আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার আগ্রাসনের মর্মান্তিক ইতিহাস

                                                                 


                                           আরও পড়ুন : আফগানিস্তানে রাজতন্ত্রের পতন

১৯৭৩ সালের ১৬ই জুলায় রাজা জহির শাহের পতনের পর সর্দার দাউদের ক্ষমতালাভের পরপরই আফগানিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান লক্ষ ছিল দেশটির তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদ সমূহ আহরণ করা। ধারণা করা হয় যে, আফগানিস্তানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে রাশিয়ার অবদান থাকায় রাশিয়ার সমর্থনে দাউদ খান ক্ষমতায় আসেন। ফলে আফগানিস্তানে সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়ত রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু ধর্মীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ আফগানগণ সমাজতান্ত্রিক  ব্যবস্থা প্রবর্তন মেনে নেয়নি।

এ কারণে সোভিয়ত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো মুজাহিদ বাহিনী গঠন করতে থাকে। কিন্তু অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে মুজাহিদগণ সংঘবদ্ধ হতে পারেনি। সোভিয়েত সরকার আফগানিস্তানে আধিপত্য বিস্তারের জন্য দেশটিতে সমাজতন্ত্রের সমর্থক রাজনৈতিক দল গঠন করে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য খালক ও পিরচাম দল। পিরচাম দলের প্রধান ছিলেন নূর মোহাম্মদ তারাকি এবং খালক দলের কর্ণধার ছিলেন বারবাক কারমাল। ১৯৭৮ সালে পিরচাম দলের নেতৃত্বে এক সামরিক অ্যুত্থানে দাউদ ক্ষমতাচ্যুত হন।

                                             


নূর মোহাম্মদ তারাকি
এর ফলে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে নূর মোহাম্মদ তারাকির আবির্ভাব ঘটে এবং আফগানিস্তানে ক্রমশ রুশ প্রভাব বিস্তার লাভ করে। কিন্তু দলীয় কোন্দলের ফলে তারই সহকর্মী হাফিজউল্লাহ আমিন কর্তৃক তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। তারাকি সোভিয়েত ঘেঁষা হলেও হার্ভার্ডে শিক্ষাপ্রাপ্ত আমিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হন। কিন্তু ক্ষমতার লড়াই-এ অল্প দিনের মধ্যে তিনিও ক্ষমতাচ্যুত। নূর মোহম্মদ তারাকির সময় আফগানিস্তানের সাথে রাশিয়ার একটি মৈত্রী চুক্তি হয়েছিল।

এই চুক্তির অজুহাতে নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হাজার হাজার রুশ সৈন্য আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। এ সময় পারচাম দলের প্রতিপক্ষ খালক দলের অধিনায়ক বারবাক কামালকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাশিয়া একট পুতুল সরকার গঠন করে। বহুদিন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইরান ও আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে স্নায়ু যুদ্ধ চলছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইরান ছাড়া ইরাক থেকে ভিয়েতনাম পর্যন্ত বিস্তৃর্ণ এলাকায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বলয় গড়ে উঠে।

      আরও পড়ুন: ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের ইতিহাস                                  

ইরানে দ্বিতীয় রেজা শাহ পাহলভীর পতনের ফলে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তার পরম মিত্রকে হারায়। এ সময় মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ভারতবর্ষ তথা মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত প্রভাব হ্রাসের উদ্দেশ্যে তৎকালীন মার্কিস প্রেসিডেন্ট রেগ্যান পাকিস্তানকে আধুনিক সমরাস্ত্র দিকে সুসজ্জিত করার ঘোষণা দেন।

                                                                 আফগানিস্তানে রুশ সৈন্য

আফগানিস্তানে রুশ বাহিনীর অবস্থানে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং এতে প্রমাণিত হয় যে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন প্রভাব শূন্যের কোঠায় পৌছেছে। এ কারণে রেগ্যানের মার্কিন সরকার আফগান মুজাহিদদের সাহায্য-সহযোগিতা দানের চিন্তাভাবনা করতে থাকে। উল্লেখ্য যে, আফগানিস্তানে রুশ বাহিনী ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সন পর্যন্ত দীর্ঘ দশ বছর অবস্থান করে।

রুশ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতায় আসার পর সোভিয়েত পররাষ্ট্র নীতির পরিবর্তন দেখা যায়। ১৯৮৭ সনে বারবাক করমালাকে অপসারণ করে তার স্থলে বসানো হয় ক্রীড়ানক সৈয়দ মুহাম্মদ নজিবউল্লাহকে। আফগানিস্তান থেকে রুশ বাহিনীকে বিতাড়িত করার জন্য আফগান মুজাহিদগণ জেহাদ ঘোষণা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ সমস্ত মোজাহিদদের অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করে রুশদের আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত করার জন্য।

           আরও পড়ুন: আফগানিস্তানে মার্কিন জোটের আগ্রসন।                            

আফগান মুজাহিদদের সাথে সৌদি ধুনকুবের ওসামা বিন লাদেনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। CIA-এর হিসাব অনুযায়ী ১৯৮৫ সালে রাশিয়ার সৈন্য বাহিনীকে উৎখাত করার জন্য ওসামার সাথে ৫০০০ সৌদী, ৩০০০ ইয়ামেনী, ২০০০ আলজেরিয়া, ২০০০ মিশরীয়, ৪০০ তিউনিশিয়, ১৫০ ইরাকী, ২০০ লিবিয়া এবং অনেক জর্ডানী যোদ্ধা-মুজাহিদ ছিল। এদের অনেকেই CIA কর্তৃক  আয়োজিত যুদ্ধবিদ্যায় প্রশিক্ষণ লাভ করে। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত ওসামা আফগানিস্তানে ছিলেন এবং মুজাহিদের সাথে রুশ বাহিনীর বিরোদ্ধে যুদ্ধ করেন।

এ যুদ্ধে ১ লক্ষ ১০ হাজারেরও অধিক আধুনিক অস্ত্রে-সস্ত্রে সজ্জিত রুশ সৈন্যের বিরোদ্ধে যুদ্ধ করে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার আফগান মোজাহিদ এবং ৩০ হাজার উসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে থাকা অ-আফগান ও আরব মোজাহিদ। দীর্ঘ দশ বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অবশেষে সোভিয়েত বাহিনী ১৯৮৯ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে বহু ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে, আফগানদের হাতে পরাজিত হয়ে নির্লজ্জ্ব কাপুরুষের মত আফগানিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হয় সোভিয়েত রাশিয়া। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এ যুদ্ধে ১৩,৩১০ জন রুশ সৈন্য নিহত এবং ৫৩,৪০৮ জন গুরুতর আহত হয়। অরদিকে রুশ আফগান সংঘর্ষে ১০ বছরে আফগানিস্তানের ১৫ লক্ষ সামরিক ও বেসামরিক লোকের প্রাণহানি ঘটে।   

  আরও পড়ুন :  আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান

তথসূত্র্রে : 

*মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ইতিহাস - মোঃ সালাহ উদ্দীন।

* মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস - কে. আলী।

* আধুনিক মুসলিম বিশ্ব - তুরস্ক-ইরান-আফগানিস্তান

* মধ্যপ্রাচ্যে অতীত ও বর্তমান - ইয়াহিয়া আরমাজানী

          ভিডিও দেখুন:

                              

                               

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