আরও পড়ুন : আফগানিস্তানে দুররানী সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন
আহমেদ শাহ দূররানী বিবদমান আফগান গোত্র গুলোকে, একত্রীভূত করতে পারলেও তার প্রতিষ্ঠিত দূররাণী বংশের পতনের পর, আফগানিস্তান চারভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, সামন্ত গোত্রপতিদের নেতৃত্বে। এই চারটি প্রদেশ হচ্ছে কাবুল, কান্দাহার, হিরাত ও পেশওয়ার। পাঞ্জাব শিখনেতা রঞ্জিত সিংহ, পেশওয়ার দখল করলে আফগানিস্তান চিরতরে এই প্রদেশ হারায়। এই সব গোত্রপতিরা একজন অন্যজনের বিরোদ্ধে যুদ্ধ-বিবেদে লিপ্ত ছিল। আফগানিস্তানের অরাজকতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি চলতে থাকলে, আমীর দোস্ত মোহাম্মদ নামে এক সামন্ত আফগান নেতার আবির্ভাব হয়।
তিনি সামন্তবাদী গোত্রদের একত্রীত করে, আফগানিস্তানে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।তিনি নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সেনাবাহিনীকে সুসজ্জিত করেন। দোস্ত মোহাম্মদ শান্তিতে শাসন করতে পারেননি। কারণ তাকে রঞ্জিত সিংহ ও ভারতবর্ষের ব্রিটিশ শাসকদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকতে হয়। তিনি শিখাদের থেকে পেশোয়ার পুনর্দখল করার জন্য, জিহাদ ঘোষণা করেন কিন্তু যুদ্ধে শিখদের পরাজিত করলেও, ব্রিটিশদের কারণে পেশোয়ার পুনর্দখল করতে ব্যার্থ হন।
উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আফগানিস্তানের বারাকাজির রাজবংশের শাসক, পীর মোহম্মাদ আলীর প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থিত , দুইটি ভিন্ন ভিন্ন রাজশক্তি। একটি পান্জাবের শিখ সাম্রাজ্য এবং অন্যটি ভারতবর্ষের শাসক ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি। তাছাড়া এ সময় এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে, তৎকালীন পৃথিবীর বৃহৎ দুইটি সাম্রাজ্য রুশ ও ব্রিটিশ সাম্রজ্যের মধ্যে, চলছিল তুমুল প্রতিযোগিতা। যা ইতিহাসে গ্রেট গেইম নামে পরিচিত।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানে রাজতন্ত্রের পতন
এই গ্রেট গেইমের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয় প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ। যা ১৮৩৯ সাল থেকে ১৮৪২ সালের মধ্যে, আফগানিস্তান ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনির মধ্যে সংঘটিত হয়। প্রথম আফগান যুদ্ধের প্রথম দিকে, দুস্ত মুহাম্মদ ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হলে, ব্রিটিশরা তাদের অনুগত দুররানী রাজবংশের শাহ সুজাকে, আফগানিস্তানের আমীর হিসেবে নিযুক্ত করে। কিন্তু ১৮৪৩ সালে দুস্ত মুহাম্মদ শাহ সুজাকে পরাজিত করে, আবারও আফগানিস্তানের কাবুলের ক্ষমতায় পুনরায় আসীন হন।
প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ
১৮৬৩ সালে দুস্ত মুহাম্মদে মৃত্যুর পর, তার পুত্রদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে, রাজনৈতিক অরাজকতা শুরু হয়। এ সুযোগে আফগানিস্তানে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। দুস্ত মোহাম্মদের মৃত্যুর পর, তার তৃতীয় পুত্র শের আলী ১৮৬৩ সালে, আফগানিস্তানের আমীর নির্বাচিত হন। দোস্ত মোহাম্মদ শের আলীর তেজস্বী ও বিচক্ষণতার জন্য, তাকে উত্তরাধিকারী মনোনিত করে। কিন্তু তার দুই জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতা মুহাম্মদ আফজল খান এবং মুহাম্মদ আযিম খান, ১৮৬৬ সালে তার বিরোদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে ক্ষমাতচ্যুত করে।
