আরও পড়ুন : আবু বকরের (রা) খেলাফত লাভ
ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বেশেষ নবী হলেন হযরত মোহাম্মদ (স)। মহান আল্লাহ মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা আহযাবের ৪০ নাম্বার আয়াতে সুস্পষ্ট ভাবে ইরশাদ করেছেন, “মুহাম্মদ (সা.) তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।”
কিন্তু মহানবী (স) জীবনের শেষ দিকে এবং তার ওফাতের পর আরবের কিছু প্রভাবশালী লোক নবুয়তকে ইহকালীন মরযদা ও প্রাচুরেযর পাথেয় মনে করে নিজেদের নবী বলে ঘোষণা করে। মূলত এদেরকে ভন্ডনবী বলে অভিহিত করা হয়। তারা দুর্ধর্ষ আরব গোত্রের লোকদের ইসলাম ত্যাগ করতে অনুপ্রাণীত করে নিজেদের দলে যোগদান করাতে সমর্থ হয়। আর যে সব ধর্মপ্রাণ মুসলমান তাদের দলে যোগ দিতে অস্বিকার জানাই, তাদের উপর তারা অমানুষিক অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালায়।
এমনকি তারা ইসলামী রাষ্ট্র ও মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য বদ্ধপকির হয়। তাছাড়া ভন্ডনবীদের দেখাদেখি মহানবী (স) ও মদীনা রাষ্ট্রে প্রতি বশ্যতা স্বীকার করেছিল, এমন কিছু আরব অঞ্চলও মদীনা রাস্ট্রের বিরোদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা। এই সব অঞ্চল গুলোর মধ্যে ইয়ামেন, ওমান এবং বাহারাইন অন্যতম।
আরও পড়ুন : মহনবীর (স) ওফাতের ঘটনা
এই সব পথভ্রষ্ট ভন্ডনবী, যাকাত অস্বীকারকারী এবং আরবের বিদ্রোহী গোত্রদের দমন এবং ইসলামী রাষ্ট্র ও মুসলিম জাতীর নিরাপত্তার জন্য আবু বকর (রা) যে যুদ্দ অভিযান সমূহ পরিচালনা করেন, তা ইতিহাসে রিদ্দার যুদ্ধ নামে পরিচতি। তবে সাধারন অর্থে রিদ্দার যুদ্ধ বলতে স্বধর্ম ত্যাগকারীদের বিরোদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ অভিযানকে বুঝায়।
রিদ্দার যুদ্ধের প্রথম পরযায়ে হযরত আবু বকর (রা) নিজেই যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করে যাকাত অস্বীকারকারীদের পরাজিত করেন। এরপর তার সেনাবাহিনীর ১১ টি দলকে, একএক জন সেনাপতির নেতৃত্বে, আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ এবং ভন্ডনবীদের দমনের জন্য প্রেরণ করেন। যে সমস্ত ধর্মত্যাগী মুসলমান দুনিয়ার স্বার্থের মোহে পড়ে ইসলাম ত্যাগ করে নিজেদের ভন্ডনবী বলে দাবি করে ইসলামের বিরোদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল আসওয়াদ আনাসী, তোলায়হা, মুসায়লামা এবং একমাত্র মহিলা ভন্ডনবী সাজাহ। ইসলাম এবং মুসলিম জাতীর ঐক্য রক্ষার্থে আবু বকর (রা) এই সব ধর্মত্যাগী ভন্ডনবীদের ধ্বংস করার জন্য বেশ কয়েকটি যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেন।
আরও পড়ুন : যাকাত অস্বিকারকারীদের বিরোদ্ধে অভিযান
ভন্ডনবী আসওয়াদ আনাসী মহানবী (স) এর জীবদ্দশায় ইয়ামেনে নবুয়ত দাবি করে ইসলামের বিরোদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইয়ামেন থেকে নওমুসলিম শাসনকর্তাকে বিতাড়িত করে রাজধানী সানা ও নজরান দখল করে নেয়। মহানবী (স) এই বিদ্রোহ দমনের জন্য সাদ ইবনে জাবালের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরন করেন। তবে মহানবী (স) এর ওফাতের মাত্র দুই দিন পূর্বে ফিরোজ দায়লীমা নামক এক আতাতয়ীর হাতে আসওয়াদ আনাসী নিহত হয়। কিন্তু মহানবী (স) এর ওফাত ও আবু বকর (রা) এর খিলাফত লাভের পর কায়েস ইবনে আসের নেতৃত্বে ইয়ামনে পুনরায় বিদ্রোহ দেখা দেয়। এরপর আবু বকর (রা) মুহাজির ইবনে উমাইয়ার নেতৃত্বে একদল মুজাহিদ বাহিনী প্রেরণ করে ইয়ামেনের বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হন। এর মাধ্যমে ইয়ামেন পুনরায় ইসলামী খিলাফতের অধীনে চলে আসে।
