পূর্বের অংশ পড়ুন : মুসলমানদের বয়কটের দিনগুলো এবং অবসানের অলৈাকিক ঘটনা ।
সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না নিয়েই জীবন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনও এই চিরাচরিত নিয়মের বাইরে ছিল না। তাঁকেও সুখ-দুঃখের মধ্য দিয়ে জীবন পার করতে হয়েছে। তাঁর জীবনের একটি বছরকে আমুল হুযন অর্থাৎ দুঃখের বছর বলা হয়। সেটি হলো নবুয়তের দশম বছর। এর কারণ হলো, সেই বছর তাঁর আশ্রয়স্থল চাচা আবু তালেব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। এই সুযোগে মক্কার কাফির অত্যাচার ও নিপীড়ন বহুগুণ বেড়ে যায়।
৬১৭ থেকে ৬১৯ সাল পর্যন্ত মক্কার কাফেরদের
দেওয়া বয়কট তথা অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্ত হওয়ার ছয় মাস পর নবুয়তের দশম বর্ষের রজব
মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু তালেব ইন্তেকাল করেন। অন্য বর্ণনায় উল্লেখ
রয়েছে, খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের তিন দিন আগে রমজান মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। আবু তালেবের ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে এলে রাসুলুল্লাহ
(সা.) তাঁর কাছে যান। সেখানে আবু জেহেলও উপস্থিত ছিল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
চাচাজান আপনি শুধু ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন—এই স্বীকারোক্তি করলেই আমি আল্লাহর
কাছে আপনার জন্য সুপারিশ করতে পারব। আবু জেহেল ও আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া বলল, আবু
তালেব, আপনি কি আবদুল মোত্তালেবের ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন? এরপর তারা দুজন আবু
তালেবের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। আবু তালেব শেষ কথা বলেছিলেন যে আবদুল মোত্তালিবের
ধর্মের ওপর..., এই কথা বলেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
আবু তালেবের ইন্তেকালের দুই মাস, অন্য
বর্ণনা মতে, তিন দিন পর উম্মুল মুমিমিন খাদিজাতুল কোবরা (রা.) ইহলোক ত্যাগ করেন।
নবুয়তের দশম বর্ষের রমজান মাসে তাঁর ইন্তেকাল হয়েছিল। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল ৬৫
বছর। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স ছিল ৫০। অগ্নিপরীক্ষার মুখে হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর
২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের সঙ্গিনী, পরামর্শদাতা, ইসলামের প্রথম মহিলা সাহাবী ও
মুসলিম বিবি ছিলেন বিবি খাদিজা রাঃ ।
হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর জন্য খাদিজা রাঃ
ছিলেনে বিশষ নিয়ামত। দুঃখ-কষ্ট ও বিপদের সময় প্রিয় স্বামীর জন্য তাঁর প্রাণ কেঁদে
উঠত। বিপদের সময় তিনি তাঁকে ভরসা দিতেন, ইসলাম প্রচারে নিত্য সঙ্গী থাকতেন, নিজের
জীবন ও সম্পদ দিয়ে তাঁর দুঃখ-কষ্ট দূর করতেন । চাচা আবু তালিবের পর- পরম বিশ্বস্ত,
অনুগত ও মমতাময়ী স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি আরও বেশী নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। পরম বন্ধু ও
স্ত্রী বিবি খাদিজা রা ও পিতৃব্য আবু তালিবকে হারিয়ে হযরত মুহাম্মদ সাঃ দিশেহারা
হয়ে পড়েন।
হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর দুর্বলতার সুযোগে
মক্কার কাফেররা অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই দুটি দুর্ঘটনা কয়েক দিনের মধ্যেই
সংঘটিত হয়েছিল, এতে রাসুল (সা.) শোকে কাতর হয়ে পড়েন। অন্যদিকে আবু তালেবের ওফাতের
পর তার স্থলাভিষিক্ত ও মক্কার রক্ষনাভেক্ষনের দায়িত্ব পান মহানবীরৎ সাঃ এর অন্য
চাচা অবিশ্বাসী আবু লাহাব। ফলে কাফিররা প্রকাশ্যে রাসুল (সা.)-কে কষ্ট দিতে লাগল।
এর প্রেক্ষিতে তিনি আশ্রয়ের খোঁজে তায়েফ চলে যান। কিন্তু সেখানে পরিস্থিতি আরো
ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, চাচা আবু তালেবের ইন্তেকালের পর কোরাইশরা নবী রাসুল (সা.)-এর ওপর এত বেশি নির্যাতন চালিয়েছিল, যা তাঁর জীবদ্দশায় তারা চিন্তাও করতে পারেনি। পর্যায়ক্রমে এ ধরনের অত্যাচার-নির্যাতনের কারণে ৬১৯ সালকে হযরত মুহাম্মদ (সা.) নাম দেন আমুল হুযন অর্থাৎ দুঃখের বছর নামে। এ নামেই এ বছরটি ইতিহাসে বিখ্যাত ।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : মহানবীর (স.) এর বিপদসংকুল তায়েফ গমন।
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
0 মন্তব্যসমূহ