পূর্বের অংশ পড়ুন : মহানবী (সঃ) এর প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার ।
৬১৩ খিস্টাব্দ থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করতেই মক্কার কুরাইশরা ও প্রভাবশালী-মহল নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠলো। নবীজি যখন সাফা পাহাড়ে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং সেই দাওয়াতের সুমহান বাণী মানুষের মধ্যে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করা শুরু করেছিলো, সেই খবর মক্কায় ছড়িয়ে গেলো, তখনই কাফেররা তাদের অচল সমাজব্যবস্থার মুখে আসন্ন পদাঘাতের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলো এবং সেই আশঙ্কা থেকে তারা নবীজি সঃ এর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রের ছক আঁকতে শুরু করলো।
হজের সময় ছিলো আসন্ন। বৃহৎ হজ-কাফেলাকেই
কাফেররা মুহাম্মদ সাঃ এর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করার উপায় হিসেবে বেছে নিলো। মক্কার
অভ্যন্তরীণ সকল পথে তারা লোক নিয়োগ করে দিলো, যেন মক্কায় প্রবেশের আগেই কাফেলার
লোকেরা মহানবী সাঃ এর নামে নানা বিষবাক্য শুনে তাঁকে এড়িয়ে চলে এবং তাঁর কোনো কথায়
যেন কান না দেয়। রটিয়ে দেওয়া হলো, শহরে এক পাগলের আবির্ভাব হয়েছে; কেউ বললো
জাদুকর; কেউ বললো কবি; মোটকথা, সবার মনকে মুহাম্মদ সঃ এর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার
সব ব্যবস্থাই করা হলো।
রাসূলের মক্কি জীবনে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই, কাফেরদের এই বিরুদ্ধাচরণ কয়েকটি রূপে কদাকার ছিলো : ১. উপহাস, ঠাট্টা–তামাশা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, মিথ্যাপ্রতিপন্নকরণ, অকারণ হাসাহাসি; ২. সত্যধর্মের বিরুদ্ধে জনমনে সংশয় ও সন্দেহের উসকানি এবং মিথ্যা ও ভ্রান্তি হিসেবে নবি মুহাম্মদ (স.) এর দাওয়াতকে কলঙ্কিতকরণ ।
৩. অতীতকালের ঘটনাবলি ও উপাখ্যানসমূহ এবং কুরআন কারিমে বর্ণিত বিষয়াদির মধ্যে অর্থহীন বাগড়া বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধূম্রজাল সৃষ্টি করে জনমনে ধাঁধারসৃষ্টি এবং মুক্ত চিন্তা–ভাবনার বিরুদ্ধে
প্রতিক্রিয়াশীলতা; ৪. শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে অত্যাচার ও পীড়নের অমানবিক
সকল উপায় ও কুটিল পন্থা অবলম্বন;—কাফেরদের উৎপীড়ন ও
নবদীক্ষিত মুসলিমদের বেদনার কথা, সাথে-সাথে কাফেরদের কর্মফল ও পরিণাম এবং
মুসলিমদের জন্য আনন্দ-সংবাদ ও পুরস্কারের কথা কোরআনেও নানা আঙ্গিকে বর্ণিত হয়েছে;
সেখানেও ফুটে উঠেছে রাসূলের বাধাগ্রস্ত আপদ সঙ্কুল মক্কি জীবনের কথা।
মক্কার কাফেরদের অত্যাচার আর নিপীড়নের শিকার
ছিলো ইসলাম ও মুহাম্মদ (সাঃ); তাই এই নিপীড়নের পথে কোনো অর্থনৈতিক সামাজিক বা
বংশীয় পরিচয় প্রতিরোধ নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি, বরং ইসলাম ও মহানবী সাঃ এর সাথে সম্পর্কিত
সকল বিষয়ই হয়ে উঠেছিলো মক্কার কাফেরদের সীমাহীন ষড়যন্ত্র ও কুটিলতার লক্ষ্যবস্তু। তারা