দ্বিতীয় ভন্ডনবী ছিল বনি তামিম গোত্রের ইয়ারবু শাখার সাজাহ নামের এক মহিলা। সে ইরাকের বানু তাঘলিব নামক এক খ্রিস্টান গোত্রে লালিত পালিত হয় এবং সেই গোত্রের সহযোগিতায় নিজেকে নবী ঘোষণা করে। কিন্তু তামিম গোত্রের অন্যান্য শাখার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে পরাজিত হয়ে সাজাহ ইরাকে পালিয়ে যায়। এবং সেখানে মুসায়লামার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এই দুই ভন্ডনবী একত্রিত হয়ে মদীনা রাষ্ট্র ও ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। অবশেষে ইয়ামামর যুদ্ধে মুসায়লামা পরাজিত ও নিহত হলে সাজাহ সেখান থেকে পালিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।
তৃতীয় ভন্ডনবী ছিল মধ্য আরবের হানিফ গোত্রের প্রধান মুসায়লামা। সে নিজের হস্তলিখিত বাণীকে ঐশীবানী বলে প্রচার করত। মুসায়লামা নবুয়তের দাবি করে মহানবী (স) এর জীবদ্দশায় মদীনা রাষ্ট্রের বিরোদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ভন্ডনবীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান ব্যাক্তি ছিল মুসায়লামা। তাছাড়া অপর ভন্ডনবী সাজাহ তার সাথে যোগ দেওয়ার মুসায়লামার শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
আবু বকর (র) প্রথমে ইকরামা ও সুরাহবিলের নেতৃত্বে মুসলিম মুজাহিদদের মুসায়লামা ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করার জন্য অভিযানে প্রেরণ করেন। কিন্তু যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী মুসায়লামাকে সম্পূর্ণরূপে দমনে ব্যার্থ হয়। এরপর আবু বকর (রা) মুসলিম বীর খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে একদল মুসলিম বীরসেনাদলকে মুসায়লামার বিরোদ্ধে পুনরায় প্রেরণ করেন । অবশেষে খালিদের নেতেৃত্বে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর নিকট ইয়ামামর যুদ্ধে মুসায়লামা ও তার বাহিনী পরাজিত হয়। এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মুসায়লামা নিহত হয়।
আরও পড়ুন : ইয়ামামর যুদ্ধের ইতিহাস
চতুর্থ ভন্ডনবী ছিল- বনি আসাদ গোত্রের দলপতি আরব বীর তোলায়হা। মহানবী (স) এর ওফাতের পর তোলায়হা ইসলাম ত্যাগ করে নিজেকে নবী হিসেবে দাবী করে। তাছাড়া মদীনার বেদুইন গোত্রের সাথে মিলিত হয়ে যাকাত বিরোধী অপ্রচার চালায়। অত:পর তোলায়হাকে পরাস্ত করার জন্য আবু বকর (রা) ৬৩২ খ্রি খালিদের নেতৃত্বে যুদ্ধ অভিযান প্রেরণ করেন। উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘটিত হওয়া যুদ্ধে তোলায়হা ও তার বাহিনী পরাজিত হয়।
পরবর্তীতে তোলায়হাও ইসলাম গ্রহণ করে এবং ওমর (রা) খেলাফতকালে ইরাক বিজয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে এবং আজীবন ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়জিত রাখে। মূলত তোলায়হার পতনের মধ্যে দিয়ে ভন্ডনবীদের সম্পূর্ণরূপে নির্মুল করা সম্ভব হয়। এরপর আর কেউ আরবের বুকে মিথ্যা নবুয়তের দাবী করার সাহস করেনি। এভাবে আবু বকর (রা) ভন্ডনবীদের হাত থেকে মদীনা রাষ্ট্র ও ইাসলামকে রক্ষা করেন এবং মুসলমানদের ঐক্যকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম জন।
💻তথ্যের উৎস:
📌ইসলামের ইতিহাস- সৈয়দ মাহমদুল হাসান 📌ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি- সৈয়দ মাহমুদুল হাছান 📌ইসলামের ইতহিাস- মুহাম্মদ মিজানুর রশিদ 📌আরব জাতীর ইতিহাস- শেখ লুতফর রহমান 📌দ্যা লস্ট ইসলামিক হিস্ট্রি- ফিরাস আল খতিব 📌আবু বকর সিদ্দিক (রা)- ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি 📌খিলাফতে রাশেদা- মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম

0 মন্তব্যসমূহ