আরও পড়ুন: মুসলমানদের আফগানিস্তান বিজয় || আফগানিস্তানে মুসলিম শাসনের ইতিহাস
হুতাক রাজবংশ: ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে শাহ ইসমাইল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, পারস্যের শিয়া ধর্ম মতালম্বী সাফাভীয় বংশ, সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে দুর্বল হতে থাকে। ১৬৯৪ থেকে ১৭২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, সাফাভি বংশের শাসক ছিলেন শাহ সুলতান হোসাইন। তার শাসনাধীন আফগানিস্তানের কান্দাহার অঞ্চল বিজয় করে, মিরওয়াইস হুতাক দেশটিতে হুতাক রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। ধারণা করা হয়, এটি পশতুন বা আফগান জাতীর প্রথম স্বধীন রাজ্য। এই রাজবংশের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন মাহমুদ হুতাক। প্রসঙ্গত শাহ হোসাইনের মৃত্যুর পর সাফাভী বংশের, রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভাব হয় ইরানের নেপোলীয়ন খ্যাত সম্রাট নাদির শাহের।
১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে নাদির শাহের নেতৃত্বে পারসিক বাহিনী, আফগানিস্তানের হুতাক রাজবংশের শাসক, শাহ আফসারর হুতাককে পরাজিত করে, তিনি খোরাসান অঞ্চল দখল করেন এবং ভারতবর্ষে এসে দিল্লীতে অবস্থান করেন। কিন্তু তিনি বেশিদিন দিল্লীতে ছিলেন না। লুটতরাজ করে তিনি পারস্যে ফিরে যান। অতঃপর ১৭৩৮ খ্রিস্টাব্দে, পসতুন নেতা আহমেদ শাহ দুররানীর হাতে, হুতাক রাজবংশের শেষ শাসক শাহ হুসাইন হুতাকের, পরাজিত হওয়ার মাধ্যমে এই রাজবংশের পতন ঘটে।
নাদির শাহ
দূরবানী সাম্রাজ্য: আহমেদ শাহ দূররানী ছিলেন নাদির শাহের সুযোগ্য সেনাপতি । ১৭৪৭ সালে নাদির নাদির শাহের নিহত হবার পর তিনি নিজেকে কান্দাহারের বাদশাহ বলে ঘোষণা করেন। তার বাদশাহ হওয়ার মধ্যে দিয়ে দূররানী সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। তিনি সর্বপ্রথম সমগ্র পশতুন জাতিকে একত্রিত করেন। তিনি আফগানিস্তানের কান্দাহার, কাবুল ছাড়াও সমগ্র উত্তর ভারতের পাঞ্জাব, কাশ্মীর ও দিল্লী দখল করেন।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানের প্রাচীন ইতিহাস ও ইসলামের আগমন
কিন্তু তিনি বেশিদিন ভারতবর্ষে অবস্থান করেননি। আহমদ শাহ দূররানী ১৭৬৩ সালে পনিপথের তৃতীয় যুদ্ধে ভারতের শক্তিশালী হিন্দুশক্তি মারাটা সম্রাজ্যেকেও পরাজিত করেন। এভাবে তিনি স্বাধীন আফগানিস্তানের প্রথম বাদশাহ হিসেবে পরিচিত হন। যাইহোক, মূলত আহমদ শাহ দুররানী নিজেকে বাদশাহ হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে প্রথমবারের মত স্বাধীন আফগানিস্তানের গোড়াপত্তন ঘটে, যদিও এর স্থায়িত্ব বেশী দিন থাকেনি।
প্রসঙ্গত
আফগানিস্তানের ইতিহাস রক্তাক্ত ইতিহাস। আফগানদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য যুদ্ধপ্রীতি।
বহু জাতির সংমিশ্রণে শংকর আফগান জাতিদের মধ্যে, উপজাতীয় কোন্দলকে প্রাক-ইসলামী
যুগের, আরব গোত্র কলহের সঙ্গে তুলনা করা যায়। গ্রীক, শক, হুন, আর্য, তাজিক, হাজারা, উজবেক,
