আফগানিস্তানের উত্তরে উজবেকিস্তান ও তাজাকিস্তান, উত্তর-পূর্ব কোণে চীন, পূর্ব ও দক্ষিণে পাকিস্তান, দক্ষিণ এবং পশ্চিমে ইরান, উত্তরপশ্চিমে তুর্কমেনিস্তান। কাবুল দেশটির বৃহত্তম শহর এবং রাজধানী। আফগানিস্তান শব্দটির অর্থ আফগান তথা পশতুন জাতির দেশ। আফগানিস্তান প্রাচীনকাল থেকে যেমনি ভাবে এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। তেমনি দেশটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুবিশাল।
আফগানিস্তানে বসবাসরত, সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হল পশতু জাতি। এরা আগে আফগান নামেও পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে আফগান বলতে কেবল পশতু নয়, বরং জাতি নির্বিশেষে দেশটির সকল নাগরিককেই বোঝায়। ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পর মধ্য এশিয়া থেকে, এই এলাকায় লোক আসতে শুরু করে। এদের অধিকাংশই ছিল আর্য যারা ইরান ও ভারত বসতি স্থাপন করেছিল। তখন এই এলাকার নাম ছিল আরিয়ানা।প্রাচীন ইতিহাস: খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, পারস্যেল আকেমিনিড সাম্রাজ্য আরিয়ানা দখল করে। ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীক বীর আলেকজান্ডার পারস্যের সম্রাটকে পরাজিত করে, আরিয়ানার পূর্ব সীমান্ত বিজয় করে ভারতবর্ষে আক্রমণ চালান। ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর, অনেকগুলি রাজ্য তার এশীয় সাম্রাজ্যের দখল নেয়ার চেষ্টা করে। এদের মধ্যে সেলুসিড সাম্রাজ্য ও ভারতীয় মৌর্য সাম্রাজ্য অন্যতম।
খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দীতে মধ্য এশীয় কুশান জাতি, আরিয়ানা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয় । ৩য় থেকে ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম ছিল এখানকার প্রধান ধর্ম। এই সময়ের অনেক বৌদ্ধমন্দিরের ধ্বংসস্তুপ, আজও আফগানিস্তানে দেখতে পাওয়া যায়। হুন নামের মধ্য এশীয় এক তুর্কি জাতি ৪র্থ শতাব্দীতেএসে কুশানদের পতন ঘটায়। এই হুন জাতিরা পরবর্তীতে আফগানিস্তান সহ, সমগ্র ভারতবর্ষে ত্রাস সৃষ্টি করে ।
হুনদের পতনের পর পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যে এই অঞ্চল বিজয় করে। প্রসঙ্গত ৪র্থ শতক থেকে, পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের হাত ধরে সমগ্র আফগানিস্তান, উত্তর ইরান, দক্ষিণ তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল খোরাসান নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সময় থেকে খোরাসান একটি, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঞ্চল হিসেবে, ইতিহাসের পাতায় উঠে আসে।
৪র্থ শতক থেকে প্রায় সপ্তম পর্যন্ত, পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে আফগানিস্তান শাসিত হয়। এরপর ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে, সাসানীয়দের পরাজিত করে মুসলমানরা খোরাসান বিজয়ের অংশ হিসেবে, আফগানিস্তানের বেশ কিছু শহর বিজয় করে এবং সেই থেকে দেশটির কিছু অংশে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে মুসলমারা সমগ্র আফগানিস্তান ইসলামী সাম্রাজ্যভুক্ত করে।
আরও পড়ুন: ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের ইতিহাস
ইসলামের আগমন: আফগানিস্তানে ইসলামের আগমন ঘটে, মহানবী সাঃ এর জীবদ্দশ্যায় অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীতে। একদা কয়স নামের এক প্রভাবশলী, আফগান উপজাতী নেতা, একদল লোকসহ মদীনায় মহানবী স. এর সাথে সক্ষাৎ করেন। অনেক আলোচনার পর, ইসলামের সত্যতা উপলিদ্ধি করতে পেরে, তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করে। মহানবী স. কয়েসের নাম পরিবর্তন করে আব্দুর রশীদ রাখেন। এবং আফগান জাতীর হেদায়তের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
এরপর মহানবী (স) আফগানিস্তানের নওমুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করতে এবং দেশটিতে ইসলামের সুমহান বানী ছড়িয়ে দিতে, আব্দুর রশীদের সাথে একজন সাহাবীকে আফগানিস্তান প্রেরণ করেন। অতঃপর সাহাবী এবং নওমুসলিমদের প্রচেষ্টায়, সেখানে বহু আফগানীকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। সেই থেকে দেশটিতে ইসলামের আগমন ঘটে। তবে ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে খোলাফায়ে রাশেদুনের খেলাফতকালে, মুসলমানরা আফগানিস্তান বিজয় করে। এর পর থেকে আফগানিস্তানে ইসলাম ধর্মবলম্বিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে ।রাশিদুন খেলাফতের পর উমাইয়া আমলে, বিশেষ করে খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের শাসনকালে, ইসলাম প্রচারকগণ আফগানিস্তানে গমন করে, বিপুল সংখ্যক আফগানীদের ইসলামে দীক্ষিত করান। উমাইয়া খেলাফতের পর, আব্বাসীয় খলিফা আল মুতাসিমের শাসনকালে, দেশটির অধিকাংশ অধিবাসীদের মধ্যে ইসলামের চর্চা শুরু হয়। এই সময় থেকে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মকে পদানত করে, ইসলাম আফগানিস্তানের প্রধান ধর্ম হয়ে উঠে।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে, বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মবলম্বি অধ্যুষিত দেশটিতে, ইসলাম প্রধান ধর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। বর্তমানে ইসলাম আফগানিস্তানের সরকারি রাষ্ট্রীয় ধর্ম, দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৯৯.৭% মুসলিম । এর মধ্যে ৯০ শতাংশ মুসলিম সুন্নী আর বাকি ৯ শতাংশ মুসলমান শিয়া মতাদর্শী।



0 মন্তব্যসমূহ