মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরত |

                                         


পূর্বের অংশ পড়ুন : মহানবী (স.) ও নব-দিক্ষীত মুসলমানদের উপর কুরাইশদের নির্যাতন ।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ ও তার সাহাবীদের উপর মক্কার কাফেরদের অন্যায়-অত্যাচারের বিভীষিকাময় ধারা-প্রক্রিয়া শুরু হয় নবুওয়াতের চতুর্থ বর্ষ তথা ৬১৪ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিক থেকে। জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা শুরুতে সামান্যই ছিল। কিন্তু দিন যত অতিবাহিত হতে লাগলো জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা ততই বৃদ্ধি পেতে লাগল। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন হলো যে, মক্কায় মুসলমানদের টিকে থাকাটাই একরকম অসম্ভব হয়ে উঠলো। তাই এ বিভীষিকাময় অত্যাচারের কবল থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য মুসলমানরা বাধ্য হলেন অন্য পথের সন্ধান করতে।

অনিশ্চয়তা এবং দুঃখ-দুর্দশার এ ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে আল্লাহ তা’আলা অবতীর্ণ করলেন, ‘আল্লাহর জমিন অপ্রশস্ত নয়।’ এই আয়াতে মূলত হিজরতের ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। এই আয়াত অবতীর্ণের পরে রাসূল সাঃ তাঁর সাহাবীদের জন্য হিজরতের তথা দেশান্তরের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি বহু পূর্ব থেকেই আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশির উদারতা এবং ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে শুনে আসছিলেন। অধিকন্তু, সেখানে যে কারো প্রতি কোনো অন্যায়-অত্যাচার বা অবিচার করা হয় না, সে কথাও তিনি শুনেছিলেন।

মুসলিমগণ যদি আবিসিনিয়ায় গমন করে তাহলে সেখানে নিরাপদে থাকার এবং নির্বিঘ্নে ইসলাম পালনের সুযোগ লাভ করবে এই বিশ্বাস নবীজীর ছিল। এসব কিছু বিবেচনা করে তাঁদের জীবন ও ঈমানের নিরাপত্তাবিধান এবং নির্বিঘ্নে ইসলাম পালনের সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহর হুকুমে হিজরত করে আবিসিনিয়ায় গমনের জন্য রাসূলুল্লাহ সাঃ তাঁর সাহাবীগণকে নির্দেশ প্রদান করলেন।

আবিসিনিয়ায় হিজরত দুইটি পর‌্যায়ে বিভক্ত ছিল। প্রথমত, নবুয়তের ৫ম বছরের শেষ দিকে ৬১৫ খ্রিঃ হযরত আলী রাঃ এর ভাই জাফর রাঃ এর নেতৃত্বে এগারজন পুরুষ ও চারজন মহিলা আবিসিনিায় হিজরত করেন। এ ১৫ জনের দলে ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান রাঃ, তার স্ত্রী ও মহানবীর কন্যা রোকেয়া, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, মুসআব ইবনে উমাইয়া প্রমুখ সম্ভ্রান্ত পরিবারের সাহাবিগণ ছিলেন। এটা মুসলিমদের আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরত।

আবিসিনিয়ার বর্তমান নাম ইথিওপিয়া। আবিসিনিয়া তখন বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। আবিসিনিয়ার সম্রাট আসহামা একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন। তার উপাধি ছিল নাজ্জাসী। আবিসিনিয়ার অধিবাসীগণ খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারি ছিল। তাই মক্কার পৌত্তলিকদের সাথে তাদের কোন সুসম্পর্ক ছিলনা। আবিসিনিয়ার সম্রাট মুসলিম দলকে সাদরে বরণ করেন। এদিকে মুসলমানরা হিজরত গেছেন দেখে মক্কার কাফেররা খুবই ক্রোধান্বিত হল।

এরপর মক্কার কুরাইশরা পরামর্শ সভা আহবান করল। এই সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে মুসলমাদেরকে আবিসিনিয়া থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে আবু রাবি’আ ও আমর ইবনে আ’সের সমন্বয়ে এক প্রতিনিধি দল বিভিন্ন উপঢৌকনসহ আবিসিনিয়ায় প্রেরিত হল। তারা বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে প্রত্যেক সভাসদকে উপঢৌকন প্রদান করে বাদশাহকে মুসলমানদের ব্যাপারে ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইল। কিন্তু নাজ্জাশী তাঁর দূরদর্শিতার কারণে এই ছল-চাতুরি বুঝে ফেললেন।

মুসলমানদের মধ্য থেকে সকলকে উপস্থিত করে তিনি কুরাইশদের অভিযোগ তাদের সামনে তুলে ধরলেন। জাফর ইবনে আবু তালেব (রাঃ) এর বিচক্ষণতা পূর্ণ বক্তব্যে বাদশাহ অভিভূত হলেন। এরপর তিনি কুরাইশদের দাবী বাদশাহ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং প্রতিনিধি দলের শেষ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে মক্কায় ফিরে এল। এভাবেই আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের নির্বিঘ্নে দিন যাপন আরও ত্বারান্বিত হল এবং মুসলমানরা বাদশাহর শুকরিয়া আদায় করে সেখানে অবস্থান করতে লাগল।

দ্বিতীয়ত, হযরত উসমান রাঃ এর নেতৃত্বে পরিচালিত দল আবিসিনিয়ায় তিন মাস অবস্থান করে। এর মধ্যে একটি ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচারিত হয় যে, মক্কার কুরাইশগণ ইসলাম গ্রহণ করেছে। সংবাদ পেয়ে আবিসিনিয়া থেকে মুসলিম দল মক্কায় ফিরে আসে। কিন্তু ফিরে এসে দেখে পরিস্থিতি পুরটা ভিন্ন। নবদীক্ষিত মুসলিমদের উপর অত্যন্ত মর্মান্তিক ও অমানুষিক অত্যাচার শুরু হয়। অতঃপর হযরত মুহাম্মদ সাঃ উসমান রাঃ এর নেতৃত্বে ১৮ জন মহিলা এবং ১০০ জনের একটি দলকে পুনরায় আবিসিনিয়ায় প্রেরণ করেন।

এটাই মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরত। সেখানে সম্রাট নাজ্জাসী তাদের পুনরায় সাদরে বরণ করে নেন।  এই হিজরতের পরেই আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন,“যারা নির্যাতিত হওযার পর আল্লাহর হুকুমে গৃহ ত্যাগ করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দেব এবং পরকালের পুরস্কার তো সর্বাধিক।” (আল কুরআন-সূরা আন নাহল আয়াত নং ৪১)

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ কুরাইশদের অমানুষিক নির‌্যাতনে অটল থেকে তার উম্মতদের হেদায়ত দান করতে থাকেন। নব দীক্ষিত মুসলমানদের কুরাইশদের উৎপীড়ন থেকে রক্ষার জন্য তিনি আবিসিনিয়ায় আশ্রয় গ্রহনের নিরেদ্শ দেন। কিন্তু রাসূলে করিম সাঃ এর পক্ষে স্বদেশ ভূমি এবং প্রতিদিন দিক্ষীত হওয়া শত-সহস্র নও মুসলিম সাহাবীদের ছেড়ে আবিসিনিয়ায় গমন করা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তী অংশ পড়ুন : মহানবীর (সাঃ) অনুসারী এবং তার সহযোগিদের প্রতি মক্কার কাফেরদের বয়কট ।

তথ্যের উৎস সমূহ:

১. আরব জাতির ইতিহাস - শেখ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ।
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান 
৩. ইসলামের ইতিহাস  ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট ।
                                         

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