পূর্ববর্তী অংশ পড়ুন : আফগানিস্তানের স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস
১৯৩৩ সালে আততায়ীর হাতে নাদীর শাহ নিহত হলে তার ১৯ বছর বয়স্ক পুত্র জহির শাহ সিংহানারোহন করেন। কিন্তু রাজকার্জে অনভিজ্ঞতার জন্য তিনি তার চাচা প্রধানমন্ত্রী সর্দার হাশিম খানের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। মূলত প্রধানমন্ত্রী হাশিম ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হাশিম খান রাজ্যের বিচ্ছৃঙ্খলা দমনের পর একটি শক্তিশালী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জ্বিত সেনাবাহিনী গঠন করেন। তাছাড়া তিনি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। তিনি দেশে প্রথমবারের মত টেলিফোন ব্যবস্থা প্রচলন করেন।
বাদশাহ জহির শাহ হাশিম খানের পর ১৯৫৩ সালে আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন চাাচতো ভাই ও শ্যালক দাউদ খানকে। ১০ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করার পর প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংষ্কারকে কেন্দ্র করে দাউদের সাথে বাদশাহ জহির শাহের মতবিরোধ দেখা দিলে ১৯৬৩ সালে দাউদ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেতে ইস্তফা দেন।
বাদশাহ জহির শাহ
দাউদকে অপসারিত করে জহির শাহ জনপ্রিয়তা
অর্জনের জন্য দাউদ কর্তৃক সুপরিশকৃত সংস্কারসমূহ প্রবর্তন করতে থাকেন। ১৯৬৪ সালে
তিনি তথাকথিত “নতুন গণতন্ত্র নীতিমালা” জারী করেন। এই নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত ছিল:
সংবিধান, পরিষদ, নির্বাচন, সংবাদপত্র-এর স্বাধীনতা, এবং রাজনৈতিক দল গঠনের
স্বাধীনতা। বাদশাহ জহির শাহের উদারনীতির প্রতিফলনে আফগানিস্তানে প্রথম বারের মত
নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য “পিপলস ডেমাক্রেটিক
পাটি অব আফগানিস্তান" তথা (PDPA)।
১৯৬৫ সালের ১লা জানুয়ারি এই দল গঠিত হয় এবং
এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নূর মোহাম্ম্দ তারাকী, যিনি আফগানিস্তানের প্রথমে
কমিউনিষ্ট সরকারের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। PDPA-এর অপর প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন
হাফিজুল্লাহ আমীন। প্রসঙ্গত পরবর্তীতে আমীন তারাকীর স্থলাভিষিক্ত হন। তৃতীয়
বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন বারবাক কারমাল। তিনি কট্টরপন্থী কমিউনিষ্ট ছিলেন। এবং কথিত
আছে যে, তিনি সম্ভবত KGB নামক সোভিয়েত গুপ্ত পুলিশ সংস্থার সদস্য ছিলেন।
আরও পড়ুন: আফগান দুররানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস
১৯৬৭ সালে PDPA এ বিভক্ত হয়ে দুটি দলে পরিণত
হয়ে যায়। একটি মূল ‘খালক'-এর নেতা ছিলেন তারাকী এবং অপরটি পিরচাম -এর নেতৃত্ব
দেন বারবাক। আদর্শগত প্রভেদ না থাকলেও তারাকীর ‘খালক সোভিয়েত ঘেঁসা ছিল। অপরদিকে
খালক’ অপেক্ষা ‘পারচাম' জাতীয়তাবাদী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ ছিল। উপরন্তু, ‘খালক'-এর
সদস্য ছিল অধিকাংশ পুশতু ভাষাভাসী জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে পিরচাম পারস্য ঘেঁষা ছিল।
১৯৬৪ সালে প্রণিত সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদে
উল্লেখ আছে যে, রাজ পরিবারের কোন সদস্য উচ্চপদে সমাসীন হতে পারবেনা। পদচ্যুত দাউদ
খান এই অনুচ্ছেদটি জহির শাহের ব্যক্তিগণ আক্রোশ হিসেবে চিহ্নিত করেন। দাউদ দশ বছর
প্রশাসনিক সংগঠনে অসামান্য অবদান রাখেন। কিন্তু এই অনুচ্ছেদ অনুসারে তিনি রাজ
ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে তিনি বলপূর্বক ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন। দাউদ খান
নিজে একজন ল্যাপ্টেনেন্ট জেনারেল হওয়ায় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভালো সম্পর্ক
থাকায় তিনি সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের সমর্থন লাভ করেন।
সর্দার দাউদ খান
তাছাড়া দাউদ আফগানিস্তানের
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন। এদের মধ্যে ‘খালক',
'পরাচাম ও সামরিক বাহিনী অন্যতম। ১৯৭৩ সালের ১৬ই জুলাই রাজা জহির শাহ ইতালিতে সরকারি
সফরকালে তার চাাচতো ভাই ও শ্যালক সর্দার দাউদ খান রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে
ক্ষমতা দখল করেন।
দাউদ কাবুলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক
ঘাঁটিসহ দখল করে ঘোষণা করেন যে, “আফগানিস্তানকে একটি ইসলাম ধর্মের মূল আদর্শ
ভিত্তিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করা হবে। তিনি সমাজ থেকে সকল দুর্নীতি নির্মূল করার
প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধারে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং আফগান প্রজাতন্ত্রের
প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা লাভ করেন। এর ফলে দেশেটিতে রাজতন্ত্রের পতন হয়। বাদশাহ মোহাম্মদ
জহির শাহের পতনের মধ্যদিয়ে দোস্ত মোহাম্মদ
কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বারকাযি রাজবংশের পরিসমাপ্তি ঘটে।
আরও পড়ুন: ইঙ্গ আফগান যুদ্ধের ইতিহাস
তার উত্তরসূরী দাউদ খান বারকাযি রাজবংশ ও মোহাম্মদ
জাই গোত্রের হলেও তিনি রাজতন্ত্রের পরিবর্তে আফগানিস্তানে একটি প্রজাতন্ত্র কায়েম
করেন, যদিও তার শাসনকাল রুশ প্রভাবান্বিত কমিউনিষ্টদের ষড়যন্ত্র এবং সোভিয়েত
রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে বেশি দিন স্থায়ি হয়নি। ১৯৭৭ সালে প্রজাতান্ত্রিক
সংবিধান ঘোষণার মাধ্যমে দাউদ প্রেসিডেন্ট হিসাবে বৈধ ক্ষমতাবান পুরুষ হিসাবে
আবির্ভূত হন। কিন্তু ১৯৭৮ সালের অভ্যুত্থানের সহযোগী সামরিক অফিসারদের সাথে তার
মতান্তর শুরু হয়।
এসব সামরিক অফিসাররা আরও অধিক সোভিয়েত ঘেঁষা
নীতি প্রবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন। অন্যদিকে দাউদ চান সবার নিকট থেকে সমদূরত্বে
অবস্থান করা। এর প্রেক্ষিতে দাউদ খান এবং তার সহযোগিদের মাঝে ঐক্যের ফাটল দেখা
দেয়। অতঃপর তার ক্ষমতায় আরোহণের ৫ বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের ২৭শে এপ্রিল
আফগানিস্তানে এক সশস্ত্র সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নাদির শাহের সর্বশেষ বংশধর
প্রেসিডেন্ট দাউদের পতন ঘটে। অতঃপর সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতায় বসেন
সোভিয়েত রাশিয়ার একান্ত অনুগত ও খালাক পার্টির প্রধান নূর মোহাম্মদ তারাকী।
নতুন ক্ষমতাবদ্ধ বিপ্লবী কাউন্সিল ক্ষমায় বসার
পর নিজেদেরকে নিরপেক্ষ বলে ঘোষণা করে। তারা বিশ্বের সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ
সম্পর্ক বজায় রাখবে বলে মতব্যক্ত করে। তাছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ইসলাম,
গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দেশের অগ্রগতি মৌলনীতি হবে বলে ঘোষণা করে।
* আধুনিক মুসলিম বিশ্ব - তুরস্ক-ইরান-আফগানিস্তান
* মধ্যপ্রাচ্যে অতীত ও বর্তমান - ইয়াহিয়া আরমাজানী
আরও পড়ুন:



0 মন্তব্যসমূহ