৬১৭ খ্রিস্টাব্দে মক্কার কাফেরদের বয়কটরে ফলে বনু হাশেম ও বনু মুত্ত্বালিব উভয় গোত্রের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নিদারুণ কষ্টের সম্মুখীন হ’ল। সঞ্চিত খাদ্যশস্য ফুরিয়ে গেলে তাদের অবস্থা চরমে ওঠে। ফলে তারা গাছের ছাল-পাতা খেয়ে জীবন ধারণে বাধ্য হন। নারী ও শিশুরা ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করত। তাদের ক্রন্দন ধ্বনি গিরি-সংকটের বাইরের লোকেরা শুনতে পেত। ফলে কেউ কেউ অতি সংগোপনে তাদের কাছে খাদ্য পৌছে দিত। একবার হাকীম বিন হেযাম স্বীয় ফুফু খাদীজা (রাঃ)-এর নিকটে গম পৌঁছাতে গিয়ে আবু জাহলের হাতে ধরা পড়ে যান।
কিন্তু আবুল বুখতারীর হস্তক্ষেপে অবশেষে সমর্থ হন। হারামের মাস
চারটি ব্যতীত অবরুদ্ধ গোত্রদ্বয়ের লোকেরা বের হ’তে পারতেন না। অবশ্য যেসব
কাফেলা বাহির থেকে মক্কায় আসত, তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য-শস্য ক্রয়ে
বাধা ছিল না। কিন্তু সেক্ষেত্রেও মক্কার ব্যবসায়ীরা জিনিষপত্রের এমন চড়ামূল্য
নির্ধারণ করে দিয়েছিল যে, তা ক্রয় করা প্রায় অসম্ভব ছিল। অন্যদিকে আবু তালিবের
দুশ্চিন্তা ছিল রাসূল সাঃ এর জীবন নিয়ে। রাতের বেলা সকলে শুয়ে যাওয়ার পর তিনি
রাসূলকে উঠিয়ে এনে তার বিশ্বস্ত নিকটাত্মীয়দের সাথে বিছানা বদল করাতেন।
যাতে কেউ তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পায়। উক্ত কঠোর অবরোধ চলাকালীন সময়েও হজ্জের মওসুমে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বহির্দেশ থেকে আগত কাফেলা সমূহের তাঁবুতে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। ওদিকে আবু লাহাব তাঁর পিছে পিছে গিয়ে লোকদেরকে তাঁর কথা না শোনার জন্য বলত। প্রায় তিন বছর পূর্ণ হ’তে চলল। ইতিমধ্যে মুশরিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও দ্বিধাবিভক্তি প্রকাশ্য রূপ নিল। যারা এই অন্যায় চুক্তিনামার বিরোধী ছিল, তারা ক্রমেই সংগঠিত হ’তে থাকল।
বনু
আমের বিন লুওয়াই গোত্রের হেশাম বিন আমরের উদ্যোগে যোহায়ের বিন আবী উমাইয়া ও
মুত্ব‘ইম বিন ‘আদীসহ পাঁচজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ‘হাজূন’ নামক স্থানে বসে এ ব্যাপারে
একমত হন এবং তাঁদের পক্ষে যোহায়ের কা‘বা গৃহ তাওয়াফ শেষে প্রথম সরাসরি আবু জাহলের
মুখের উপরে উক্ত চুক্তিনামা ছিঁড়ে ফেলার হুমকি দেন। সাথে সাথে বাকী চারজন পরপর
তাকে সমর্থন দেন। আবু জাহ্ল বলল, বুঝেছি। তোমরা রাতের বেলা অন্যত্র পরামর্শ করেই
এসেছ’।
ঐ
সময়ে আবু ত্বালিব কা‘বা চত্বরে হাযির হ’লেন। তিনি কুরায়েশ নেতাদের উদ্দেশ্য করে
বললেন আল্লাহ তাঁর রাসূলকে তোমাদের চুক্তিনামা সম্পর্কে অবহিত করেছেন যে, ‘আল্লাহ
ঐ অঙ্গীকারপত্রের উপরে কিছু কীট প্রেরণ করেছেন’। অতঃপর তারা এর মধ্যকার যাবতীয়
অন্যায়, বয়কট ও অত্যাচারমূলক কথাগুলো খেয়ে ফেলেছে, কেবল আল্লাহর নামগুলি ব্যতীত’।
অতঃপর আবু তবালেব নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘যদি তাঁর কথা মিথ্যা প্রমাণিত
হয়, তাহ’লে তোমাদের ও তার মধ্য থেকে আমরা সরে দাঁড়াব।
আর
যদি তার কথা সত্য প্রমাণিত হয়, তাহ’লে তোমরা আমাদের প্রতি বয়কট ও যুলুম থেকে ফিরে
যাবে’। আবু ত্বালিবের এ সুন্দর প্রস্তাবে সকলে সমস্বরে বলে উঠল ‘আপনি ইনছাফের কথাই
বলেছেন’। ওদিকে আবু জাহল ও মুত্ব‘ইম এবং অন্যান্যদের মধ্যে বাকযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে
মুত্ব‘ইম বিন আদী কা‘বা গৃহে প্রবেশ করে অঙ্গীকারনামাটি ছিঁড়ে ফেলার উদ্দেশ্যে
বাইরে নিয়ে এলেন। দেখা গেল যে, সত্য সত্যই তার সব লেখাই পোকায় খেয়ে ফেলেছে
কেবলমাত্র ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা অর্থাৎ আল্লাহ তোমার নামে শুরু করছি বাক্যটি এবং
অন্যান্য স্থানের আল্লাহর নামগুলি ব্যতীত।
এভাবে আবু ত্বালিবের মাধ্যমে প্রেরিত রাসূলের প্রাপ্ত অহীর সংবাদ সত্যে পরিণত হ’ল। কুরায়েশ নেতারা অবাক বিস্ময়ে তা অবলোকন করল। অতঃপর অঙ্গীকার নামাটি মুত্ব‘ইম সর্বসমক্ষে ছিঁড়ে ফেললেন এবং এভাবে যথারীতি বয়কটের অবসান ঘটল ঠিক তিন বছরের মাথায় ৬২০ খ্রিস্টাব্দে তথা ১০ম নববী বর্ষের মুহাররম মাসে। নবুঅতের এ ধরনের চাক্ষুষ প্রমাণ দেখেও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অহংকারী প্রবণতার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, “আর যদি তারা কোন নিদর্শন দেখে, তখন তারা এড়িয়ে যায় আর বলে এসব চলমান জাদু বৈ-কি!”বলা বাহুল্য সকল যুগের হঠকারী নাস্তিক ও মুনাফিকের চরিত্র একই রূপ।
এই বয়কটের ঘটনাবলি সর্বকালের ও সর্বযুগের মুসলমানদের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা হিসেবে চির ভাস্কর হয়ে থাকবে। এমন দুঃসময়েও মহানবী সাঃ ও তার সাহাবীরা যেভাবে ধৈর্যধারণ করে মহান আল্লাহ’র নিকট সাহয্য প্রার্থনা করেছিলেন, তেমনিভাবে বর্তমান বিশ্বের নির্যাতিত, নিপিড়ীত ও অধিকারবঞ্চিত মুসলিম জাতির উচিত, যে কোন খারাপ পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে ধৈর্যসহকারে মহান আল্লাহ’র নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে সমস্যা সামাধানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : আমুল হুযন : মহানবীর (সাঃ) জীবনের দুঃখের বছর ||
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
0 মন্তব্যসমূহ