এরপর ১৮৬৬ থেকে ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত তার ভাই মুহাম্মদ আফজল এবং ১৮৬৭-১৮৬৯ সাল পর্যন্ত তার অপর ভাই মুহাম্মদ আযিম, কাবুলের আমীর হিসেবে শাসনক্ষমতায় ছিলেন। এরপর ১৮৬৯ সালে শের আলী পুনরায় কাবুল দখল করে। তার শাসনামলে অর্থাৎ ১৮৭৮ সালে আফগানিস্তান ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে দ্বিতীয় ইঙ্গ আফগান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৮৭৮ সাল থেকে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত সংঘটিত হওয়া এই যুদ্ধে ব্রিটিশরা বিজয় লাভ করে এবং আফগানিস্তানের অধিকাংশ শহর দখল করে নেয়। আরও পড়ুন: মুসলমানদের আফগানিস্তান বিজয়ের ইতিহাস
প্রসঙ্গত যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অর্থাৎ ১৮৭৯ সালে, অসুস্থ ও বৃদ্ধ শের আলী খান যুদ্ধ পরিস্থিতির চরম সঙ্কটজনক দেখে, তার পুত্র ইয়াকুব খানের উপর কাবুলের শাসনভার অর্পণ করে, কাবুল ত্যাগ করে মাজার-ই-শরীফে চলে যান। ১৮৭৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শের আলী খান, মাজার-ই-শরিফে মৃত্যু বরণ করেন। যাই হোক যুদ্ধে পরাজিত আফগানদের সাথে ব্রিটিশরা চুক্তি করে, এর ফলে কাবুল ও কান্দাহার সহ আফগানিস্তানের বিরাট অংশ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ বাহিনীর জয়লাভের পর, আমীর ইয়াকুবকে পরিবারবর্গ সহ কলকতায় নির্বাসিত করা হয়।
দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ
মূলত ইয়াকুব খানের ভাগ্য বিপর্যয়ের ফলে, আফগানিস্তান ব্রিটিশদের উত্থান হয়। অপরদিকে কাবুল বিদেশীদের হস্তগত হওয়ায়, আফগানবাসী মোটেই সন্তুষ্ট ছিলনা। দুঃসাহসি ও স্বাধীনচেতা আফগানদের মধ্যে, অসন্তোষের দাবানল জ্বলতে থাকে। আফগানগণ ব্রিটিশ জনোরেল রবার্টের বাহিনীকে আক্রমণ করে এবং অল্পের জন্য রবার্টস প্রাণে বেঁচে যায়। যাই হোক, ব্রিটিশরা আফগানিস্তানকে একটি মধ্যবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করার জন্য, তাদের অনুকূলে দোস্ত মুহাম্মদের পৌত্র ও আফজালের পুত্র আব্দুল রহমানকে, শর্তসাপেক্ষে আফগানিস্তানের আমীর হিসেবে ১৮৮০ সালে কাবুলের সিংহাসনে বসায়।
আফগানিস্তানের ইতিহাসে আমির আব্দুর রহামনের ক্ষমতা লাভ ছিল, এক যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি সামরিক বিদ্যায় পারদর্শী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক ছিলেন। ঐতিহাসিদের মতে, তিনি সকল বারখজাই শাসকদের মধ্যে, সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং প্রভাশালী ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে সন্তুষ্ট করে, আফগানিস্তানের স্বার্থ রক্ষার নীতি অবলম্বন করতেন। ১৮৮০ সালের জুলাই মাসে তিনি আমীর নির্বাচিত হওয়ার ১২ দিনের মধ্যে কাবুল থেকে এবং ১৯৮১ সালে কান্দাহার থেকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার করা হয়।
আমির আব্দুর রহমান
তার শাসনকালে আধুনিক আফগানিস্তানের সীমান নির্ধারিত হয়। আধুনিক আফগানিস্তানের সীমান্ত নির্ধারণ করার জন্য ১৮৯৩ সালে আফগানিস্তান ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে যে সীমান্ত রেখা নির্ধারিত হয়, তা সাধারণত ডুরাল্ড লাইন নামে পরিচিত। তিনি ইউরোপিয় প্রকৌশলী নিযুক্ত করে বিভিন্ন কলকারখানা ও সড়ক নির্মাণ এবং জলসেচের ব্যবাস্থা করেন। আধূনিক আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা আমীর আব্দুর রহমান অবশেষে ১৯০১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
* আধুনিক মুসলিম বিশ্ব - তুরস্ক-ইরান-আফগানিস্তান
* মধ্যপ্রাচ্যে অতীত ও বর্তমান - ইয়াহিয়া আরমাজানী
ভিডিও দেখুন:




0 মন্তব্যসমূহ