আরও পড়ুন : আফগানিস্তানের প্রাচীন ইতিহাস || ইসলাম আগমনের অজানা তথ্য
ইসলামের শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (স) এর মাধ্যমে, আরব দেশে ইসলামের পূনরুত্থান হওয়ার পর, দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা) সময়ে, ইসলামী রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ হয়। ৬৪২ সালে রাশিদুন খিলাফত ও সাসানীয় সাম্রাজ্যেরমধ্যে সংঘটিত হয় নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে পারস্যের সাসানীয়দের পরাজিত করে মুসলিমরা পারস্য, ইরান এবং খোরাসান বিজয় করে। নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ খোরাসান বিজয়ের অংশ হিসেবে, আধুনিক আফগানিস্তানের কিছু মুসলিম খেলাফতের অধীনে চলে আসে।
এরপর তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমানের (রা) খিলাফতে, ৬৫২ সালে উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলে সামরিক বাহিনী পাঠানো হয় এবং তৎকালীন আফগানিস্তানের বিখ্যাত শহর হিরাতসহ নিশাপুর, বলখ, গজনী, বামিয়ান, বাস্ত, কাবুল অধিকৃত হয়। আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুরের শাসনামলে, ৭৬০ সালে আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে অভিযান করে, মুসলিম বাহিনী কান্দাহার বিজয় করে। অতঃপর আব্বাসীয় খিলাফতের অধীনে থাকা, আফগানিস্তানের গজনীতে রাজধানী স্থাপন করে, আমীর সবুক্তগীণ গজনী রাজ্য কায়েম করে, স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে থাকেন।
গজনী সাম্রাজ্য ম্যাপ
পরবর্তীকালে তার পুত্র সুলতান মাহমুদ দশম ও একাদশ শতাব্দীতে, গজনী থেকে সতের বার ভারতবর্ষে অভিযান পরিচালনা করে, ভারতীয় হিন্দু রাজশক্তিকে পদানত করে হিন্দুস্থানে ইসলামের বিজয় পতকা উড্ডিয়ন করেন। গজনীদের পতনের পর ঘোরী বংশের অভ্যুত্থান হয় এবং আফগানিস্তানের ঘোর শহরে এই রাজ্যের রাজধানী ছিল। মুহাম্মদ ঘোরী এখান থেকে দু'বার ভারতবর্ষে সমরাভিযান করে প্রথমবার পরাজিত হন ১১৯১ সালে তরাইনের প্রথম রণক্ষেত্রে।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানের প্রাচীন ইতিহাস ও ইসলামের আগমন
কিন্তু ১১৯২ সালে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে, দিল্লি ও আজমিরের অত্যাচারী হিন্দু রাজা, পৃথ্যিরাজ চৌহানের বিরোদ্ধে জয়লাভ করার ফলে, ভারতবর্ষে প্রথমবারের মত মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর আব্বাসীয় খিলাফতের শেষের দিকে, সেলজুকদের অভ্যুত্থানের পর তাদের রাজত্ব কাবুল, গজনী, কান্দাহার, ইরান, এশিয়া মাইনর এবং মধ্য-এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে। সেলজুকদের উত্তরাধিকারী হিসেবে, খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য আফগানিস্তান দখল করেন।
এয়োদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে চেঙ্গিস খানের আবির্ভাব ঘটে এবং মোঙ্গলগণ ১২২১ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু সুলতান জালালউদ্দীন খাওয়ারিজম শাহ, কান্দাহার থেকে মোঙ্গলদের বিতাড়িত করে, কাবুলের অনতিদূরে উত্তরে পারওয়ার প্রদেশ পর্যন্ত নিয়ে যান। জবল সিরাজে পরাস্ত হয়ে বিধ্বস্ত মোঙ্গল বাহিনী হিরাত, বলখ ও বামিয়ান থেকে বিতাড়িত হয়। কিন্তু খাওয়ারিজম শাহ এই বিজয় ধরে রাখতে পারেননি। এ কারণে মোঙ্গলগণ পুনরায় আফগানিস্তান দখল করে।
