পূর্বের অংশ পড়ুন : মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরত ।
মুসলমানদের প্রতি মক্কার কাফেরদের এত অত্যাচার, নির্যাতন,ঘৃণা, কুৎসা সহ বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ সত্ত্বেও ইসলামের অচিন্তনীয় প্রসারের ফলে কুরাইশ নেতারা বিমর্ষ হয়ে পড়ে। এমনকি মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর নবুয়তের ৬ষ্ঠ বছর তথা ৬১৬ খ্রিস্টাব্দে হামযা রাঃ ইসলাম গ্রহণ করেন । হামযা রাঃ এর ইসলাম গ্রহণের মাত্র তিন দিন পরেই আল্লাহর অপার অনুগ্রহে আরেকজন কুরায়েশ বীর ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব রাঃ আকস্মিকভাবে মুসলমান হয়ে যান।
হামযা ও ওমর (রাঃ)-এর পরপর মুসলমান হয়ে যাওয়ায় কুরায়েশরা
দারুণভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। হামযা রাঃ ও ওমর রাঃ এর ইসলাম গ্রহণে মুসলমানদের মধ্যে
আনন্দ ও সাহসের সঞ্চার হ’লেও দূরদর্শী ও স্নেহশীল চাচা আবু ত্বালিবের মন সর্বদা
উদ্বিগ্ন থাকতো কখন কোন মুহূর্তে কাফেররা আকস্মিকভাবে মুহাম্মাদ সাঃ হামলা করে
হত্যা করে।
সবদিক
ভেবে তিনি একদিন স্বীয় প্রপিতামহ আবদে মানাফের দুই পুত্র হাশেম ও মুত্ত্বালিবের
বংশধরগণকে একত্রিত করলেন। অতঃপর তাদের সামনে বললেন যে, এতদিন আমি এককভাবে ভাতিজা
মুহাম্মাদ সাঃ এর তত্ত্বাবধান করেছি। কিন্তু এখন এই চরম বার্ধক্যে ও প্রচন্ড বৈরী
পরিবেশে আমার পক্ষে এককভাবে আর মুহাম্মাদ সাঃ এর নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভবপর নয়।
সেকারণ আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই’।
গোত্র
নেতা আবু ত্বালিবের এই আহবানে ও গোত্রীয় রক্তধারার আকর্ষণে সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হ’ল
এবং মুহাম্মাদের হেফাযতের ব্যাপারে সবাই একযোগে তাকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিল।
একমাত্র চাচা আবু লাহাব বিরোধিতা করল এবং সে মুহাম্মাদ সাঃ এর বিপক্ষ দলের প্রতি
সমর্থন দানের ঘোষণা দিল। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে
ঘটে যাওয়া পরপর চারটি ঘটনায় মুশরিক নেতাদের মধ্যে যেমন আতংক সৃষ্টি হয়, তেমনি
মুহাম্মাদ সাঃ ও তার সাথীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য তারা মরিয়া হয়ে
ওঠে।
ঘটনাগুলি ছিল যথাক্রমে- (১) মুহাম্মাদ সাঃ কে প্রদত্ত লোভনীয়
প্রস্তাব সমূহ নাকচ হওয়া। অতঃপর উভয় দলের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদির কিছু গ্রহণ ও
কিছু বর্জনের আপোষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়া (২) হামযা রাঃ এর ইসলাম গ্রহণ ও
সরাসরি আবু জাহলের উপরে হামলা করা (৩) ওমর রাঃ এর ইসলাম গ্রহণ ও সরাসরি আবু জাহলের
বাড়ীতে গিয়ে তার মুখের উপর তার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ দেওয়া। অতঃপর মুসলমানদের মিছিল
করে সর্বপ্রথম মসজিদুল হারামে আগমন ও প্রকাশ্যে ধর্মীয় বিধি-বিধান সমূহ পালন শুরু
করা
এবং (৪) ও সবশেষে আবু তালিবের আহবানে সাড়া দিয়ে বনু হাশেম ও বনু
মুত্ত্বালিবের মুসলিম-অমুসলিম সকলের পক্ষ হ’তে মুহাম্মাদকে সর্বাত্মক সহযোগিতা
দানের অঙ্গীকার ঘোষণা করা। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে মুশরিক নেতৃবৃন্দ মুহাছছাব
উপত্যকায় সমবেত হয় এবং বিস্তারিত আলোচনার পর বনু হাশেম ও বনু মুত্ত্বালিব
গোত্রদ্বয়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বয়কটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সিদ্ধান্ত
মোতাবেক সকলে এই মর্মে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে যে, (১) বনু হাশেম ও বনু মুত্ত্বালিবের
সাথে বিয়ে-শাদী বন্ধ থাকবে (২) তাদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও যাবতীয় লেন-দেন
বন্ধ থাকবে (৩) তাদের সাথে উঠাবসা, মেলা-মেশা, কথাবার্তা ও তাদের বাড়ীতে যাতায়াত
বন্ধ থাকবে- যতদিন না তারা মুহাম্মাদকে হত্যার জন্য তাদের হাতে তুলে দিবে। ৬১৭
খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ সপ্তম নববী বর্ষে ১লা মুহাররমের রাতে সম্পাদিত উক্ত
অঙ্গীকারপত্রটি কা‘বা গৃহের ভিতরে টাঙিয়ে রাখা হ’ল। উক্ত অঙ্গীকারনামার লেখক
বুগায়েয বিন আমের বিন হাশেম এর প্রতি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বদ দো‘আ করেন। ফলে তার
হাতটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়।
৬১৭ থেকে ৬১৯ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত আবু লাহাব ব্যতীত হাশেমী
গোত্রের সকল লোক, হযরত মুহাম্মদ সাঃ এবং তার সাহাবিদেরকে শোয়াবে আবু তালিব নামক গিরিগুহায়
অনাহারে এবং সমাজচ্যুত করে রাখে।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : মুসলমানদের বয়কটের দিনগুলো এবং অবসানের অলৈাকিক ঘটনা ।
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
0 মন্তব্যসমূহ