ছত্রছায়ায় দু'বছর ক্ষমতায় থাকার পর পদচ্যুত হন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন বুরহানউদ্দীন রাব্বানী। নজিবুল্লাহর পতনের পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত রাব্বানী আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং 'নর্দান এ্যালায়েন্সের নেতৃত্ব দেন।                           

বুরহানউদ্দীন রব্বানী ছিলেন রাশিয়ার বিরোদ্ধে যুদ্ধ করা অন্যতম প্রধান আফগান সেনাপতি। তার দুজন বিশ্বস্ত কমান্ডার হলো আহম্মদ মাসুদ এবং ইসমাইল খান। নবগঠিত সরকারে বুররহান উদ্দীন রাব্বানী রাষ্ট্রপতি এবং মাসুদ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তিতে নজিবুল্লাহার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদুর রশিদ দোস্তম এই দলে যোগ দেন। তার যোগ দেওয়াতে এই দলটি পরে নদার্ন এ্যালায়েন্স' নামে পরিচিত হয়।


                                                     বুরহানউদ্দীন রব্বানী

রব্বানির ক্ষমতালাভের পর দেশটিতে আবারও নতুন করে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে পশতুন বাহিনীর নেতা গুলবদিন হিকমতিয়ার রব্বানী সরকারের বিরোদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অতঃপর হিকমতিয়ার পাকিস্তানের সমর্থন লাভ করেন। পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচুর অর্থ ও অস্ত্রশস্ত্র লাভ করেন তিনি। রাব্বানী সরকারের অধীনে প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ না করে তিনি দক্ষিণে কান্দাহারে ঘাঁটি স্থাপন করে রাব্বানী সরকারের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হন।

আরও পড়ুন: আফগানিস্তানে রাজতন্ত্রের পতন

রুশ বিরোধী জিহাদে হিকমতিয়ারেরও বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল এবং তিনি আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে কাবুলে অভিযান করেন। পক্ষান্তরে উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকারী রাব্বানী ও মাসুদের নর্দান এলায়েন্সের সাথে হিকমতিয়ারের ইসলামী এ্যালায়েন্স গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইসলামী এ্যালায়েন্স কান্দাহারসহ দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। বিশাল পশতুন জনগোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে হিকমতিয়ার উত্তরে অভিযান পরিচালনা করে কাবুল দখল করে। এক পর্যায়ে সাউদী আরব হিকমতিয়ারকে সাহায্য ও সমর্থন দান করে।           

হিকমতিয়ার ও রাব্বানী মাসুদের নেতৃত্ব পরিচালিত সংঘর্ষে কাবুলের রাস্তা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটির ইতিহাসে তালেবানদের উত্থান ঘটে। তালেবান নামের যে ধর্মীয় সংগঠন আফগানিস্তানের রাজনীতিতে আবির্ভূত হয় তার প্রতিষ্ঠাতা কান্দাহারের এক দরিদ্র ঘরের সন্তান মাদ্রাসার শিক্ষক মোল্লা ওমর। আফগানিস্তানে তালেবানদের অভ্যূত্থান ঘটে ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে রব্বানী সরকারকে পরাজিত করে কাবুল বিজয়ের মাধ্যমে।

পশতু ভাষায় তালেবান মানে হচ্ছে 'ছাত্র'। আফগানিস্তান থেকে যখন সোভিয়েত সৈন্যরা পিছু হটে, তখন ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে উত্তর পাকিস্তানে এই তালেবান আন্দোলনের জন্ম। এই আন্দোলনে মূলত পশতুন অর্থাৎ পশতুভাষীদের প্রাধান্য। ধারণা করা হয়, মাদ্রাসাগুলোতে প্রথমে এরা সংগঠিত হয়। এই মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হতো সৌদি অর্থে - এবং সেখানে খুবই কট্টর সুন্নী মতাদর্শের ইসলামই প্রচার করা হতো।

আরও পড়ুন: আফগানিস্তানের স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস

পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান - এই দুই দেশের সীমান্তের দু'দিকেই আছে বিস্তীর্ণ পশতুন অধ্যূষিত অঞ্চল। তালেবান এসব অঞ্চলে খুব দ্রুতই প্রভাবশালী হয়ে উঠে। তালেবান নেতা মোল্লা ওমর আফগানদের প্রতিশ্রুতি দেয়, ক্ষমতায় গেলে তারা শান্তি এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং কঠোর শরিয়া শাসন জারি করবে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম আফগানিস্তান থেকে তালেবান খুব দ্রুত তাদের প্রভাব সম্প্রসারিত করে।

সুসংগঠক তালেবান নেতা মোল্লা ওমর কালো পোশাকধারী ধর্মীয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যোদ্ধায় রূপান্তরিত করেন এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দ্বারা তাদের অপ্রতিরোধ্য করে গড়ে তুলেন। মোল্লা ওমর তালেবান দলের অগ্রদূত ছিলেন এবং এক পর্যায়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন লাভ করেন। তাছাড়া তিনি আরব ধনকুবের ও আল-কায়দার অবিসংবাদী নেতা ওসামা বিন লাদেনের সাহায্য ও সহযোগিতা পান।


                                                            মোল্লা ওমর

প্রথমে তালেবানরা হিকমতিয়ারের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে কান্দাহারে আধিপত্য বিস্তার করেন। এরপর মোল্লা ওমর দেশটির দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল দখল করে উত্তর দিকে তার বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন। কান্দাহার ও হেলমন্দ প্রভৃতি প্রদেশ দখল করার পর ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা ইরান সীমান্তবর্তী আফগান প্রদেশ হেরাত দখল করে নেয়। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৬ তিনি রাজধানী কাবুল বিজয় করে। কাবুলের পতনের ফলে রাব্বানী ও মাসুদ রাজধানী ত্যাগ করে উত্তরে আত্মগোপন করেন।       

এরপর তালেবানগণ ধীরে ধীরে সমগ্র আফগানিস্তানের ৯০% অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে ইসলামী শাসন কায়েম করেন। এবং মোল্লা ‍ওমরের নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানে সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের পর তালেবানকে স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।

পরবর্তী অংশ পড়ুন :  আফগানিস্তানে মার্কিন জোটের আগ্রাসন

তথসূত্র্রে : 

*মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ইতিহাস - মোঃ সালাহ উদ্দীন।

* মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস - কে. আলী।

* আধুনিক মুসলিম বিশ্ব - তুরস্ক-ইরান-আফগানিস্তান

* মধ্যপ্রাচ্যে অতীত ও বর্তমান - ইয়াহিয়া আরমাজানী 

                      ভিডিও দেখুন:

                             

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