মোঙ্গলদের পতনের পর, মধ্যএশিয়ার তুর্কী বংশোদ্ভূত বীর তৈমুর লং, তৈমুরী রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন মধ্য এশিয়ায়। তিনি আফগানিস্তান দখল করেন। তৈমুর লং-এর বংশধরেরা, হিরাতে রাজধানী স্থাপন করে শাসন করেন পঞ্চদশ শতাব্দীতে। তারা হিরাত থেকে বাদখাশান ও কাবুল থেকে গজনী পর্যন্ত বিস্তৃর্ণ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে। এ সময় নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বহু আফগান ভারতবর্ষে আগমন করে। প্রসঙ্গত ভারতবর্ষে তুর্কী শাসনের শেষ ভাগে, আফগান লোদী ও শূর বংশের শাসন কায়েম হয়। বাংলাদেশেও একসময় কররানী আফগানদের আধিপত্য ছিল।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানে স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস
এরপর আফগানিস্তানের ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব হয় মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্থান থেকে আগত জহির উদ্দীন মুহাম্মদ বাবুরের। তার ধমনীতে প্রবাহিতছিল মধ্য এশিয়ার দুইজন প্রখ্যাত সমর নেতা চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লঙ্গের রক্ত। তিনি ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে আফগানিস্তানের কাবুল বিজয় করেন। সেখান থেকে জহিরুদ্দীন বাবুর ভারতবর্ষে আগমন করে, ইব্রাহিম লোদীকে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে ,১৫২৬ সালে পরাজিত করে, মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সম্রাট হুমায়ুনের শাসনকালে মুঘলদের বিপর্যয় হয় এবং আফগান নেতা শেরশাহের নিকট পরাজিত হয়ে, হুমায়ুন পারস্যে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হন।
সম্রাট বাবর
একথা অনস্বীকার্য যে, মুঘলদের রাজত্বকালে আফগানিস্তান মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবুর কাবুলে সমাহিত রয়েছেন। তবে মুঘল সম্রাটগণ, আফগানিস্তানকে তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেও, স্বাধীনচেতা আফগানগণ বিদ্রোহ করে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ১৭০৮ সনে কান্দাহারকে স্বাধীন করেন আফগান নেতা মীর ওয়ালিস। আফগানীরা হিরাতকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে থাকে।
১৬ থেকে ১৭ পযর্ন্ত শতাব্দী পর্যন্ত, আফগানিস্তান তিনটি বৃহৎ অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে, তিনটি সাম্রাজ্য ধারা শাসিত হয়ে হয়েছিল। তার মধ্যে দেশটির উত্তর অংশ কুন্দুজ শাসন করতো, মধ্য এশিয়ার বুখারা খানাত, পশ্চিম অংশ হেরাত শাসন করতো, পারস্যের শিয়া ধর্মমতলম্বি সাফাভী সাম্রাজ্য। উত্তর অংশ কাবুল শাসন করতো, ভারতবর্ষের সুন্নি ধর্মবলম্বী মুঘল সাম্রাজ্য।
ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্য এবং পারস্যের সাফাভি রাজবংশ, আফগানিস্তানের দখল নিয়ে প্রায় যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো। ফলে কান্দাহার অঞ্চলের শাসনভার প্রায়ই হাতবদল হত। পশতুন জাতি তাদের শক্তিবৃদ্ধি করে, তবে স্বাধীনতা লাভে ব্যর্থ হয়। প্রসঙ্গত এই সময় সুন্নি মুসলিম খেলাফত, উসমানীয় সাম্রাজ্যের সাথে, শিয়া ধর্মমতলম্বী সাফাভি সাম্রাজ্যের দ্বন্দ লেগেই থাকতো। মূলত উসমানীয় সাম্রাজ্যের সাথে দ্বন্দের কারণে, সাফাভিরা আফগানিস্তানে তেমন সুবিধা করতে পারতো না।
* আধুনিক মুসলিম বিশ্ব - তুরস্ক-ইরান-আফগানিস্তান
* মধ্যপ্রাচ্যে অতীত ও বর্তমান - ইয়াহিয়া আরমাজানী
ভিড়িও দেখুন:



0 মন্তব্যসমূহ