দাস বেলালের উপর যেভাবে অমানুষিক জিঘাংসা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তেমন ধনাঢ্য
উসমানকেও দলিত করেছে অত্যাচারের পাশব খোঁচায়।
ইয়াসির-পরিবার, জিন্নিরা, খাব্বাব
রাযিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখের সাথে সাথে আবু বকর, মুসআব বিন উমায়ের, তালহা এবং
যোবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখও হয়েছিলেন নানা অমানবিকতার শিকার। আবু লাহাবের
স্ত্রী উম্মুল জামিলা এবং আবু জাহেলের স্ত্রী হিন্দা হযরত মুহাম্মদ সঃ এর পবিত্র
মস্তকে আবর্জনা নিক্ষেপ করতো এবং তার চলার পথে কাটা বিছিয়ে রাখত। একদা আবু জাহেল হযরতের মস্তকে প্রস্তর দ্বারা আঘাত
করলে বীর কেশারী চাচা হামজা কাবাগৃহে প্রবেশ করে হৃদয়হীন আবু জাহেলকে উপযুক্ত
শাস্তি প্রদান করেন এবং প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন।
টাকা, পয়সা, নেতৃত্ব এবং সুন্দরি রমণী
দ্বারা প্রলুদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে, আবু তালেবের নিকট প্রতিবাদ করে ব্যর্থ হয়ে
কুরাইশগণ নব-দীক্ষিত মুসলমানদের শারীরিক অত্যাচার, উৎপীড়ন ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা
করতে থাকে। এই সময় মুসলমানদের সংখ্যা চল্লিশ জনের উপর হবে না। কুরাইশগণ তাদেরকে
অকথ্য অত্যাচারে জর্জরিত করতে লাগলো। ক্রিতদাস হযরত বেলাল রাঃ কে ইসলাম গ্রহণ করার
কারণে তার মনিব উমাইয়া ইবনে খালফ তার গলায় রশি বেধে টেনে হেঁচডে উত্তপ্ত
বালিকারাশিতে নিয়ে গিয়ে চিৎ করে শুয়ে দেয় এবং বুকের উপর পাথর তুলে অমানুষিক নির্যাতন
করে। শত কষ্টের মধ্যেও হযরত বেলাল রাঃ আহাদ আহাদ বলে আল্লাহ একাত্ববাদ প্রকাশ করে।
পরে আবু বকর রাঃ হযরত বেলাল ক্রয় করে মুক্ত করে দেন।
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির ছিলেন বনু মখজুম
গোত্রের ক্রীতদাস। তিনি এবং তার পিতামাতা ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের উপর ভয়াবহ নির্যাতন
করা হয়। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ইয়াসের রাঃ ইন্তেকাল করেন। তার স্ত্রী
সুমাইয়ার লজ্জাস্থানে দৃবৃত্ত আবু জাহেল বর্শা নিক্ষেপ করে। এর ফলে তিনি শাহাদাত
বরণ করেন। হযরত সুমাইয়া রাঃ ছিলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। হযরত আম্মার রাঃ গুরুতরভাবে
আহত হলেন। এরুপ হযরত খাব্বাব ইবনে আরত রাঃ, উম্মে ইবাইস রাঃ এর উপর অমানুষিক
নির্যাতন চালানো হয়।
ইসলামকে তাঁরা প্রিয় করে তুলেছিলেন বলে পুরো
পৃথিবীই যেন তাঁদের উপর হামলে পড়েছিলো; কিন্তু এ যে সাময়িকের, এ যে ক্ষণকালের, এ
যে নিয়ে আসবে সুখময় অনন্য এক মহাকাল, তার টের তাঁরা অন্তর্জগতে পাচ্ছিলেন—তাই এইসব
অত্যাচার, এইসব অমানবিকতা এবং এই মানবেতর কাল তাঁরা বরণ করে নিচ্ছিলেন সত্য আদর্শ
থেকে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে। এক মহাপৃথিবীর আসন্ন বিজয়-পদপাতের রণন শোনা
যাচ্ছিল।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরত ।
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
0 মন্তব্যসমূহ