পশুতুন সব মিলে পাঠান নামে পরিচিত হলেও এরা এক গোত্র অন্য গোত্রকে সহ্য করতে
পারেনা। এই গোত্রীয় দ্বন্দের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে, উনবিংশ শতাব্দী থেকে বিশ্ব
পরাশক্তি ব্রিটিশ, রুশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের ইতিহাসকে, রক্তে
রন্জিত করতে সক্ষম হয়েছে।
আহমদ
শাহ দূররানী আফগানিস্তানে দুররানী বংশ প্রতিষ্ঠা করে, আফগানদের মাঝে ঐক্য স্থাপন
এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনলেও ১৭৭৩ তার সালে মৃত্যু ছিল অশনি সংকেত। আহামদ শাহের
মৃত্যুর পর তার পুত্র তৈমুর শাহ, দেশটির দক্ষিণের কান্দাহার থেকে উত্তরের কাবুলে
রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। গোত্রীয় প্রভাব দূর করে, সমাঝোতার সৃষ্টির লক্ষ্যে এ
ব্যবস্থা গৃহীত হয়। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। গোত্র কলহ দমনে তিমুর শাহ ব্যর্থ
হন। তার উত্তরাধিকারী শাহ জামান দুর্বল শাসক ছিলেন। এ কারণে সামন্তবাদী গোত্র
প্রধানদের, উচ্চাকাঙ্ক্ষা তিনিও দমন করতে পারেননি।
আরও পড়ুন:আফগানিস্তানের স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস
আহামদ শাহ আবদালীএর ফলে আহামদ শাহ আবদালীর শক্তিশালী দূররানী সাম্রাজ্যের ভাঙ্গন দেখা দেয়। শাহ জামান গোত্রীয় কোন্দল দমনের জন্য, তৎকালীন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ শাসকদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করেন। ব্রিটিশ সরকার আফগানিস্তান ও ভারতবর্ষে রুশ ও ফরাসী প্রভাব রোধকল্পে, আফগানিস্তানের সাথে মৈত্রী চুক্তি করে। কিন্তু পরবর্তীতে তৈমূর শাহের পুত্র শাহ জামান, ব্রিটিশ বিরোধী মহিশূরের অধিপতি টিপু সুলতানের সাথে, মিত্রতা স্থাপন করলে ভারতবর্ষের ব্রিটিশ শাসকগণ, ইরানে সাফাভী শাসকদের সহায়তায়, আফগানিস্তানের শাসক শাহ জামানকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
এরপর শাহ জামানের স্থলাভিষিক্ত হন তার পুত্র শাহ সুজা। তিনি ব্রিটিশদের সাথে ১৮০৯ সনে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। এই চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল আফগানিস্তান ফ্রান্স, রাশিয়া ও ইরানের সাথে মৈত্রী চুক্তি করবেনা। পরবর্তীতে শাহ সুজার পতনের পর আফগান-ব্রিটিশ চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। অবশেষে ১৮২৩ সালে দূররানী সাম্রাজ্যের শেষ শাসক, আইউব শাহ দুররানীকে পরাজিত করে দুস্ত মোহাম্মদ শাহ। এরপর তিনি কাবুল জয় করে, আফগানিস্তানে বারাকাজি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। পরর্তীতে তিনি কাবুলকে কেন্দ্র করে, আফগানিস্তানের অধিকাংশ অঞ্চলে তার আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। দুস্ত মোহাম্মদ ও বারকাজি রাজবংশের উত্থান, আফগানিস্তানে ইতিহাসে নতুন মোড় নেয়। ব্রিটিশদের সাথে আবারও দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ে আফগানরা।
* আধুনিক মুসলিম বিশ্ব - তুরস্ক-ইরান-আফগানিস্তান
* মধ্যপ্রাচ্যে অতীত ও বর্তমান - ইয়াহিয়া আরমাজানী
ভিডিও দেখুন:



0 মন্তব্যসমূহ