১৯০১ সালে আমির আব্দুর রহমান মৃত্যুবরণ করলে, তার পুত্র হাবিবুল্লাহ খান আমীর হন। কিন্তু আমির হাবিবুল্লাহ ১৯১৯ সনে আততায়ীর হাতে নিহত হলে, তার তৃতীয় পুত্র আমানুল্লাহ খান আমীরের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯১৯ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে, ভার্সাই চুক্তি সম্পাদিত হয়, তখন আমির আমানুল্লাহ আফগানিস্তানের সিংহাসনে আরোহণ করেন।
স্বাধীনচেতা ও জাতীয়তাবাদী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ আমানুল্লাহ, ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তার পূর্বপুরুষ দোস্ত মুহাম্মদ অথবা পিতামহ আব্দুর রহামনের মত, নতজানু পররাষ্ট্র নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি আফগানিস্তানকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত করতে প্রচেষ্টা চালান। সিংহাসনে আরোহণের পরেই, আমানুল্লাহ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভারতের নাজুক অবস্থার কথা বিবেচনা করে, ব্রিটিশদের থেকে পেশওয়ার পুনঃদখলের জন্য, গোলাম হায়দার নামের একজন আফগান সেনাপতিকে প্রেরণ করেন ।
ব্রিটিশ বিরোধী ভারতীয় বিপ্লবী কমিটির সাহায্যে গোলাম হায়দার, ৭০০০ সেনাসহ ব্রিটিশদের সেনানিবাস ও বেসামরিক নিবাস ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এ ধরনের বিদ্রোহের সংবাদ পূর্বে লাভ করে, পেশওয়ারের ব্রিটিশ কমিশনার কেপেল শহরের ফটক বন্ধ করে দেন। ফলে বিদ্রোহ কার্যকরী না হওয়ায় দোস্ত মুহম্মদ এবং আবদুর রহমানের মত আমীর আমানুল্লাহও পেশওয়ার পুনর্দখলে সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। আফগান বাহিনী লাত্তি কোটালেও আক্রমণ পরিচালনা করে ব্যর্থ হয়।
আরও পড়ুন: মুসলমানদের আফগানিস্তান বিজয়ের ইতিহাস
ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ছিল, আফগানিস্তানকে একটি মধ্যবর্তী রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং চার বছর ব্যাপী আফগান-ব্রিটিশ যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে শাস্তি প্রতিষ্ঠা করা। ব্রিটিশ ও আফগানদের মধ্যে তিনটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ ৬ মে ১৯১৯ সালে আমানুল্লাহ কর্তৃক সূচনা হয়। এ যুদ্ধে আমানুল্লাহ ব্রিটিশদের থেকে, খাইবার গিরিপথে অবস্থিত বাগ শহর দখল করতে পারলেও পেশওয়ার দখলে নিতে ব্যার্থ হয়।
তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ
তবু এ যুদ্ধের গুরুত্ব ছিল সুদূরপ্রসারী। আমানুল্লাহর প্রধান উদ্দেশ্যে ছিল আফগানিস্তানকে ব্রিটিশ প্রভাব থেকে মুক্ত করে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিনত করা। এবং পরিশেষে তিনি এ যুদ্ধের মাধ্যমে তার উদ্দেশ্যে পূরণে সফল হন। আফগানদের বিদ্রোহ ও যুদ্ধ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, অনিচ্ছাসত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার আফগান নেতা আমীর আমানুল্লাহকে, আফগানিস্তানের স্বাধীন শাসক হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে, ১৯১৯ সালে সম্পাদিত রাওয়ালপিন্ডি চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তিতে ব্রিটিশ সরকার রাওয়ালপিন্ডিতে আগত আফগান প্রতিনিধিদলকে জানিয়ে দেয় যে, আফগানিস্তান ব্রিটিশ সরকারের উপর পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে মুখাপেক্ষী হবে না; বরং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ব্যাপারে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং স্বাধীনভাবে কার্যবিধি নিরূপণ করবে। মূলত ১৯১৯ সালে তৃতীয় ব্রিটিশ-আফগান যুদ্ধশেষে, আফগানিস্তান যুক্তরাজ্য থেকে থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে।
প্রকৃতপক্ষে আমীর আমানুল্লাহ স্বাধীন আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা এবং সংস্কারক। তিনিই প্রথম আফগানিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করেন ১৯২৩ সালে। আফগানিস্তানের স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে আমীর আমানুল্লাহ রাজা আমিনুল্লাহ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
আমানুল্লাহর অসামান্য কৃতিত্ব ছিল, ১৯১৯ এবং ১৯২১ সালের চুক্তি মোতাবেক,আফগানিস্তানকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণতা করা। তিনি স্বাধীনচেতা ও পিছিয়ে পড়া আফগান জাতীকে শিক্ষিত ও সুসমৃদ্ধ জাতীতে পরিণত করতে এবং অনুন্নত আফগানিস্তানকে প্রগতিশীল ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে স্বপ্ন দেখতেন। তার স্বপন্ বাস্তবায়নের জন্য কিছু বেশ কিছু পদেক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলো-
আরও পড়ুন: আফগান দুররানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস
মহিলাদের পাতলা বোরখা ও পুরুষদের ইউরোপিয় ধাচের পোশাক পরিধানে বাধ্য করা, মহিলা শিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ রদ, রাষ্ট্র থেকে ধর্মীয় সংস্থাগুলো পৃথকীকরণ, জুরপূর্বক সৈন্য দলে ভর্তী করানো, দেশের প্রকৃতিক সম্পদ ব্যাবহার করে রাষ্ট্রের উন্নয়ন, আফগানিস্তানকে ইউরোপের মত জাকজমকপূর্ণ দেশে পরিণত করতে চেষ্টা, সর্বোপরি অর্থের অপচয় ইত্যাদি কারণে তার বিরোদ্ধে দেশটির সাধারণ মানুষ ও ধর্মীয় নেতারা ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে।
অতঃপর ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাষে সমগ্র আফগানিস্তানে বিদ্রোহের দামান ছড়িয়ে পড়ে। এ বিদ্রোহের নেতৃত্ব ছিল ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, রক্ষণশীল আফগান জাতী এবং বাচ্চা-ই-সাকা নামক এক ভিস্তির ছেলে। অবশেষে ১৯২৮ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে সংস্বার প্রবর্তন করতে গিয়ে, আফগানিস্তানের স্বাধীনতার নায়ক আমানুল্লাহ সিংহাসনচ্যুত হন। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ মুসলিম বিশ্বে তিনজন ক্ষণজন্মা নেতার আবির্ভাব হয়, ইরানের রেজা শাহ পাহলভী, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক এবং আফগানিস্তানে আমানুল্লাহ।
রাজা আমানুল্লাহএই তিন নেতাই ইউরোপীয় আচার-রীতি ও ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হযে ,দেশের আধুনিকীকরনের চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে কামাল আতাতুর্ক সফল হলেও রেজা শাহ পাহলভি এব আমানুল্লাহ ব্যার্থ হন। যাই হোক, আমানুল্লাহ আফগানিস্তানকে একটি প্রগতিশীর ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে ব্যারথ হলেও, দেশটির স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে অসমান্য অবদান রাখার জন্য চিরস্বরণীয় হয়ে থাকবে।
* আধুনিক মুসলিম বিশ্ব - তুরস্ক-ইরান-আফগানিস্তান
* মধ্যপ্রাচ্যে অতীত ও বর্তমান - ইয়াহিয়া আরমাজানী
ভিডিও দেখুন:



0 মন্তব্যসমূহ